মীর আব্দুল আলীম । ছবি: লেখক সৌজন্যব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম, সবখানেই সাংবাদিকতা ছিল সাহসী এক প্রহরীর নাম। সত্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকরা ঝুকি নিয়েছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, কখনো জীবনও দিয়েছেন। অথচ আজ সেই প্রহরীর ঘরেই যেন আগুন লেগেছে। মানুষের সামনে সত্যের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার যে আয়না, তাতেই জমেছে অসততা, অপেশাদারিত্ব ও স্বার্থপরতার কাদা।
আজকের বাস্তবতা এমন এক জায়গায় এসে দাড়িয়েছে, যেখানে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়টি অনেকের কাছে আর পেশাগত দায়িত্বের প্রতীক নয়; হয়ে উঠেছে ক্ষমতা দেখানোর মাধ্যম, ভয় দেখানোর অস্ত্র কিংবা অপরাধ আড়াল করার ঢাল। চিকিৎসক হতে যেমন ডিগ্রি লাগে, আইনজীবী হতে যেমন সনদ প্রয়োজন, রাষ্ট্রীয় চাকরিতে যেমন নিয়োগ কাঠামো রয়েছে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তেমন কার্যকর ও কঠোর পেশাগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে একটি কার্ড, অনলাইন পোর্টাল কিংবা ইউটিউব চ্যানেল খুলেই অনেকে নিজেকে ‘সাংবাদিক’ দাবি করছেন।
কে প্রকৃত সংবাদকর্মী আর কে সুযোগসন্ধানী, তা বোঝা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই শূন্যতার সুযোগে অনেকে সাংবাদিক পরিচয়ে সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করছেন। অনেকের কোনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত কাজের অভিজ্ঞতা নেই, সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের ন্যূনতম প্রশিক্ষণও নেই। তবু পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে তারা সাংবাদিকতার পরিচয়ে ঘুরছেন।
পান দোকানদার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ কখনো সুবিধা নেওয়ার আশায় মুহূর্তেই একটি প্রেস কার্ড সংগ্রহ করে সাংবাদিক বনে যাচ্ছেন। এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রকৃত সাংবাদিকরা। যারা বছরের পর বছর মাঠে ঘাম ঝরিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, ক্ষমতার রোষানলে পড়েছেন, জীবনের ঝুকি নিয়েছেন, তাদের পেশাগত পরিচয়ও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ নিজেদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে সমাজে একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হচ্ছে, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করলে আইন ও জবাবদিহির বাইরে থাকা সম্ভব। কোনো পেশার পরিচয় যখন অপরাধ আড়ালের ঢাল হয়ে ওঠে, তখন সেই পেশার নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
একসময় সাংবাদিকরা ছিলেন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। কিন্তু এখন এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকেই জিম্মি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, নানা জায়গায় মানুষের ছোটখাটো ভুল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ত্রুটি, সরকারি দপ্তরের দুর্বলতা কিংবা ব্যক্তিগত সংকটকে ‘নিউজ করে দেব’ বলে অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ ধরনের প্রবণতায় সাংবাদিকতার সামাজিক ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ অনেক সময় সংবাদকর্মীকে তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দেখার পরিবর্তে ভয় বা ঝামেলার কারণ হিসেবে ভাবতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপরও। একজন সৎ সাংবাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গেলে তাকেও একই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ফলে তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়, মানুষের আস্থা কমে যায় এবং পুরো পেশাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
উদ্বেগজনক আরেকটি প্রবণতা হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বাড়াতে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদক, চোরাচালান, অবৈধ দখল কিংবা ভূমিসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত কেউ কেউ বড় ব্যানার, অনলাইন টিভি বা ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম খুলে নিজেদের লোকজনকে যুক্ত করছেন। এতে প্রকৃত সংবাদকর্মীরা যেমন কোণঠাসা হচ্ছেন, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয়ও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
এটি কেবল সাংবাদিকতার সংকট নয়, আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
সাংবাদিকতা একটি বিশেষায়িত পেশা। তথ্য যাচাই, বস্তুনিষ্ঠতা, ভাষা, সংবাদমূল্য, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান ছাড়া ভালো সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। অথচ অনেক তথাকথিত সংবাদকর্মী সংবাদ লেখার মৌলিক কাঠামো সম্পর্কেও যথেষ্ট ধারণা রাখেন না।
সংবাদের পাচটি ‘W’ এবং একটি ‘H’, অর্থাৎ কী, কেন, কোথায়, কখন, কে এবং কীভাবে, এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চিত না করেই অনেক সময় সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। এর ফলে তথ্য বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, গুজব ছড়াচ্ছে এবং জনমনে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নৈতিকতার সংকট। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ। কিন্তু সংবাদ যখন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন পেশাটির প্রতি মানুষের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
সাংবাদিকদের সমাজের দর্পণ বলা হয়। কিন্তু সেই দর্পণেই যদি ময়লা জমে, তাহলে সমাজ নিজের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি দেখবে কীভাবে?
মানুষ যখন সাংবাদিক পরিচয়ে কাউকে চাদাবাজি, অপপ্রচার কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে দেখে, তখন অনেক ক্ষেত্রে পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থাকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এতে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার সহজ হয়। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা কমলে মানুষ যাচাইহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে। আর সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে আরও বড় বিভ্রান্তি।
একটি রাষ্ট্রে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম দুর্বল হয়ে পড়লে জবাবদিহি কমে যায়, গুজব বাড়ে এবং সামাজিক বিভাজন গভীর হয়। তাই সাংবাদিকতার সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু সাংবাদিকতার সংকট থাকে না, তা রাষ্ট্র ও সমাজের সংকটেও রূপ নেয়।
এই পরিস্থিতি তরুণ মেধাবীদেরও সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। যারা আদর্শ নিয়ে এই পেশায় আসতে চান, তারা যদি সাংবাদিকতাকে অনিশ্চিত ও অসম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে গণমাধ্যমের মান ও দেশের গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ওপর।
সাংবাদিকতার এই সংকট কাটাতে প্রয়োজন কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো। প্রকৃত সংবাদকর্মীদের পরিচয় ও পেশাগত তথ্য সংরক্ষণে একটি শক্তিশালী জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাদাবাজি, প্রতারণা, অপপ্রচার কিংবা অন্য কোনো অপরাধ হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন ও তদারকিতে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, যাতে প্রকৃত সংবাদমাধ্যম ও নামসর্বস্ব প্ল্যাটফর্মের পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পেশাগত নৈতিকতা এবং তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও নিজেদের সদস্যদের পেশাগত মান ও আচরণের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সাংবাদিকতার পরিচয়ের আড়ালে কেউ অপরাধ করলে তার দায় পুরো পেশার ওপর চাপানো যাবে না; একই সঙ্গে সেই পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার সুযোগও দেওয়া যাবে না।
দিনশেষে সমাজ তার বিবেককে খুজে পায় সংবাদমাধ্যমের পাতায়। সেই বিবেক যদি নীতিহীনতা, অপেশাদারিত্ব ও অপরাধের দখলে চলে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব, সত্য অনুসন্ধানের অঙ্গীকার এবং গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই সময় এসেছে সাংবাদিকতার পরিচয়কে আবারও দায়িত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করার। সময় এসেছে কলমকে সত্যের পক্ষে দাড় করানোর।
কারণ সমাজের দর্পণ যদি স্বচ্ছ না থাকে, একদিন হয়তো জাতিও নিজের প্রকৃত মুখ চিনতে ভুলে যাবে।
মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট