স্বাস্থ্য সেবার নতুন রূপকার ডা. জুবাইদা রহমান

রাজু আলীম

মতামত

একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য শুধু আধুনিক হসপিটাল, উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। প্রকৃত সাফল্য

2026-10-18T20:54:17+06:00
2026-10-18T20:54:17+06:00
রোববার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
স্বাস্থ্য সেবার নতুন রূপকার ডা. জুবাইদা রহমান
রাজু আলীম
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৪ পিএম  
ডা. জুবাইদা রহমান। সংগৃহীত ছবি
একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য শুধু আধুনিক হসপিটাল, উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন গ্রামের এক জন কৃষক, শহরের এক জন শ্রমজীবী মানুষ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক জন গর্ভবতী নারী প্রয়োজনের মুহূর্তে সহজে চিকিৎসা পান। রোগ শনাক্ত করতে দেরি হয় না, সামান্য অসুখের চিকিৎসার জন্য পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায় না, আর জরুরি চিকিৎসার অভাবে কাউকে জীবন হারাতে হয় না। সাধারণ মানুষের জীবন ও সামর্থ্যরে সঙ্গে স্বাস্থ্য সেবার এই সংযোগ প্রতিষ্ঠা করাই একটি জনবান্ধব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে ডা. জুবাইদা রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও উদ্যোগের মধ্যে এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রতিরোধ মূলক চিকিৎসা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা শক্তিশালী করা, চিকিৎসা সুবিধার ভৌগোলিক বৈষম্য কমানো, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌছে দেয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব ভাবনা বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরো জনমুখী, সাশ্রয়ী ও কার্যকর হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।

ডা. জুবাইদা রহমানের বিশেষত্ব হলো— তিনি চিকিৎসক হিসেবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা রাখেন। ঢাকা মেডিকাল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর তিনি ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। পরবর্তী সময় লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। তার এই শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। 

বর্তমানে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি ও আলোচনায় তার অংশগ্রহণও দৃশ্যমান। প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তার একটি রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে তার বক্তব্যের মূল্যায়ন হওয়া উচিত চিকিৎসা-বিষয়ক উপলব্ধি, নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ মানুষের জন্য সেবা সহজ করার সম্ভাবনার ভিত্তিতে।

গ্রাম ও শহরের চিকিৎসা বৈষম্য কমানোর প্রয়োজন

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুযোগ-সুবিধার অসম বণ্টন। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে বিশেষায়িত হসপিটাল, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক জন রোগীকে গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে জেলা শহর কিংবা ঢাকায় আসতে হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি তাকে বহন করতে হয় যাতায়াত, আবাসন ও স্বজনদের কর্মহানির ব্যয়।

এই বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন ডা. জুবাইদা রহমান। ২০২৬ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ সোসাইটি অফ কৃটিকাল কেয়ার মেডিসিনের জাতীয় সম্মেলনে তিনি প্রতিটি জেলা ও সদর হসপিটালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৮টি জেলায় কোনো ধরনের আইসিইউ সুবিধা ছিল না। তিনি দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং আধুনিক এম্বুলেন্স ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন। 

এই বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্বাস্থ্য সেবার সুযোগকে নাগরিকের ঠিকানা থেকে আলাদা করে দেখার আহ্বান। এক জন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য তার ঢাকায় বসবাস করা কিংবা ব্যয়-বহুল চিকিৎসা কেনার সামর্থ্য থাকা উচিত নয়। জেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কার্যকর রোগী স্থানান্তর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগী দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ পাবে।

ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যকে ইতিবাচক করে তুলেছে সমস্যার এই কাঠামোগত দিকটির প্রতি মনোযোগ। চিকিৎসা সেবা কোথায় কেন্দ্রীভূত, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে কি ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন— এগুলো নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা বিস্তৃত করা স্বাস্থ্য খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মাতৃ ও শিশু সেবায় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য কর্মীর ভূমিকা

জাতি সংঘের আলোচনায় ডা. জুবাইদা রহমান পেশাদার ধাত্রীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। গর্ভধারণের পূর্ববর্তী পরামর্শ থেকে শুরু করে গর্ভকালীন পরিচর্যা, প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সময় মা ও নবজাতকের ধারাবাহিক সেবা নিশ্চিত করার কথা তিনি তুলে ধরেন। তার মতে, ধাত্রীদের শুধু সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; তাদের সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দলের অংশ করে তুলতে হবে। 

এই ধারণার বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে। গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য ঝুকি আগভাগে শনাক্ত করা গেলে জটিলতা মোকাবিলার সুযোগ বাড়ে। প্রশিক্ষিত ধাত্রী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রাথমিক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সময় উচ্চতর চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোর মাধ্যমে মাতৃ ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন।

রোগীর পাশে মানবিকতা ও তথ্য-ভিত্তিক প্ল্যান

ডা. জুবাইদা রহমানের স্বাস্থ্য ভাবনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থা ও পরিবারের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়া।

২০২৬ সালের ৩১ জুলাই থ্যালাসেমিয়া ও অন্যান্য বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য দেশব্যাপী তথ্য-ভান্ডার গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। গর্ভ অবস্থায় থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শনাক্তকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নতুন নিয়োগের প্ল্যানে থাকা স্বাস্থ্য কর্মীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরামর্শ দেন। 

চিকিৎসায় মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরা তার বক্তব্যের আরেকটি ইতিবাচক দিক। চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক শুধু ব্যবস্থাপত্র কিংবা পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর উদ্বেগ মনোযোগ দিয়ে শোনা, রোগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়া এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য পথ ব্যাখ্যা করাও উন্নত স্বাস্থ্য সেবার অংশ।

ঢাকা মেডিকাল কলেজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটিকে দক্ষিণ এশিয়ার চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশাও প্রকাশ করেন ডা. জুবাইদা রহমান। তার বক্তব্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান, গবেষণা এবং মানবিক নেতৃত্বকে এক সঙ্গে এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। 

স্বাস্থ্য সেবাকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ

স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য করার পথে অর্থনৈতিক বাধা বড় সমস্যা। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্য-ভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য ব্যয়-সংক্রান্ত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ এসেছে মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে। অর্থাৎ চিকিৎসার ব্যয়ের বড় অংশই পরিবারকে সরাসরি বহন করতে হয়েছে। 

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি হসপিটালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা সহজলভ্য করা, জরুরি চিকিৎসায় আর্থিক বাধা কমানো, দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়তা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ডা. জুবাইদা রহমানের সামনে তাই সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো- স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে ঘোষিত লক্ষ্যগুলোকে বাস্তব পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার অবকাঠামো শক্তিশালী করা, নারী স্বাস্থ্য কর্মীদের দক্ষতা কাজে লাগানো, জেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসা বাড়ানো এবং রোগ-প্রতিরোধে তথ্য-ভিত্তিক কর্মসূচি চালু করার মতো উদ্যোগ সমন্বিতভাবে এগোলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।

তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের মান, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং সেবার জবাবদিহিতার ওপর। নতুন হসপিটাল কিংবা জনবল নিয়োগের সংখ্যা দিয়ে একা সাফল্য বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে, রোগী কত দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে কি না, রোগ শনাক্ত করতে কত সময় লাগছে এবং চিকিৎসার খরচে পরিবার কতটা সুরক্ষা পাচ্ছে।

ডা. জুবাইদা রহমানকে স্বাস্থ্য সেবার নতুন রূপকার হিসেবে মূল্যায়নের ভিত্তি এখানেই। তার চিকিৎসক পরিচয়, প্রতিরোধ মূলক স্বাস্থ্য সেবার ওপর জোর, গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানোর আহ্বান এবং মাতৃ ও শিশু সেবাকে শক্তিশালী করার ভাবনা একটি জনমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় দিকগুলো সামনে এনেছে।

একটি সুস্থ বাংলাদেশ গড়তে হলে স্বাস্থ্য সেবাকে হসপিটালের সীমানা থেকে বের করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে হবে। যেখানে রোগের আগেই সচেতনতা পৌছবে, অসুস্থতার শুরুতেই চিকিৎসা মিলবে এবং অর্থের অভাবে কারো জীবন ঝুকিতে পড়বে না- সেই বাংলাদেশই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডা. জুবাইদা রহমানের ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তার ভাবনা যদি কার্যকর নীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসার নিশ্চয়তায় রূপ নেয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠার পথে সেটা হবে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।


রাজু আলীম : কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত