ছবি: যাযাদিনওগাঁর আত্রাই উপজেলার চক শিমলা গ্রামের ভূমিহীন যুবক মো. সাদ্দাম হোসেন স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিজের এক শতক জমিও নেই, নেই নিরাপদ আশ্রয়। গ্রামের সাখাওয়াত সরদারের ভিটায় একটি জরাজীর্ণ টিনের ছাপড়া ঘরে কোনোমতে দিন কাটছে চার সদস্যের পরিবারটির। ঘরের টিনের চালে অসংখ্য ছিদ্র, আর চারপাশের বাঁশের কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঢোকে শীতল বাতাস। বৃষ্টি নামলেই ঘরের ভেতর বিছানাসহ সবকিছু ভিজে যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাদ্দামের দুঃখ-কষ্টের শুরু শৈশব থেকেই। তার বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন বাবা মো. সামসুর রহমান মা ছবিলা বিবিকে তালাক দেন। এরপর অবুঝ শিশুকে নিয়ে ছবিলা বিবি চক শিমলা গ্রামে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু চরম অভাবের সংসারে কিছুদিন পর তার মা অন্যত্র বিয়ে করেন। ফলে মাত্র তিন বছর বয়সেই মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন সাদ্দাম।
পরে দিনমজুর নানা অন্যের বাড়িতে কাজ করে তাঁকে কোনোমতে বড় করে তোলেন। শৈশব থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা সাদ্দামের জীবনে বড় হওয়ার পরও স্বস্তি আসেনি।
বিয়ে করে সংসারী হলেও নিজের জায়গা-জমি না থাকায় জীবনসংগ্রামে বারবার বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। দিনমজুরি করে যা আয় করেন, তা দিয়ে চার সদস্যের পরিবারের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। সংসারের খরচ সামলাতে তার স্ত্রীকেও অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হচ্ছে। তবু অভাব কাটছে না পরিবারটির।
সাদ্দামকে নিজের ভিটায় আশ্রয় দেওয়া মো. সাখাওয়াত সরদার বলেন, সাদ্দামের কষ্টের কোনো সীমা নেই। ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে ছেলেটি। নিজের কোনো জায়গা-জমি না থাকায় মানবিক কারণে তাঁকে নিজের ভিটায় একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে থাকতে দিয়েছেন।
সাখাওয়াত সরদার বলেন, ঘরটির অবস্থা খুবই খারাপ। সামান্য বৃষ্টি হলেই চাল দিয়ে পানি পড়ে ঘরের ভেতর সব ভিজে যায়। নিজের সামর্থ্য থাকলে সাদ্দামের পরিবারের জন্য একটি ভালো ঘরের ব্যবস্থা করে দিতেন বলেও জানান তিনি।
এ সময় সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি অসহায় পরিবারটির জন্য খাসজমি ও একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আকুল আবেদন জানান সাখাওয়াত সরদার।
নিজের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মো. সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার জীবন কষ্টে কেটেছে। তিন বছর বয়সে মা-বাবা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর মা-ও তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর দিনমজুর নানা পরিশ্রম করে তাকে বড় করেছেন।
সাদ্দাম বলেন, আজ আমার সংসার হয়েছে, কিন্তু সন্তানদের একটা নিরাপদ জায়গায় ঘুমাতে দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। অন্যের ভিটায় পড়ে আছি। বৃষ্টি নামলেই ভয় করে, চাল দিয়ে পানি পড়ে সব ভিজে যায়। কঞ্চির বেড়ায় বাতাস আটকায় না, শীতে বাচ্চা দুটো কাপতে থাকে। ওদের মুখের দিকে তাকালে বুকটা ফেটে যায়।
তিনি আরও বলেন, সারাদিন খেটে চারটা পেটের ভাত জোগাব, নাকি ঘর তুলব? সরকার বা সমাজের দয়ালু মানুষরা যদি একটু মুখ তুলে তাকাতেন, তবে সন্তানদের নিয়ে অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম।
সাদ্দাম হোসেনের এই দুরবস্থা দেখে স্থানীয় বাসিন্দারাও সমবেদনা প্রকাশ করছেন। ঝড়, বৃষ্টি ও অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেচে থাকা পরিবারটির চাওয়া একটি নিরাপদ আশ্রয় এবং নিজস্ব ঠিকানা।
সাদ্দাম ও তার পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা হলে সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ তৈরি হবে। উপজেলা প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের সহায়তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে অসহায় পরিবারটি।