ছবি: সংগৃহীত একটা সময় ছিল, রাত মানেই ছিল মেসির খেলা। ঘড়িতে রাত দুইটা, তিনটা কিংবা ভোরের কাছাকাছি। বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে, তখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের লাখো মানুষ অপেক্ষা করত একটি মুহূর্তের জন্য। কখন বলটা মেসির পায়ে যাবে। এরপর কী হবে, কেউ জানত না। শুধু একটা বিশ্বাস ছিল, মেসির পায়ে বল মানেই কিছু একটা ঘটতে পারে।
সেই অপেক্ষারও আজ শেষ হলো। মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। খবরটি শুনে কেউ হয়তো নিছক একজন ফুটবলারের অবসরের খবর হিসেবেই দেখবেন। কিন্তু যারা বছরের পর বছর তার খেলা দেখে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে এটি কেবল বিদায়ের খবর নয়। যেন নিজেদের জীবনের একটি অধ্যায়ও বন্ধ হয়ে গেল।
কারও কৈশোরের সঙ্গে মেসি জড়িয়ে আছেন। কারও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের রাতজাগার গল্পে তিনি আছেন। কারও বন্ধুত্বের শুরু হয়েছে মেসিকে নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে। কেউ হয়তো প্রথমবার প্রেমে পড়ার বয়সে মেসির গোল দেখে চিৎকার করেছেন। আবার কারও জীবনের সবচেয়ে আনন্দের রাতগুলোর একটি হয়ে আছে আর্জেন্টিনার কোনো জয়।
একজন ফুটবলার কীভাবে এত মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে যান, মেসি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
মেসিকে দেখার অভিজ্ঞতা আসলে শুধু ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতা ছিল না। বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি যখন বল পায়ে নিতেন, কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সময় থেমে যেত। সামনে দুই-তিনজন ডিফেন্ডার। পাশে আরও একজন। অথচ মনে হতো, এই বাধাগুলো তার জন্য যথেষ্ট নয়। এরপর কয়েকটি ছোট ছোট স্পর্শ, শরীরের সামান্য বাক, গতি বদল আর বল জড়িয়ে যেত জালে।
গোল দেখেছি অনেকের। কিন্তু মেসির গোলের অপেক্ষার অনুভূতিটা ছিল আলাদা।
কখনো তার একটি গোলের চেয়ে একটি পাস বেশি মনে ধরেছে। এমন পাস, যার সৌন্দর্য বুঝতে গোল হওয়ার প্রয়োজন হয়নি। ফুটবল যে একই সঙ্গে এত সহজ এবং এত সুন্দর হতে পারে, মেসি সেটাই যেন চোখের সামনে দেখিয়েছেন।
তাই তাকে অনেকেই ফুটবলের শিল্পী বলেছেন। আমার কাছে তিনি ফুটবলের রাজা।
তবে বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক ছিলেন না। অন্তত আমাদের অনুভূতিতে নয়।
বার্সেলোনার মেসিকে দেখে ছিল বিস্ময়। আর্জেন্টিনার মেসিকে দেখে ছিল মায়া।
কারণ জাতীয় দলের হয়ে তার পথটা সহজ ছিল না। একের পর এক হতাশা, ফাইনালে পরাজয়, সমালোচনা, ব্যর্থতার দায়, এমনকি একসময় জাতীয় দল থেকে সরে দাড়ানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন তিনি। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো এই গল্পের শেষটা কখনো সুন্দর হবে না।
কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা যেন দীর্ঘ অপেক্ষার প্রথম পুরস্কার। ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো। মেসির মুখের সেই হাসি এখনো মনে আছে। এত বছরের যন্ত্রণা, সমালোচনা আর অপেক্ষার পর যেন তিনি প্রথমবার নিজের দেশকে একটি বড় ট্রফি এনে দিতে পারলেন।
তবু একটা শূন্যতা থেকে গেল।
বিশ্বকাপ।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের শুরুটাও ভালো হয়নি। সৌদি আরবের কাছে হার। চারদিকে হতাশা। অনেকের মনে তখন পুরোনো আশঙ্কা ফিরে এসেছিল, আবার কি কাছাকাছি গিয়ে স্বপ্নটা ভেঙে যাবে?
কিন্তু সেই বিশ্বকাপ ছিল অন্য গল্পের।
প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে মেসি যেন নিজের ক্যারিয়ারের শেষ অসমাপ্ত অধ্যায়টিকে একটু একটু করে পূর্ণ করছিলেন। আর তারপর এলো ফাইনাল।
আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স।
এক ম্যাচে কতবার গল্প বদলাতে পারে, সেই রাত তা দেখেছিল। গোল, পাল্টা গোল, আবার গোল। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউট। আর তারপর সেই মুহূর্ত, যেটার জন্য মেসি ও তার কোটি কোটি সমর্থক বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন।
বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে মেসি।
সেই দৃশ্যের পর যেন আর কিছু পাওয়ার ছিল না।
কিন্তু মানুষের চাওয়া কি কখনো শেষ হয়?
আমরা চেয়েছিলাম, মেসি আরও খেলুন। আরও গোল করুন। আরও কিছু জাদু দেখান। আরও কয়েকটি রাত আমাদের জন্য রেখে যান।
আজ সেই রাতগুলোর শেষ।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর ম্যাচের আগে বসে সেই প্রশ্নটা করা হবে না, ‘আজ মেসি কী করবেন?’
বল তার পায়ে গেলে বুক ধড়ফড় করবে না, এমন নয়। বরং আরও বেশি করবে। কারণ এখন আমরা জানব, সেই দৃশ্যগুলো আর নতুন করে আসবে না।
তবে মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তার ট্রফির সংখ্যা নয়। গোলের সংখ্যা নয়। রেকর্ডও নয়।
তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তিনি একটি প্রজন্মের স্মৃতি হয়ে উঠেছেন।
যে প্রজন্ম পরীক্ষার আগের রাতে তার খেলা দেখেছে। ক্লাসের সকালে চোখে ঘুম নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ম্যাচের আলোচনা করেছে। যে প্রজন্ম তার জয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে, হেরলে মন খারাপ করেছে। যে প্রজন্মের কাছে ‘মেসি’ শুধু একটি নাম নয়, একটি সময়ের পরিচয়।
অনেক বছর পর হয়তো কোনো এক রাতে ইউটিউবে পুরোনো একটি ম্যাচ চালু হবে। স্ক্রিনে দেখা যাবে তরুণ মেসি বল নিয়ে ছুটছেন। সামনে কয়েকজন ডিফেন্ডার। আমরা আবারও অপেক্ষা করব।
বলটা পায়ে নিলেন।
একজনকে কাটালেন।
আরেকজনকে।
তারপর গোল।
সেই মুহূর্তে হয়তো মনে হবে, মেসি তো কোথাও যাননি।
তিনি আছেন।
আমাদের পুরোনো রাতগুলোতে। বন্ধুদের আড্ডায়। ফুটবল নিয়ে তর্কে। আনন্দের চিৎকারে। পরাজয়ের নীরবতায়। আর সেইসব স্মৃতিতে, যেগুলো কোনো বিদায় দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
সময় কাউকে ধরে রাখে না। রাজাকে একদিন রাজ্য ছাড়তে হয়, শিল্পীকে সুর থামাতে হয়, খেলোয়াড়কে একদিন জার্সি খুলে রাখতে হয়।
মেসিও রাখলেন।
কিন্তু মেসির বিদায় কি সত্যিই বিদায়?
হয়তো না।
কারণ কিছু মানুষ মাঠ থেকে বিদায় নেন, জীবন থেকে নয়।
মেসি তেমনই একজন।
আজ পৃথিবীর মন খারাপ। কারণ একজন ফুটবলার বিদায় নিয়েছেন। একজন রাজার আসন শূন্য হয়েছে।
আর একটি প্রজন্ম নীরবে নিজের শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের একটি অংশকে বিদায় জানিয়েছে।
মেসি চলে গেলেন।
কিন্তু তার গল্পটা থেকে গেল।
আমাদের সঙ্গে।
কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসা কি ফুরিয়ে যাবে?
যাবে না।
তিনি থাকবেন। আমাদের কৈশোরের রাতজাগায়, বন্ধুত্বের আড্ডায়, ফুটবল নিয়ে তর্কে, আনন্দের চিৎকারে, পরাজয়ের কান্নায়। থাকবেন পুরোনো ম্যাচের কোনো একটি দৃশ্যে, বা পায়ের কোনো এক জাদুকরী পাসে, কিংবা গোলপোস্টের জালে আটকে থাকা কোনো এক স্মৃতিতে।
মেসি হয়তো মাঠ ছাড়লেন। কিন্তু আমাদের হৃদয় থেকে কি আর বিদায় নেওয়া যায়?
সুকান্ত ভট্টাচার্য ভাষায়, চলে যেতে হবে, তবু…