প্রতীকী ছবি একটি জাতির আত্মার গভীরতা মাপা হয় তার নারীর চোখের আলোয়। সেই আলোয় যদি ভয় থাকে, তবে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যান মিথ্যা হয়ে যায়; আর সেই আলোয় যদি আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি থাকে, তবে একটি জাতি অপরাজেয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের নারী আজ আর কেবল ঘরের কোণে প্রদীপ জ্বালান না, তিনি রাষ্ট্রের দীপশিখা হাতে এগিয়ে চলেছেন। একজন নারী গবেষক হিসেবে আমি প্রতিদিন দেখি, কীভাবে আমার বোনেরা প্রতিকূলতাকে জয় করে জ্ঞান, শ্রম ও মেধায় নতুন বাংলাদেশ গড়ছেন। এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারা, যার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচনা করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল - বিএনপি। আর আজ সেই ঐতিহ্যের পতাকাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক, দেশনায়ক তারেক রহমান।
নারী জাগরণ : বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের হৃদস্পন্দন :
বিএনপির রাজনীতি কখনোই নারীকে করুণার পাত্র ভাবেনি; ভেবেছে শক্তির আধার হিসেবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ কখনোই পূর্ণ হবে না যদি নারীকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রাখা হয়। তাই ১৯৭৮ সালে তিনি যখন মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তা ছিল কেবল একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা নয়, ছিল একটি রাষ্ট্রদর্শনের ঘোষণা। এশিয়ার মধ্যে অন্যতম প্রথম এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই নারীকে রাষ্ট্রের মূলধারায় আনার স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় আজ নারীর উন্নয়ন কোনো দয়ার প্রকল্প নয়, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
শহীদ জিয়া : যে মানুষটি নারীকে রাষ্ট্রের নীতিতে স্থান দিলেন : স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নারীরা ছিলেন সবচেয়ে অবহেলিত। সেই সময়ে শহীদ জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, নারীকে বাদ দিয়ে উৎপাদনের রাজনীতি সম্ভব নয়। তিনি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা এবং গ্রামীণ নারীদের জন্য স্বনির্ভর কর্মসূচি চালু করেন। তাঁর সময়েই পোশাক শিল্পে নারীর কর্মসংস্থানের দুয়ার খোলে, যা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে একটি পরিবারকে শিক্ষিত করা, আর একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা মানে একটি জাতিকে স্বাবলম্বী করা। এই দূরদর্শিতাই বিএনপির নারী রাজনীতির প্রথম পাঠ।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া : আপসহীন নেত্রী থেকে নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা : যদি শহীদ জিয়া হন ভিত্তি, তবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই ভিত্তির ওপর নির্মিত সুরম্য প্রাসাদ। মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারী কেবল রান্নাঘর সামলাতে পারেন না, রাষ্ট্রও সামলাতে পারেন দৃঢ় হাতে। ১৯৯৪ সালে তাঁর সরকার দেশব্যাপী মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করে, যা বাংলাদেশের নারী শিক্ষার ইতিহাসে এক নীরব বিপ্লব। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই একটি কর্মসূচির ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তির হার ৩০% থেকে বেড়ে ৬০% এর বেশি হয় এবং বাল্যবিবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। গ্রামের যে বাবা মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে দ্বিধা করতেন, তিনিই রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় মেয়ের হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন। এটি ছিল খালেদা জিয়ার মমতাময়ী রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি।
তারেক রহমান : উত্তরাধিকার থেকে অঙ্গীকারের নতুন দিগন্ত : ইতিহাস কেবল অতীতকে স্মরণ করে না, ভবিষ্যৎকে নির্মাণও করে। শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি, দেশনায়ক তারেক রহমান সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। লন্ডনে নির্বাসিত জীবনেও তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তের নারীর কান্না শুনেছেন, তাঁদের স্বপ্নকে ধারণ করেছেন। গত ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের বৈঠকে ষষ্ঠ থেকে স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের উপবৃত্তি পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের যে ঐতিহাসিক নির্দেশ তিনি দিয়েছেন, তা কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, এটি একটি প্রজন্মের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার। তিনি জানেন, আজকের কিশোরীই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, ডাক্তার, পাইলট ও প্রধানমন্ত্রী। তাই তাঁর ভিশন - শিক্ষার কোনো স্তরেই যেন অর্থের অভাবে একটি মেয়েও ঝরে না পড়ে।
ফ্যামিলি কার্ড : নারীর হাতে অর্থনৈতিক মুক্তির চাবি :
একজন নারী গবেষক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শিক্ষা মুক্তি দেয় মনে, আর অর্থনীতি মুক্তি দেয় জীবনে। তারেক রহমানের ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সেই দ্বিতীয় মুক্তির চাবি। নারীপ্রধান পরিবারের নামে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান মানে কেবল টাকা দেওয়া নয়, পরিবারের ভেতরে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, নারীর হাতে অর্থ গেলে তার ৯০% ব্যয় হয় সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে। তাই ফ্যামিলি কার্ড কোনো ভাতা নয়, এটি একটি বিনিয়োগ - আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। এর সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং যুক্ত হলে গ্রামের গৃহিণীও হয়ে উঠবেন উদ্যোক্তা।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বাংলাদেশের নারী ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি : আবেগের পাশাপাশি তথ্যও কথা বলে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী ১৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২৪তম অবস্থানে উঠে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৪৪.২%। ইউনিসেফের MICS ২০২৫ অনুযায়ী ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের মধ্যে ৩৭.৬% এর আইসিটি দক্ষতা রয়েছে। এই অগ্রগতির ভিত্তি রচিত হয়েছিল বিএনপির সময়ে। কিন্তু এখনো ৯৬.৬% নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি বা সামাজিক সুরক্ষা নেই। তারেক রহমানের সরকার এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করছে - কর্মসংস্থান নয়, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানই তাঁর লক্ষ্য।
অদৃশ্য অর্থনীতির দৃশ্যমান নায়িকা : বিবিএস ও ইউএন উইমেনের যৌথ হিসাবে ২০২১ সালে নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজের মূল্য ছিল ৬.৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ১৮.৯%। নারীরা পুরুষের চেয়ে সাত গুণ বেশি সময় এই কাজে দেন। এই শ্রমের কোনো মজুরি নেই, কোনো স্বীকৃতি নেই। তারেক রহমান এই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করতে চান। তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে প্রতিটি উপজেলায় সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ডে-কেয়ার সেন্টার, কমিউনিটি কেয়ার হাব এবং কর্মক্ষেত্রে নমনীয় সময়। তিনি বোঝেন, নারী যখন নিশ্চিন্তে সন্তানকে নিরাপদ স্থানে রেখে কাজে যেতে পারবেন, তখনই দেশের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ হবে। এটি নারীর প্রতি করুণা নয়, অর্থনীতির প্রতি বুদ্ধিমত্তা।
জিয়া পরিবার : ত্যাগ, মূল্যবোধ ও নারীর প্রতি সম্মানের বাতিঘর : নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বিএনপির অঙ্গীকারকে বুঝতে হলে জিয়া পরিবারকে বুঝতে হবে। শহীদ জিয়ার সততা, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আপসহীনতা ও মমত্ববোধ, ডা. জোবাইদা রহমানের মতো উচ্চশিক্ষিত, বিনয়ী ও মানবিক চিকিৎসকের নীরব সমাজসেবা এবং তারেক রহমানের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা - এই পরিবারটি বাংলাদেশের নারীর কাছে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের নাম। ডা. জোবাইদা রহমান নিজে একজন সফল চিকিৎসক ও গবেষক হয়ে প্রমাণ করেছেন, একজন নারী কীভাবে পরিবার, পেশা ও দেশপ্রেমকে একসূত্রে গাঁথতে পারেন। তাঁদের পরিবারে নারী কখনো পেছনের সারিতে নন, তিনি সহযোদ্ধা। এই মূল্যবোধই তারেক রহমানের রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয় - যেখানে নারীকে ভোটব্যাংক নয়, राष्ट्र গঠনের অংশীদার ভাবা হয়।
নিরাপত্তা ও মর্যাদা : যে বাংলাদেশের স্বপ্ন তারেক রহমান দেখেন : বিবিএস ও ইউএনএফপিএর ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪ বলছে, ৭৬% নারী জীবনে কোনো না কোনো সময় অন্তরঙ্গ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং ৪৯% গত ১২ মাসে শিকার হয়েছেন, যার দুই-তৃতীয়াংশ কাউকে বলেননি। এই নীরব কান্না তারেক রহমান শুনতে পান। তাই তাঁর অঙ্গীকারে রয়েছে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সংস্কার, প্রতিটি জেলায় ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ভুক্তভোগীর জন্য বিনামূল্যে আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং স্কুল কারিকুলামে সম্মতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা। তিনি চান, কোনো মেয়ে যেন ভয় নিয়ে বাসে না ওঠে, কোনো নারী যেন কর্মস্থলে হয়রানির শিকার হয়ে চাকরি না ছাড়ে। নিরাপত্তা ছাড়া ক্ষমতায়ন অর্থহীন - এই সত্যটি তাঁর নীতির কেন্দ্রে।
পরিশেষে, আমি একজন নারী, একজন গবেষক, একজন সাংবাদিক - প্রতিদিন আমার কলমে আমি সেই বাংলাদেশের ছবি আঁকি, যেখানে আমার মেয়ে অর্থের অভাবে পড়া ছাড়বে না, যেখানে আমার বোন তার শ্রমের ন্যায্য মজুরি পাবে, যেখানে আমার মা নিরাপদে রাস্তায় হাঁটবেন। এই বাংলাদেশের স্বপ্নই তারেক রহমান দেখেন। শহীদ জিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, বেগম খালেদা জিয়ার শিক্ষা বিপ্লব এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড ও উপবৃত্তি সম্প্রসারণ - এই তিন প্রজন্মের ধারাবাহিকতাই বিএনপির নারী রাজনীতির সৌন্দর্য। আসুন, আমরা ইসলামের ন্যায়বিচার, আধুনিকতার যুক্তি ও গণতন্ত্রের সমতার আদর্শকে এক করে সেই বাংলাদেশ গড়ি, যেখানে নারীকে আর ক্ষমতায়নের জন্য লড়তে হবে না, কারণ রাষ্ট্র নিজেই তাঁর ক্ষমতায়নের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে। সেই বাংলাদেশই হবে শহীদ জিয়ার স্বপ্নের, আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামের এবং তারেক রহমানের অঙ্গীকারের বাংলাদেশ।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক