আগুনে যেন না পুড়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন

বৃগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ

মতামত

একটি দরজা খুলে সন্তানের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকেন মা। কারখানায় কর্মরত এক জন শ্রমিক মাস শেষে বেতন পেয়ে সন্তানের স্কুলের

2026-10-18T20:58:44+06:00
2026-10-18T20:58:44+06:00
রোববার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
আগুনে যেন না পুড়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন
বৃগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৮ পিএম  
বৃগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ
একটি দরজা খুলে সন্তানের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকেন মা। কারখানায় কর্মরত এক জন শ্রমিক মাস শেষে বেতন পেয়ে সন্তানের স্কুলের খরচ দেয়ার স্বপ্ন দেখেন। ছোট দোকানের মালিক দিনের উপার্জন দিয়ে সংসার চালান। এক জন উদ্যোক্তা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে গড়ে তোলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার ওপর নির্ভর করে বহু পরিবারের জীবিকা। একটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, গ্যাসের অসতর্ক ব্যবহার কিংবা সামান্য অবহেলা মুহূর্তেই এসব মানুষের জীবন ও স্বপ্নকে বিপন্ন করে দিতে পারে।

আগুনে শুধু ঘর, দোকান বা কারখানা পোড়ে না; হারিয়ে যেতে পারে পরিবারের আশ্রয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘদিনের সাধনায় গড়ে ওঠা জীবিকার অবলম্বন। কোনো ভবনে মানুষ আটকে পড়লে বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে অসহনীয় উৎকণ্ঠার। আগুন একসময় নিভে যায়, কিন্তু হারানো প্রাণ ফিরে আসে না; স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা সর্বস্ব হারানোর অসহায়ত্বও সহজে দূর হয় না।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের কাছে আমার আন্তরিক আহ্বান— অগ্নিনিরাপত্তাকে দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করুন। বাংলাদেশের মতো শ্রম, উদ্যোগ ও সীমিত সম্পদের ওপর দাড়িয়ে এগিয়ে চলা দেশে প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি জীবিকা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মূল্য অপরিসীম। সেই অর্জন রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত মানবিক, সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব।

প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে একটি পরিবার

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে— প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৪টি। এসব ঘটনায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ২৬৭ জন। আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার ২৬৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অগ্নি দুর্যোগের ব্যাপকতা এবং তা মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ অবদান তুলে ধরে।

একই বছরের তথ্যে দেখা যায়, বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে ঘটেছে নয় হাজার ৩৯২টি অগ্নিকাণ্ড— মোট ঘটনার প্রায় ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। আবাসিক ভবনে আগুনের সংখ্যা ছিল আট হাজার ৭০৫টি। পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন ও স্থাপনার মধ্যে ৬২২টি অতি ঝুকিপূর্ণ এবং তিন হাজার ৩১৬টি ঝঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ, পরিদর্শিত স্থাপনাগুলোর প্রায় ৩৭ শতাংশ ঝঁকিপূর্ণ বা অতি ঝুকিপূর্ণ ছিল। এই হিসাব দেশের সব ভবনের প্রতিনিধিত্ব না করলেও নিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়।

আগুন লাগার আগেই দায়িত্ব নিতে হবে

অগ্নিকাণ্ডের পর দ্রুত পৌছানো, আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে আগুন লাগার আগেই ঝুকি শনাক্ত ও সংশোধন করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কত দ্রুত আগুন নেভানো গেল, তার পাশাপাশি কতটি বিপর্যয় প্রতিরোধ করা সম্ভব হলো, সেটিও অগ্নি নিরাপত্তার সাফল্যের মানদণ্ড হওয়া উচিত।
বৈদ্যুতিক তার ও সংযোগ পরীক্ষা, গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার, দাহ্য পদার্থের সঠিক সংরক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল রাখা এবং জরুরি বহির্গমন পথ বাধামুক্ত রাখার মতো পদক্ষেপ বহু দুর্ঘটনার ঝুকি কমাতে পারে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জরুরি; সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধ করাও সমান জরুরি।

বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। বহুতল ভবন, শিল্প-কারখানা, বিপণি বিতান ও ঘন বসতিপূর্ণ জনপদ বাড়ছে। এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে নিরাপত্তার প্রস্তুতিকেও এগিয়ে নিতে হবে। 

নিরাপত্তায় বিনিয়োগ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা

ভবন মালিক, উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান— অগ্নিনিরাপত্তার জন্য পরিকল্পিত অর্থ বরাদ্দ রাখুন। আপনাদের সিদ্ধান্তের ওপর কর্মী, ক্রেতা, বাসিন্দা এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নির্ভর করে।

নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাজেটে উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সতর্ক সংকেত, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে। সরঞ্জাম কেনার পর সেগুলো সচল রাখা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং ব্যবহারের দক্ষতা নিশ্চিত করতেও অর্থ ও তদারকি প্রয়োজন। 

পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের ঘর থেকে

প্রত্যেক নাগরিককে নিজের ঘরের নিরাপত্তা পর্যালোচনার অনুরোধ জানাই। বৈদ্যুতিক তার ও সুইচের অবস্থা কেমন? একই সংযোগে একাধিক উচ্চ ক্ষমতার যন্ত্র চলছে কি? গ্যাসের চুলা, পাইপ ও সংযোগ পরীক্ষা করা হচ্ছে কি? সিড়ি, করিডোর, ছাদে যাওয়ার পথ কিংবা জরুরি বহির্গমন পথে মালামাল জমে আছে কি?

আবাসিক ভবন, দোকান ও কর্মস্থলে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকারিতা এবং ব্যবহারকারীর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিবারের সবাইকে নিরাপদে বের হওয়ার পথ ও বাইরে সমবেত হওয়ার স্থান জানাতে হবে। শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার ব্যবস্থা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। বিপদের মুহূর্তে এই প্রস্তুতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

শ্রমিকের নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করুন

এক জন শ্রমিক কারও মা, বাবা, সন্তান কিংবা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। কাজ শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব।

কারখানা ও গুদামে জরুরি বহির্গমন পথ বাধামুক্ত এবং কর্মী উপস্থিত থাকা অবস্থায় সহজে খোলার উপযোগী রাখতে হবে। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা, দাহ্য ও রাসায়নিক পদার্থের পৃথক ও নিরাপদ সংরক্ষণ এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও বাস্তবসম্মত মহড়ায় অংশ নিতে হবে, যাতে তারা জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বেরিয়ে আসার পদ্ধতি জানেন। মহড়ায় ধরা পড়া ঘাটতি সংশোধনও করতে হবে। এমন কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে কর্মীরা নির্ভয়ে নিরাপত্তার ত্রুটি জানাতে পারেন এবং কর্তৃপক্ষ তাদের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। প্রতিদিন কর্মস্থলে থাকা মানুষের পর্যবেক্ষণ ঝুকি শনাক্তে মূল্যবান সহায়তা দিতে পারে।

নিয়মের বাস্তব প্রয়োগে প্রতিষ্ঠিত হোক আস্থা

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০-সহ প্রযোজ্য আইন, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি এবং ভবন নিরাপত্তার শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অনুমোদন বা সনদ সংগ্রহের পাশাপাশি বাস্তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা অপরিহার্য।

রাসায়নিক গুদাম, হসপিটাল, পোশাক কারখানা, বিপণি বিতান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বহুতল ভবনে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যকর করা জরুরি। ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সময় অগ্নিনিরাপত্তা বিবেচনা এবং ব্যবহারের পর নিয়মিত তদারকি— দুটিই প্রয়োজন। ভবনের ব্যবহার, বৈদ্যুতিক লোড কিংবা অভ্যন্তরীণ বিন্যাস বদলালে নতুন ঝুকি মূল্যায়ন করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মাণের সময় নিরাপদ থাকা ভবনও পরে অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষ উদ্ধার ব্যবস্থা ও উদ্ধারকারীর সুরক্ষা

প্রতিরোধের পাশাপাশি দ্রুত ও দক্ষ উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। ফায়ার সার্ভিসের ২০২৬ সালের ২ মার্চ হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালু ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ছিল ৫৩৮টি। এই সেবাকে কার্যকর করতে প্রতিটি স্টেশনে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল, সচল যানবাহন, উপযুক্ত সরঞ্জাম এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। আধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যক্ষমতা পরীক্ষা যুক্ত থাকতে হবে। প্রতিটি স্টেশনের যানবাহন ও সরঞ্জামের অবস্থা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রস্তুতির ঘাটতি শনাক্ত ও সংশোধন সহজ হবে।

উদ্ধার কাজে নাগরিকদের সহযোগিতা জরুরি

অগ্নিকাণ্ডের সময় নাগরিকদের সহযোগিতা উদ্ধার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্ধার যানের চলাচলের পথ খোলা রাখুন, ঘটনাস্থলে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলুন এবং উদ্ধারকারীদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। জরুরি অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার সেবার জন্য দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে জানান এবং ঘটনার সঠিক অবস্থান ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিন। পরিবার, ভবন মালিক, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। 

মহাপরিচালক হিসেবে দেশের সব নাগরিকের প্রতি আমার আন্তরিক আবেদন- নিজের ঘর ও কর্মস্থলের ঝুকি চিহ্নিত করুন, নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখুন, প্রযোজ্য নিয়ম মেনে চলুন এবং ত্রুটি সংশোধনে বিলম্ব করবেন না। বিপদের সময় আমাদের সদস্যরা আপনাদের পাশে দাড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন; আগুন প্রতিরোধে আপনাদের সচেতন অংশগ্রহণ সেই প্রচেষ্টাকে আরো শক্তিশালী করবে।

আসুন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তা এগিয়ে চলে— যেন আগুনে কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ, কোনো শ্রমিকের জীবিকা কিংবা বাংলাদেশের স্বপ্ন পুড়ে না যায়।

লেখক-

বৃগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ:মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর 
মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত