শাহীন রাজাসময়টা নব্বই দশকের একেবারে শেষ দিক। হেমন্তের সন্ধ্যা। উষ্ণ আলোকে দুরে ঠেলে শীতল আঁধার নামছে ধীরে,ধীরে। এমন এক সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবে লাউঞ্জে আড্ডা চলছে। তবে সংখ্যায় গোটা কয়েকজন হবে। যে কজন আড্ডা দিচ্ছিলেন তাঁদের সকলেই বয়সী। তরুণ এবং মধ্য বয়সীরা যে যার কার্যালয়ে চলে গেছে। দু-একজন যে নেই, তা-ও না। এদের মধ্যে, কারো হয়তো ডে অফ। কেউ আবার সদ্য বেকার ! চা, সিঙ্গারা আর ধুমপান চলছে অবিরাম (আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময় লাউঞ্জে ধুমপান নিষিদ্ধ ছিল না)। এমন হেমন্তের সন্ধ্যায় সাধারণ পোশাকে এক জেনারেল লাউঞ্জে চলে আসেন। হ্যাঁ, তিনি একজন সামরিক বাহিনীর মেজর জেনারেল। তবে অবসরপ্রাপ্ত। উনি কার কাছে বা কেন এসেছেন, তা কেউ জানে না। জেনারেলকে দেখেই এক সাংবাদিক নেতা ত্রস্ত পায়ে পেছনের দরজা দিয়ে দ্রুত পা বাড়ান! ছুট দেয়া নেতাকে উদ্দেশ্য করে জেনারেল হাঁক দিয়ে বলেন, "আরে ভাই আমাকে দেখে ভাগছেন কেন ? এলাম, এক কাপ চা কি জুটবে না ! আপনাদের এখানে এলাম, আর আপনে চলে যাচ্ছেন"!
এর ক্ষানিকটা পর জেনারেল সাহেব সাংবাদিক নেতাকে বলেন, "ভাই সব কিছুই কি ভুলে গেলেন ? আপনিতো প্রায়ই বলতেন, দেশে এ-তো অনিয়ম আপনারা ক্ষমতা নেন না কেন ? (৯১-এ বিএনপি সরকার আমলের কথা)। এই কথা বলার জন্য কতদিন আমাদের পাড়ায় গেছেন। আর এখন আমাকে না চেনার চেষ্টা করছেন ! এরপর গলাটা আরও একটু উচিয়ে, উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন। সাংবাদিক সাহেবরা শুনেন, বাংলা এবং ইংরেজি পত্রিকার দুই সম্পাদক কয়েকদিন পরপর ফোন করতেন। আর জানতে চাইতেন,আপনারা কবে আসছেন" ? এক ছোকরা ডেঁপো সাংবাদিক প্রশ্ন করে বসে, "নাম বলছেন না কেন ? দেশে-তো অনেক ইংরেজি এবং বাংলা সংবাদপত্র আছে"। "ছোট ভাই আপনি-ও জানেন এবং এখানে বসা সবাই ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন, আমি কাদের কথা বলছি। আমার মুখ থেকে নাম শুনতে চেয়ে লাভ হবে না। আমি তাঁদের নাম বলবো না।
শুধু এইটুকু বলি, "এর মধ্যে একটি পত্রিকা পুরুলিয়া এয়ার ড্রপিং নিয়ে সিরিজ নিউজ করেছে। সেখানে উল্লেখ করেছে গাজীপুরের ছাপ দেয়া গ্রেনেড পাওয়া গেছে। যা ওপারের বিচ্ছিন্ন বাদীদের সহযোগিতার জন্য পুরুলিয়ায় ফেলা হয়েছে। এই নিউজটা সম্পুর্ন অসত্য। এরা নিজ দেশের বিরুদ্ধে কেমনে এই ধরনে নিউজ করে ! আবার পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের নিয়ে নিয়মিত মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করছে"।
দুইহাজার ছাব্বিশে এসে আমরা দেখছি, নতুন করে আবার-ও একই ঘটনা। তবে এবার আর সংবাদপত্রে নয়। চলছে সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার। এরা সবাই পুরোনদের উত্তরসূরি। পূর্বদের ধারাবাহিকতা শুধুমাত্র। সামাজিক মাধ্যমে তারা ভুল তথ্য প্রচার করে চলছে। তারা প্রচার করছে, পহেলা অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত দরবার হলের দরবারে সামরিক কর্মকর্তারা বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছে। এরমধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সেনা কর্মকর্তাদের বিচার ও সরকারি আদেশ পালনকারীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা। ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এ যুক্ত হওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি ও সাধারণ মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে দীর্ঘ নয় মাসের অচলাবস্থা। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক পুনঃনিয়োগের ফলে দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার ঝুঁকি। এবং সেনাবাহিনীতে ইসলামাইজেশন নীতির উৎস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে কথা উঠেছে। কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমন কোন কথাই হয়নি। সবটাই বানোয়াট এবং নিজস্ব মনগড়া অপপ্রচার।
১ অক্টোবর ২০২৬ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সভাপতিত্বে নিয়মিত কোয়ার্টারলি (ত্রৈমাসিক) দরবার অনুষ্ঠিত হয়। শোনা যায় এই সভা ৫ অক্টোবর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেনা প্রধানের বিদেশ সফর থাকায় সভাটি এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও সেনাবাহিনীর ভেরিফায়েড পেজের তথ্য অনুযায়ী, এই দরবারে সেনাসদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজ নিজ কর্তব্য পালনের সাধারণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
এই অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সেনাবাহিনী সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্ত ছড়ানো। মানুষের মনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলা। যাতে সেনাবাহিনী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে একটা দেয়াল সৃষ্টি হয়। মানুষের মনে সেনাবাহিনীর ব্যাপারে যে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে তা নষ্ট করে দেয়া। এদেশের মানুষ ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সময় থেকে এখনও মনে করে শেষ ভরসার জায়গা,সেনাবাহিনী।সম্প্রতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তা সারাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। এই অপপ্রচারের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দেবে, সেনাবাহিনী কি স্বৈরাচারের পক্ষ নিতে যাচ্ছে। সুকৌশলে একটা বিভাজন সৃষ্টি করে ঘোলা জলে মাছ শিকারের এক অপচেষ্টা।
এই অপপ্রচারের আরেকটি উদ্দেশ্য রয়েছে। যার মূল জায়গাটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সেনা কর্মকর্তাদের বিচার। এবং ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’। জুলাই আন্দোলন সময়ে গণহত্যায় যে সকল কর্মকর্তা জড়িত থাকার কারণে গ্রেফতার হয়েছে। এবং আওয়ামী সরকার আমলের ১৭ বছর বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা, গুম করেছে তাঁদেরকে বাঁচানোর অপপ্রয়াস। তারা চাইছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সেনা কর্মকর্তাদের বিচার বা শাস্তি যেন না হয়। তাঁদেরকে রক্ষা করতেই, সামাজিক মাধ্যমে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ আন্দোলনের পর থেকেই দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে মব সন্ত্রাসের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৈরাজ্য দেখা দেয়। রাজনৈতিক মত পার্থক্যকে পুঁজি করে এই মব সন্ত্রাস শুরু হয়। ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের পর পরাজিত পক্ষ বিজয়ী দলকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তাই তারা বিজয়ী দলের বিরুদ্ধে সর্বক্ষণ উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে চলছে। আগামীতে এই উস্কানীমূলক বক্তব্য থেকে বড় ধরনের নৈরাজ্য দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা সাধারণ জনগণের কাম্য নয়। এছাড়া বিতাড়িত রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে। এবং তারা সেই চেষ্টা করবে। ৫ আগস্টের পর দেশে ব্যপক হারে চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে। এইরকম পরিস্থিতিতে দেশে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়েছে। সরকার হয়-তো এধরণের কিছু একটা ভাবছে। যৌথবাহিনীর সহযোগিতায় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক এটা সেনাবাহিনী অপপ্রচারকারী চাইছে না। তাই তারা ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ জাতীয় উদ্যোগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দেশের মানুষ শান্তি চায়। সে লক্ষ্যে সরকার যদি এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে জনগণ তাকে স্বাগত জানাবে।
পরিশেষে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অপপ্রচার কারীদের কাছে একটাই জিজ্ঞাসা। আপনারা কি দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য এই অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এ করে রাজনৈতিক ভাবে কোন সুফল বয়ে আনা যাবে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের বড় ইতিবাচক দিক হচ্ছে, এদেশের মানুষ বুঝে গেছে 'জনগণই একমাত্র শক্তি'। কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা দল নয় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাধারণ জনগণ নেমেছিল। সাধারণ জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কারণেই সেদিন স্বৈরশাসককে বিদায় নিতে হয়েছে। গণ অভ্যুত্থান পরবর্তীতে একটি গোষ্ঠী বা তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা অনেক চেষ্টা করেছে, নির্বাচনী বিজয় নিজেদের পক্ষে টানতে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। নির্বাচনে জনগণ যাকে ভালো মনে করেছে তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। এর বাইরে আরেক গোষ্ঠী, জনগণকে বাদ দিয়ে বাইরের শক্তির আশায় উন্মুখ হয়ে আছেন। জনগণকে বাদ দিয়ে বাইরের শক্তি কিছুই করতে পারবে না। আগামীতে, দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে না থাকবে তা জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। হয়-তো নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে। কিংবা দেশের প্রয়োজনে রাজপথে, আন্দোলনে।