প্রতীকী ছবি ঢাকার একটি অভিজাত এলাকা। বাইরে রোদের ঝিলিক, ঘরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শান্ত পরিবেশ। একটা ফুল মাগ ব্ল্যাক কফি হাতে আরাম করে বসলেন রিমি। সুশিক্ষিত, মার্জিত এবং অত্যন্ত মমতাময়ী হিসেবে তাঁর সুপরিচিতি। স্বামী ও সন্তান নিয়ে সংসারটি যেন এক টুকরো সুখের নীড়।
চুমুকের মাঝেই ফোনটি বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে আছে মায়ের মুখ। রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে মা বললেন, "রিমু, তোর বড় মামা খুব অসুস্থ। ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে চিকিৎসার জন্য। তোর বাসায় উঠতে চাচ্ছেন। বলছিলেন, ভাগ্নি এত বড় জায়গায় থাকে, ওখানে থেকে চিকিৎসাটা করালে সুবিধা হতো।"
মায়ের কথাগুলো শুনছেন রিমি, কিন্তু তিনি যেন কোথায় হারিয়ে গেছেন। চোখের সামনে ভেসে উঠছে প্রায় ৩০ বছর আগের একটি গ্রাম, মাটির দেয়ালঘেরা উঠান আর এক নির্মম বিকেল।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা; অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় রিমি বললেন, "মা, উনাকে আমার বাসায় আসতে বারণ করে দাও। তিনি যেন আমার এখানে না আসেন।"
মা অবাক হয়ে কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু রিমি ততক্ষণে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।
সেই থেকে সারাদিন রিমির মনটা অত্যন্ত বিষণ্ণ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত মমতাময়ী মানুষ, কিন্তু সেই তিনিই কেন নিজের আপন বড় মামার প্রতি এত কঠোর হলেন? তাঁর ব্যক্তিত্বের সাথে এটা খুবই বেমানান। রিমির স্বামীও অত্যন্ত শিক্ষিত, সম্মানিত ও দয়ালু মানুষ; রাতে খাবার টেবিলে স্ত্রীর বিমর্ষ মুখটার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন, "মামাকে আসতে বললেই তো ভালো হতো, তাই না? মানুষটা অসুস্থ, তাছাড়া মুরুব্বিদের প্রতি এটা আমাদের দায়িত্ব।"
রিমি চুপ করে রইলেন; চোখে জল জমে আছে।
"কী হয়েছে? তুমি তো এমন নও। একজন মানুষের বিপদে কেন এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলে?"
রিমি স্বামীর দিকে তাকালেন। কণ্ঠ কেঁপে উঠল; বললেন, "আমি ওই মানুষটাকে ঘৃণা করি; শুধু ঘৃণা নয়, তীব্র ঘৃণা করি। ছোটবেলায় খুব সামান্য একটা দুষ্টুমি করেছিলাম, কিন্তু সেই অপরাধে মামা আমাকে নির্মমভাবে মেরেছিলেন; গায়ে-হাতে আমার লাল দাগ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু গায়ের আঘাতের চেয়েও বেশি ছিল তীব্র অপমান। সেই আতঙ্ক আর চরম অপমান আজও ভুলতে পারিনি। এখনও তাঁর কথা মনে হলে সেই অপমানের স্মৃতিই ভেসে ওঠে, ভেতরটা কেঁপে ওঠে।"
স্বামী ভদ্রলোক স্ত্রীর চেহারার দিকে তাকিয়ে খাবার মুখে তুলতে ভুলে গেছেন। যে শারীরিক ও মানসিক আঘাত সেই শিশুটি পেয়েছিল, তা হয়তো এক সপ্তাহে শুকিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু যে ক্ষত তাঁর মনে গেঁথে আছে, তা ৩০ বছর পরও রক্তাক্ত!
কিন্তু কেন সেই বড় মামা তেমন নির্দয় আচরণ করেছিলেন?
মাত্র দুই দশক আগেও এদেশের বাবা-মা শিশু পালন বিষয়ে এক অদ্ভুত নিয়ম মেনে চলতেন; সেটা ছিল সত্যিই এক অদ্ভুত সংস্কৃতি। তবে শুধু বাংলাদেশ বা এই বঙ্গভূমিতেই এমন কালচার ছিল তা নয়, বরং কালেক্টিভিস্ট (একান্নবর্তী) সোসাইটিগুলোর প্রায় সব জাতির মাঝেই এমন নিয়ম লক্ষ্য করা যায়। আমাদের প্রাচীন অভিভাবকেরা মনে করতেন, শিশুদের কঠোর শাসনের মাঝে বড় করাই সঠিক নিয়ম। সেকালে পড়াশোনার জন্য বাবা তাঁর শিশু সন্তানকে স্কুলের শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে অবলীলায় বলতেন, "পণ্ডিতজি, এর মাংস আপনার, আর এর হাড্ডি শুধু আমার।"
এই একটিমাত্র প্রবাদই বুঝিয়ে দেয় সেকালের শিক্ষার পরিবেশ কিংবা শিশুদের জন্য পারিবারিক পরিবেশগুলো কেমন ছিল। আমার অত্যন্ত স্নেহের এক আত্মীয় আরিয়ান; সে মা-বাবার একমাত্র ছেলে। বাবা পদস্থ বড় চাকরিজীবী, মা স্কুলের শিক্ষিকা। ছোটবেলায় আরিয়ান ছিল বেশ চটপটে; মা বলতেন সে নাকি অত্যন্ত দুষ্টু, তাই শাসন করার জন্য মা আরিয়ানকে একটু বেশিই প্রহার করতেন। আজও আরিয়ান তার মায়ের কথা বলতে গিয়ে স্পষ্ট বলে দেয় যে, মা তাকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে প্রহার করতেন। ভাবতে খুব অবাক লাগছে, তাই না? কিন্তু না, আজও এদেশে অনেক অভিভাবক ঠিক একই আচরণ করেন। তাঁরা মনে করেন, শিশু-কিশোরদের শাসন করার সেরা পথ হলো প্রহার করা; তারা মনে করেন, শাসন ছাড়া শিশুরা অবাধ্য আর বখাটে হয়ে যায়। কিন্তু শাসন মানেই যে শারীরিকভাবে আঘাত করা—সেই মানসিকতা কীভাবে এল?
আসলে আমাদের প্রাচীন অভিভাবকগণ নিজেরা এমন পরিবেশে বড় হয়েছিলেন, যেখানে প্রায় সব পরিবারেই অনেক শিশু থাকত এবং একই সাথে সেই সব বাবা-মা অধিকাংশই ছিলেন চরম দারিদ্র্যের শিকার। খাবারের জোগান করতেই তাদের দিন-রাত পরিশ্রম করতে হতো। দারিদ্র্য ও দুর্ভোগের সেই জীবনে ক্লান্ত দেহে তারা যখন ঘরে ফিরতেন আর অনেকগুলো শিশু যখন বিশৃঙ্খলভাবে হইচই করত, নিজেদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে বিবাদ করত, কেউ হয়তো গাছে চড়তে গিয়ে হাত বা পা ভেঙে ফেলত—তো এই ধরনের পারিবারিক পরিস্থিতির সামনে বাবা-মা সব সময় কিছুটা অস্থির থাকতেন। অতিরিক্ত বিরক্ত হয়ে শিশুদের শান্ত রাখার কৌশল হিসেবে হয়তো একজনকে হঠাৎ প্রহার করতেন; আর তা দেখে অন্য শিশুরা ভয় পেয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হতো। হয়তো এভাবেই ধীরে ধীরে এটি একটি পদ্ধতি বা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল।
আমার শৈশবে আমরা প্রায়ই ‘স্কুল-স্কুল’ খেলতাম। সেখানে একজন শিক্ষক সাজত, কয়েকজন ছাত্র সাজত। যে শিক্ষক হতো তার মাথায় কিছুটা ময়দা দিয়ে চুল সাদা করে দেওয়া হতো, গোঁফ আঁকা হতো, জামার বুকপকেটে একটা কলম আর হাতে থাকত লম্বা একটা কঞ্চির লাঠি। একজন শিক্ষক মানেই একটা লম্বা বেত তার হাতে থাকতেই হবে! খেলার শুরুতে সেই শিক্ষক ছাত্রদের কিছু পড়া করার আদেশ দিত, তারপর পড়ার ব্যর্থতায় ছাত্রদের হাতের তালুতে সেই লাঠি দিয়ে প্রহার করার খেলা চলত। আজ সেসব কেমন অবিশ্বাস্য মনে হয়! ভাবতে পারেন, কোনো একটা কুপ্রথা সংস্কৃতির কতটা গভীরে গেলে এমনকি শিশুরাও তাদের খেলার মধ্যে সেটি অবলীলায় চর্চা করে?
যৌথ পরিবারের ইতিবাচক দিক এবং শাসনের নির্মম বাস্তবতা
অবশ্য ভয়ঙ্কর শাসন ও প্রহারের সংস্কৃতি থাকলেও সেকালের সমাজে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ইতিবাচক দিকও ছিল—তা হলো একান্নবর্তী পরিবার। একসঙ্গে বসবাস করার কারণে পরিবার ও সমাজের মানুষ নিবিড়ভাবে একে অপরের পাশে থাকত। বাবা, চাচা বা বড়রা যেমন শাসন করতেন, তেমনি বিপদে-আপদে কিংবা যেকোনো প্রয়োজনে তাঁরাই বুক আগলে রক্ষা করতে এগিয়ে আসতেন। সেটিও ছিল এক অকৃত্রিম সামাজিক সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতির মানুষের জীবনযাত্রা ছিল গণ্ডিভুক্ত; অধিকাংশ মানুষ সারা জীবনে হয়তো তাঁর গ্রামের চারপাশের ২০ কিলোমিটারের বাইরে কোনো দিন ভ্রমণ করেননি। সেটি ছিল একটি সংকুচিত, কিন্তু নিবিড় দলবদ্ধ জীবন।
ঐতিহ্যগত সেই দলবদ্ধ সংস্কৃতির কিছু ইতিবাচক শক্তি ও সামাজিক বন্ধন থাকলেও, তার সবচেয়ে বড় ভয়াবহতা ছিল শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর ও কঠোর আচরণ। প্রহারকে শাসন বা শিক্ষার মূল হিসেবে দেখা হতো। শিশুদের কোমল আবেগ এবং ভালোবাসার অধিকারকে প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হতো।
মনোবিজ্ঞান বলছে, শিশুদের প্রতি এই ধরনের কঠোর ও শারীরিক আচরণের প্রতিক্রিয়া হয় অত্যন্ত মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী:
• আত্মবিশ্বাস ও চিন্তার স্বাধীনতা ধ্বংস: শারীরিক নির্যাতন বা কঠোর প্রহার শিশুর আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়। সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে বা নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়; তার জীবন থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতা মুছে যায়।
• আজীবন ট্রমা ও মানসিক ব্যাধি: শৈশবের ভয় ও অপমানের অভিজ্ঞতা অনেক সময় আজীবন স্থায়ী মানসিক ট্রমা (PTSD) বা দুশ্চিন্তার জন্ম দেয়, যা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও তাদের পিছু ছাড়ে না। বাহ্যিকভাবে সফল হলেও মানুষটি আজীবন মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত থেকে যায়।
• সহিংসতার পুনরাবৃত্তি (Cycle of Violence): ছোটবেলায় যারা কঠোরতা ও মারধরের শিকার হয়, তাদের মস্তিষ্ক কঠোরতা এবং নির্মমতাকেই 'স্বাভাবিক আচরণ' বলে ধরে নেয়। ফলে তারা নিজেরাও পরবর্তীতে সন্তান বা অধীনস্থদের ওপর একই রকম হিংস্র বা কঠোর আচরণ প্রয়োগ করতে শুরু করে।
পারিবারিক লালন-পালনে আমাদের শিক্ষণীয়
রিমির গল্পটি কোনো কাল্পনিক কাহিনী নয়, এটি আমাদের সমাজেরই এক জ্যান্ত বাস্তবতা। আজও অনেক মা-বাবা ও অভিভাবক মনে করেন সন্তানকে শাসন করার সেরা উপায় হলো গায়ে হাত তোলা, প্রহার করা বা বকাবকি করা। কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি যে অত্যন্ত ভয়াবহ, তা রিমির ট্রমা থেকেই স্পষ্ট। তাই আপনার শিশুকে লালন-পালন করার ক্ষেত্রে সর্বদা মনে রাখুন:
অপমান সম্পর্কের মৃত্যু ঘটায়: শাসনের নামে বকা দেওয়া বা প্রহার করার পদ্ধতি শিশুর মনে দীর্ঘমেয়াদী অপমানের অনুভূতি তৈরি করে। তা কেবল জন্ম দেয় ভয়, দূরত্ব ও ক্ষোভের। বড় হয়ে সেই শিশুটি সামাজিকভাবে যত সফলই হোক না কেন, নির্যাতনকারী অভিভাবক বা আত্মীয়ের প্রতি স্বাভাবিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভবের সক্ষমতা স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলে।
শরীরের দাগ মেটে, মনের ক্ষত থেকে যায়: প্রহার করলে শারীরিক ব্যথা কয়েক দিনে হয়তো কমে যায়, কিন্তু শৈশবের অপমান ও ভয় মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে স্থায়ী দাগ ফেলে রাখে। এটি প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শান্তিতে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়।
ভয় নয়, নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ুন: অভিভাবকের সাথে শিশুর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও স্নেহের। কিন্তু শারীরিক শাসন সেই সম্পর্ককে রূপান্তর করে আতঙ্কে। ফলে পরিণত বয়সে লোকদেখানো দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, হৃদয়ের সেই মহামূল্যবান সুতোটি স্থায়ীভাবে ছিঁড়ে যায়।
লেখক পরিচিতি:
এ ইউ দৌলা
মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক