সউদিতে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের ঘটনায় রাষ্ট্রের করণীয়

সজীব ওনাসিস

মতামত

১৪ অক্টোবর ২০২৬ সউদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সউদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানিয়েছে। বিবৃতিতে

2026-10-20T20:42:07+06:00
2026-10-20T20:49:42+06:00
মঙ্গলবার ● ২০ অক্টোবর ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
সউদিতে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের ঘটনায় রাষ্ট্রের করণীয়
সজীব ওনাসিস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪২ পিএম  আপডেট: ২০.১০.২০২৬ ৮:৪৯ পিএম 
নজরুল ইসলাম আব্দুল বাসির ও সিথি আকতার
১৪ অক্টোবর ২০২৬ সউদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সউদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, মক্কার পবিত্র একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আব্দুল বাসির এবং সিথি আকতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আটক করে এবং তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। পরবর্তী সময় বিচারিক আদালত অপরাধের তীব্রতা এবং স্থান ও পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনা করে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে ও মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পরে উচ্চ আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই রায় বহাল রাখেন এবং রাজকীয় ফরমান জারির মাধ্যমে দণ্ড কার্যকর করা হয়। ‘আজেল নিউজ’ নামে সউদির একটি মিডিয়ার রিপোর্টে এসব জানানো হয়েছে। সউদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির সরকার নিরাপত্তা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মসজিদের পবিত্রতা নষ্টকারী ও অনৈতিক কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ইসলামি আইন বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

নজরুল ও সিথির কথিত অপরাধের গোপন বিচার 

নজরুল ইসলাম (২৫) ও সিথি আকতার (২৪) নামের দুই জনের শিরচ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সউদি সরকার। তাদের অপরাধ ছিল- মসজিদ কমপাউন্ডে তারা দুই জন চুমু খেয়েছিল। অন্য দেশের এক নাগরিক সেটা ভিডিও করে সউদি শরিয়া পুলিশের কাছে দেয়। ঘটনাটি ২০২২ সালের। নজরুল ও সিথি দুই জনই কাজের উদ্দেশ্যে সউদি আরবে যায় এবং সেখানেই তাদের পরিচয় হয়েছিল। এ ঘটনায় পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে এবং তারা কারাগারে থাকা অবস্থায় গত চার বছর ধরে বিচার কার্যক্রম চলে। পরিশেষে ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৮ অক্টোবর তাদের বডি দেশে আনা হয়েছে। এই গোপন বিচার নিয়ে অনেকেরই মনে কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন এসেছে এবং এর উত্তর খোজার চেষ্টা করেছেন-

১. প্রাপ্ত বয়স্ক দুই জন নর-নারীর চুম্বন কি অনৈতিক কাজ? এই অনৈতিক কাজের অপরাধ মাত্রা কতটা গভীর? মসজিদের প্রবেশ পথে কি লেখা ছিল- এখানে চুম্বন নিষেধ? হতে পারে এই দুই বাংলাদেশি ভুল জায়গায় ভুল সময় তাদের ভালো লাগা বা ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছিল। তাই বলে তাদের শিরচ্ছেদ করতে হবে? চুম্বন কি জেনা বা অবৈধ শারীরিক মিলনের পর্যায়ে পড়ে এবং অভিযুক্তরা যদি এই অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে অবহিত না থাকে, তবে কি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া যায়? ধরে নিলাম, তারা অবৈধ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিল। এই কর্ম যে সেই এলাকায় নিষিদ্ধ, সেটা কি তারা জানতেন? ২০২২ সালে তারা তখন অল্প কয়েক দিন হলো দেশ থেকে কাজের উদ্দেশ্যে সউদিতে গিয়েছিল। না জানা একটা অনৈতিক অপরাধের জন্য কি শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে? খুনের ঘটনাতেও ‘ব্লাড মানি’ দিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিধান রয়েছে।

২. চার বছর আগে সংঘটিত এই অপরাধে দুই জন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেফতারের শাস্তি কঠোর হতে পারে জেনেও সউদি পুলিশ বা সরকার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে জানায়নি। এমনকি কোর্ট থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পরও স্থানীয় বাংলাদেশ এমবাসিকে অবহিত করা হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকারকে এই শাস্তি পরিবর্তনে কোনো সুপারিশ করার সুযোগ দেয়া হয়নি। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, রাশিয়া ও ইংল্যন্ডের মতো উন্নত দেশের মুসলিম নাগরিকরা যদি এই একই অনৈতিক আচরণ করত, তবে কি সে ক্ষেত্রে তাদের নিজ দেশকে অবহিত করা হতো না? উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই জানানো হতো এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সুপারিশে মৃত্যুদণ্ড তো দূরের কথা, কারাদণ্ডও দেয়া হতো না। হয়তো কিছু জরিমানা এবং সর্তক করে তাদের ছেড়ে দেয়া হতো।  

৩. অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, তথ্য-প্রমাণ, সঠিক বিচার ব্যবস্থা এবং আইনি সহায়তার সুযোগ ছাড়া কোনো প্রবাসীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া মেনে নেয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ও এমবাসি কেন সেটা জানল না? দক্ষ আইনজীবী বা ডিপ্লোম্যাটিক সহায়তার সুযোগ কি তাদের দেয়া হয়েছিল? উত্তর হচ্ছে, দেয়া হয়নি। এ ধরনের গোপনীয়তাও একটা বড় ধরনের অপরাধ এবং ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা অগ্রহণযোগ্য। সউদি আরব এখানে সুস্পষ্টভাবে জেনেভা কনভেনশন লংঘন করেছে। 

৪. দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর সউদি মিডিয়ায় খবরটি প্রচারিত হলে বাংলাদেশ এমবাসি বিষয়টি জানতে পারে। পররাষ্ট্র প্রতি মন্ত্রী শামা ওবায়েদ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সউদি আরবের একটি নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে। সেই আইনি কাঠামো অনুযায়ী কেউ যদি গর্হিত অন?্যায় কাজ করে, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সেই আইন অনুযায়ী সাজা হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘সউদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।’ এ সময় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেই দেশেই থাকুক, সেই দেশের আইন মেনে চলার পরামর্শ দেন। অবশ্য, বাংলাদেশ এমবাসি ঘটনাটি আগেই অবহিত হলে কি পদক্ষেপ নিতো এবং সেই পদক্ষেপের ফলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড রহিত করা যেত কি না, সেটা ভিন্ন আলোচনা। ২০২২ সালে যখন এই ঘটনাটি ঘটে, তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। তারাও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত ছিল না। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও এই বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানতো না। সুতরাং, গত তিন সরকার এ ঘটনা সম্পর্কে আগে অবহিত হলে কি পদক্ষেপ নিতো, এখানে আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। এর আগে ২০১০ সালের  ছয় বাংলাদেশি মিলে ইউএই-তে এক পাকিস্তানিকে হত্যা করেছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দুই লাখ দিরহাম (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা) ব্ল্যাড মানি দিয়ে সেই ছয় জনকে রক্ষা করেছিল। কিছু দিন আগে শ্রী লংকার এক জন নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল সউদি আরব। কিন্তু শ্রী লংকার ডিপ্লোম্যাটিক তৎপরতায় সেই মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করা হয়েছে। ১৯৭৭ সালে সউদি আরবে বাংলাদেশের এক ব্যবসায়ীর দণ্ড তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুপারিশে রহিত করা হয়েছিল। এ রকম নজির আরো রয়েছে। 

৫. বাংলাদেশ সরকার কি সেই মামলার নথি দেখতে চেয়েছে? অপরাধ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে দুই বাংলাদেশি কি করেছিল, এখন সেটা আমাদের জানতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে, সেই মামলার নথিপত্র দেখতে চাওয়া। দাবি জানাতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কি অভিযোগ আনা হয়েছিল, কি প্রমাণ যাচাই করা হয়েছিল, তারা কেমন আইনি প্রতিনিধিত্ব পেয়েছিল এবং তাদের কেনো কনসুলার সুবিধা দেয়া হয়নি?

যে রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তার কাছে একটি ফৌজদারি মামলার সমাপ্তি ঘটতে পারে। কিন্তু যে দেশের নাগরিকদের প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছে, সেই দেশের জন্য ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও নাগরিকত্বের অধিকারগুলোর সমাপ্তি সেখানেই হতে পারে না।

সউদি আরব রাষ্ট্র হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিতর্কিত

সউদি আরব এমন একটি দেশ, যেটা এখনো বহু ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় চলে। এমন কোনো অপরাধ নেই, যেটা এ দেশে হয় না। স্বার্থের জন্য তাদের শাসক যে কোনো ইসলাম বিরোধী কাজ অবলিলায় করতে পারে। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে মুসলিমদের কেমন সম্পর্ক থাকবে, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে। সউদি আরব তার রাজতন্ত্র রক্ষায় কৃশ্চিয়ান বা ইহুদি প্রধান রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিতে দ্বিধা করে না এবং তার বিরোধী মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে তৎপর। ইসলাম ধর্ম ও এর শরিয়াহকে রাজতন্ত্রের অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দানের জন্য প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে তারা। এমনকি নাবালক বয়সের তরুণদের রাজনৈতিক অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকে। এই শরিয়াহ আইন আবার শাসকদের সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। 
 
সউদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অধিকাংশই দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কম মাত্রার  অপরাধের যাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, তাদের প্রায় সবাই দরিদ্র প্রবাসী নাগরিক। শুধু তাই নয়, তাদের কাছ থেকে নেয়া হয় জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, ভাষা ও আইনি সহায়তার ঘাটতি এবং দরিদ্র দেশের ডিপ্লোম্যাটিক দুর্বলতা সেসব নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রধান কারণ। সউদি আরবে প্রতি বছর ২০০ জনেরও বেশি দরিদ্র প্রবাসী নাগরিককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যার মধ্যে ১৮৮ জনই ছিল এ রকম নাগরিক। 

সউদিতে বাংলাদেশসহ অনুন্নত মুসলিম দেশ থেকে মহিলা গৃহকর্মী নিয়ে বহু শেখ পরিবারেও তাদের ওপর যৌন নির্যাতন করা হয়। মূলত তারা যৌন দাসী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন এমন পর্যায়ে যায়, মৃত্যুবরণের ঘটনাও ঘটে। এভাবে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ বিদেশি নারী মারা যায়। এনজিও ব্র্যাকের এক তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে মিডল ইস্ট থেকে প্রায় ৮০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। প্রতি বছর গড়ে ১২০ জন বাংলাদেশি নারী কর্মী সউদি আরবে মারা যায়। যৌন নিপীড়নে মারা যাওয়ার তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, শ্রী লংকা, পাকিস্তান ও আফৃকার বিভিন্ন দেশের নারীরা রয়েছে। বহু নারীকে তারা যৌন নির্যাতন করে যৌন দাসী হিসেবে অন্যের কাছে বিক্রি করে। বহু বাংলাদেশি নারী সে দেশে গিয়ে গর্ভবতী হয়ে দেশে ফিরেছে। সউদি আরবের মতো যৌন অপরাধ, ধর্ষণ ও বলাৎকার পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয় না। কিন্তু বিদেশি গৃহকর্মীকে যৌন নির্যাতনে হত্যা করার মতো অপরাধে কোনো সউদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সউদি সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইয়েমেন সীমান্ত পার হয়ে সউদি আরবে ঢোকার চেষ্টা করা শত শত আফৃকান আশ্র য়প্রার্থীকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে, যেটা একটি বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধের তুল্য। সউদি আরব আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। এর ফলে দেশটিতে কোনো রাজনৈতিক বা মানবিক আশ্রয় পাওয়ার আইনি ব্যবস্থা নেই। সউদিতে ভিন্ন মত-প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, দেশের বাইরে থাকা সমালোচকদের ওপরও সউদি সরকার কঠোর নজরদারি করে। ২০১৮ সালে টার্কিতে সউদি কনসুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সউদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নিকৃষ্টতার তলানিতে নিয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বর্তমান যুবরাজ সালমানের সম্পৃতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সউদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে বসবাসরত শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানরা রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বিচার-ব্যবস্থা এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হয়ে থাকে। তাদের প্রতিনিয়ত সীমাহীন অবিচার ও নির্যাতন করা হয়। সউদি আরবে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক দল গঠন, ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক ইউনিয়ন করা এবং যে কোনো অধিকার আদায়ের জন্য ধর্মঘট বা আন্দোলন করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ। ফলে সাধারণ নাগরিক ও শ্রমিকদের নিজেদের অধিকারের পক্ষে সংগঠিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ তাদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করলে তৎক্ষণাৎ তাদের জেলবন্দি করা হয়। এ রকম অনেক রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতারের পর মাসের পর মাস গোপন জায়গায় বন্দি করে রাখা হয়। তাদের কোথায় রাখা হয়েছে, সেটা পরিবারের সদস্য বা আইনজীবীদের জানতে দেয়া হয় না।

সউদি আরব এমন একটি দেশ, যে দেশের সরকার ও নাগরিকরা অন্য মুসলিম দেশের অভিবাসীদের মনে করে মিসকিন বা ভিক্ষুক, তাদের দেখে ঘৃণার চোখে। অথচ ইতিহাস বলে, সউদি নাগরিকরাই এক সময় এই অঞ্চলে এসে ভিক্ষা করত। পাশ্চাত্যের প্রকৌশলবিদ এবং প্রযুক্তির সাহায্যে তেল উৎপাদন করার পর পঞ্চাশ দশক থেকে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয় এবং বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। অনেকের দৃষ্টিতে তারা যত ধনী হয়েছে, ততো বর্বর এবং অসভ্য হয়েছে। শেখ পরিবার ইওরোপ এবং আমেরিকায় কোটি কোটি বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এসব রাজ পরিবারের সদস্যদের নিজের দেশের প্রতি আগ্রহ নেই। তেল শেষ হলে তাদের সাধারণ নাগরিকদের পরিণতি আগের অবস্থায় যাবে না, সে গ্যারান্টি দেয়া যায় না।  মুসলমানের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত মক্কা ও মদিনা সউদ আরবে অবস্থিত। সারা বিশ্বের মুসলিমের এই দুটির প্রতি অতি আকর্ষণের সুবাদে সউদি আরব অন্যান্য দেশের বিশেষত দরিদ্র রাষ্ট্রের মুসলিমদের অবহেলার চোখে দেখে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সউদির ডিপ্লোম্যাটিক বন্ধুত্বের সীমাবদ্ধতা

ফিরে আসি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চরম অমানবিক ঘটনায়। জনগণের কাছে প্রতীয়মান হবে, উভয় সরকার যাই বলুক না কেন, দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্ব সামান্যই। কারণ, এক রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবর অন্য রাষ্ট্রটি মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারে। সরকারের উচিত, অবিলম্বে সউদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য যে কোনো ফৌজদারি-সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে বাংলাদেশের এমবাসিকে সময় মতো অবহিত করার দাবি জানানো। এসব পদক্ষেপের কোনোটিই অন্য দেশের আদালতের কাজে বাংলাদেশের বেআইনি হস্তক্ষেপের দাবি রাখে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশকে ডিপ্লোম্যাটিক দৃঢ়তা আর জাতীয় মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে হবে। অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর অর্থ যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নীরব থাকা নয়। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাও নিজ দেশের নাগরিকদের পক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে সরকার তার দায়িত্বকে এড়াতে পারে না। 

২০২৫ সালে বাংলাদেশ সউদি আরবে সাত লাখ ৫০ হাজারের বেশি কর্মী পাঠিয়েছে। হজ ও ওমরাহসহ ধর্মীয় তীর্থযাত্রাতেও দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ বজায় রেখেছে। এসব সম্পর্কের কারণে কনসুলার সহযোগিতার প্রত্যাশা আরো জোরালো হওয়া উচিত। তবে এর অর্থ এই নয়, ধর্মীয় সম্পর্কের কারণে কিংবা আমাদের কর্মীরা সউদি আরবের অর্থনীতিতে অবদান রাখে বলে বাংলাদেশের নাগরিকরা বিশেষ সুবিধা পাবে। বাংলাদেশও অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখে। আমাদের অভিবাসীদের সে দেশের আইন-কানুন, রীতি-নীতি যথার্থভাবে অনুসরণ করা ও মেনে চলা অবশ্য কর্তব্য। তবে বাংলাদেশি কোনো অভিবাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগে বাংলাদেশের স্থানীয় এমবাসিকে অবশ্যই অবহিত করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রকৃত মানদণ্ড হলো, দুই দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।


সজীব ওনাসিস : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক যায়যায়দিন

মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
লাভ রোড, ৪৪৬/ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত