চ্যানেল আই মানেই অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ

রাজু আলীম

মতামত

১ অক্টোবর শুধু একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্মদিন নয়; এটি একসঙ্গে বহু মুখ, বহু কণ্ঠ, বহু রাত, অসংখ্য অনুষ্ঠান আর জীবনের

2026-10-01T17:02:51+06:00
2026-10-01T17:02:51+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
চ্যানেল আই মানেই অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ
রাজু আলীম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০২ পিএম  
রাজু আলীম
১ অক্টোবর শুধু একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্মদিন নয়; এটি একসঙ্গে বহু মুখ, বহু কণ্ঠ, বহু রাত, অসংখ্য অনুষ্ঠান আর জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়া অগণিত স্মৃতি ফিরে পাওয়ার দিন। ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে তিনি আছেন শুরু থেকেই। তাই ২৮ বছরে পা দেওয়া চ্যানেল আই তাঁর কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের বয়সের হিসাব নয়, বরং সম্পর্ক, ভালোবাসা, শ্রম আর মানুষের গল্পে ভরা এক দীর্ঘ জীবনের নাম।

১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর যখন চ্যানেল আই যাত্রা শুরু করল, তখন আমরা কেবল একটি টেলিভিশন চ্যানেল গড়তে চাইনি, আমরা চেয়েছিলাম একটি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে। যেখানে সত্য, সৌন্দর্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের গল্পগুলো নান্দনিকভাবে বলার সুযোগ থাকবে। সেদিন যে ছোট্ট বীজ রোপণ করা হয়েছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে একটি ছায়াদানকারী মহীরুহে।

শুরুর দিনগুলো আজ মনে হলে অনেকটা সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হয়। অনুষ্ঠানের ক্যাসেট তৈরি করে সিঙ্গাপুরে পাঠাতে হতো, সেখান থেকে স্যাটেলাইটে সম্প্রচার। প্রযুক্তি তখন এত সহজ ছিল না, সুযোগ-সুবিধাও আজকের মতো ছিল না। কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে রাত-দিন এক করে কাজ করেছেন অসংখ্য মানুষ। পর্দায় দর্শক যে কয়েক মিনিটের অনুষ্ঠান দেখেছেন, তার পেছনে লুকিয়ে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রস্তুতি, উৎকণ্ঠা, ছুটে চলা এবং কখনো কখনো অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা।

আমি সৌভাগ্যবান, কারণ শুরু থেকেই ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়ের পরিচালনা পর্ষদের আবদুর রশিদ মজুমদার, এনায়েত হোসেন সিরাজ, জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন, ফরিদুর রেজা সাগর, মুকিত মজুমদার বাবু, রিয়াজ আহমেদ খান এবং শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে একটি স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদের নেতৃত্বের ভেতর দিয়ে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বেড়ে ওঠা দেখিনি, দেখেছি একটি প্রতিষ্ঠানের চরিত্র কীভাবে তৈরি হয়।

এই দীর্ঘ পথচলায় চ্যানেল আই কখনোই আমার কাছে শুধু কর্মস্থল হয়ে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে আমার শেখার জায়গা, আমার প্রেরণার জায়গা, আমার ভালোবাসার জায়গা। কত শত অনুষ্ঠান, কত শত মানুষ, কত গল্প! আমার তৈরি প্রতিটি অনুষ্ঠান, সিনেমা কিংবা নাটকের পেছনে ছিল একেকটি মানবিক অভিপ্রায়। কখনো কৃষকের মুখের হাসি, কখনো শিল্পীর চোখের জল, কখনো কোনো মানুষের স্বপ্ন, আবার কখনো দেশের সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা।

‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ আমাদের শিখিয়েছে বাংলাদেশের গল্প বলতে হলে শুধু স্টুডিওতে বসে থাকলে চলে না। ক্যামেরা নিয়ে যেতে হয় মাঠে, কৃষকের ঘরে, চরের বালুচরে। বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, কৃষি ও প্রকৃতিকে কাছ থেকে না দেখলে বাংলাদেশের গল্পও পুরোপুরি বলা যায় না। এই অনুষ্ঠান সেই দায়বোধকে আরও গভীর করেছে।

ফরিদুর রেজা সাগরের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। বাংলাদেশের মিডিয়ায় তাঁর অবদান ও অবস্থান অনন্য। তাঁর সঙ্গে কাজের স্মৃতিগুলোও আমার কাছে আনন্দের। তিনি মন দিয়ে শুনতেন। নানা পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলতাম, আর তিনি চুপচাপ শুনে শেষে হয়তো দুয়েকটি কথা বলতেন। সেই দুয়েকটি কথা নিয়েই আবার আমাদের ভাবনা শুরু হতো। তখন মনে হতো, এত ছোট কথার মধ্যে এত বড় ভাবনা কীভাবে থাকে! এখন বুঝি, এটাই ছিল তাঁর নিজস্বতা—অল্প কথায় অন্যকে ভাবতে শেখানো। তাঁর সহজ হাসি, সৃজনশীল মন আর মানুষের প্রতি আন্তরিকতা তাঁকে শুধু বড় একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব নয়, আমার কাছে একজন অনন্য মানুষ করে তুলেছে।

চ্যানেল আইয়ের পথচলায় সংবাদও ছিল আরেকটি শক্তিশালী অধ্যায়। শাহ আলমগীর ভাইকে গভীর রাতেও নিউজরুমে দেখা যেত। সবাই যখন চলে গেছেন, তিনি তখনও আছেন।

এই চ্যানেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কত মানুষ যে সময়ের ওপারে চলে গেছেন! প্রণব সাহা, খালিদ মাহমুদ মিঠু, সুবীর নন্দী, আইয়ুব বাচ্চু, এন্ড্রু কিশোর, আজাদ রহমান, হুমায়ূন আহমেদ—প্রত্যেকেই চ্যানেল আইয়ের স্মৃতিতে আলাদা একটি অধ্যায়। কেউ গান দিয়ে, কেউ গল্প দিয়ে, কেউ ক্যামেরা হাতে, কেউ সুরে, কেউ অনুষ্ঠানে এই ঘরটিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ আমার কাছে শুধু একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক ধরনের ঘোর। তাঁর গল্প নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ২০১৭ সালে তাঁর গল্প অবলম্বনে ‘রুপার জন্য ভালোবাসা’ নির্মাণের সময় বারবার মনে হয়েছে, মানুষটি নেই, অথচ তাঁর চরিত্রগুলো আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে হাঁটছে, কথা বলছে। চঞ্চল চৌধুরী হিমু হচ্ছেন, শুটিং চলছে, আর আমার মনে হচ্ছে—এই মানুষটির লেখা একসময় আমাদের কতটা গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। তখন যেমন বলেছিলাম, হুমায়ূন আহমেদ আমার একটি ঘোরের নাম; আজও কথাটি বদলায়নি।

আর এবারের জন্মদিনের আগে সবচেয়ে তীব্র যে অনুপস্থিতিটা অনুভব করছি, তিনি আমীরুল ইসলাম। তাঁর চলে যাওয়া তাই শুধু একজন সহকর্মীর মৃত্যু নয়; আমাদের প্রতিদিনের জীবনের একটি পরিচিত শব্দ, একটি পরিচিত মুখ, একটি পরিচিত উপস্থিতির হঠাৎ থেমে যাওয়া।

আরও অনেক মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিজেদের জীবনের একটি অংশ রেখে গেছেন। কেউ হয়তো এখন অন্য কোথাও আছেন, কেউ অবসরে, কেউ পৃথিবীতেই নেই; কিন্তু তাঁদের শ্রম, সৃষ্টিশীলতা আর স্মৃতির ভেতর দিয়েই চ্যানেল আইয়ের গল্প তৈরি হয়েছে।

‘টু দ্য পয়েন্ট’ সেই গল্পেরই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১৮ সালের ২১ জুলাই অনুষ্ঠানটি নিয়মিত লাইভ সম্প্রচার শুরু করে। পরিকল্পনায় ছিলেন জাহিদ নেওয়াজ খান, প্রথম পর্বে সঞ্চালনায় ছিলেন তারিকুল ইসলাম মাসুম, আর প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলাম আমি। লাইভ অনুষ্ঠান আমাকে শিখিয়েছে, টেলিভিশনে সবকিছু কখনো পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। একটি প্রশ্ন হঠাৎ অন্যদিকে চলে যেতে পারে, কোনো অতিথির প্রতিক্রিয়ায় বদলে যেতে পারে পুরো পরিবেশ, কয়েক সেকেন্ডেই স্টুডিওর আবহ পাল্টে যেতে পারে।

‘টু দ্য পয়েন্ট’-এর অসংখ্য পর্বের মধ্যে একটি সন্ধ্যার কথা আজও মনে আছে। আলোচনায় ছিলেন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। হঠাৎ কথাবার্তার আবহ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। আমি তখন সঞ্চালকের পাশে স্টুডিও ফ্লোরে। ক্যামেরা চলছে, আলো জ্বলছে, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হচ্ছিল পুরো স্টুডিও যেন থমকে গেছে।

সঞ্চালনায় দীপ্তি চৌধুরী আর স্টুডিওর পেছনে আমরা। কাজ করছিলাম—যেন উত্তেজনা অনুষ্ঠানকে ছাপিয়ে না যায়। লাইভ টেলিভিশনের সেই মুহূর্ত আমাকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছিল, সাংবাদিকতা শুধু প্রশ্ন করার জায়গা নয়; প্রশ্নের পর তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্বও এর অংশ।

পরে সেই পর্ব ব্যাপক আলোচনায় আসে। এখনো ‘টু দ্য পয়েন্ট’-এর সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়লে বিস্মিত হই। তবে আমার কাছে সেটি শুধু ভাইরাল একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতি নয়; এটি লাইভ টেলিভিশনের বাস্তবতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধের একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা। এমন হাজারো স্মৃতি ছড়িয়ে আছে আমার চ্যানেল আই জীবনে। সব লিখে শেষ করা যাবে না।

সময়ের সঙ্গে চ্যানেল আইও বদলেছে। স্যাটেলাইট টেলিভিশন থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিস্তৃত হয়েছে এর পরিসর। দর্শকের দেখার অভ্যাস বদলেছে, কনটেন্টের ধরন বদলেছে, বিজ্ঞাপনদাতা ও নির্মাতাদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সুযোগ। আজ একটি অনুষ্ঠান শুধু নির্দিষ্ট সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় সম্প্রচারিত হয় না; সেটি একই সঙ্গে অনলাইন, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এই রূপান্তর আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।

ব্যবসায়িক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চ্যানেল আইয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পেরে আনন্দ পেয়েছি। কারণ একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার কনটেন্টে নয়; দর্শক, নির্মাতা, শিল্পী এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আস্থার সম্পর্কেও।

চ্যানেল আই টেলিভিশন চ্যানেল ক্যাটাগরিতে বারবার সুপারব্র্যান্ডস বাংলাদেশ সম্মাননা পেয়েছে। দেশের প্রথম ডিজিটাল টেলিভিশন চ্যানেল হিসেবে এই স্বীকৃতিগুলো আমাদের পথচলায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি কোনো পুরস্কার নয়—মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া।

২৮ বছরে দাঁড়িয়ে তাই বয়সের হিসাব আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। চ্যানেল আই এখন হয়তো বয়সের হিসেবে তীব্র তরুন! কিন্তু তার ভেতরে জমে আছে কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি। এই প্রতিষ্ঠানের পর্দায় যারা এসেছেন, যাঁরা কাজ করেছেন, যাঁরা ভালোবেসেছেন—সবাই মিলে তৈরি করেছেন এর দীর্ঘ পথচলা।

আগামী দিনে প্রযুক্তি আরও বদলাবে। নতুন প্ল্যাটফর্ম আসবে, নতুন প্রজন্মের ভাষা বদলাবে, দর্শকের অভ্যাস বদলাবে। চ্যানেল আইকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে চলতে হবে। কিন্তু একটি বিষয় যেন কখনো না বদলায়—বাংলাদেশের মানুষকে দেখার চোখ।

একজন কৃষকের মুখ, একজন শিল্পীর কণ্ঠ, একজন তরুণের স্বপ্ন, একজন প্রবীণ মানুষের স্মৃতি—এসবই তো বাংলাদেশের গল্প। এই গল্পগুলো যতদিন বলা হবে, ততদিন চ্যানেল আইয়ের পথচলারও অর্থ থাকবে।

১ অক্টোবর আবার আলো জ্বলবে। গান হবে। জন্মদিনের ছবি উঠবে। সহকর্মীরা একসঙ্গে হবেন। হয়তো অনেক পরিচিত মুখের জায়গায় নতুন মুখ থাকবে। কেউ থাকবে, কেউ থাকবে না। কিন্তু দিনের শেষে মনে হবে, ২৮ বছর আসলে কোনো সংখ্যা নয়। ২৮ বছর হলো মানুষের রেখে যাওয়া হাজার হাজার মুহূর্তের নাম।

চ্যানেল আই সেই মুহূর্তগুলো নিয়েই বড় হয়েছে। আমরা যারা এর ভেতরে ছিলাম, আছি কিংবা একদিন থাকব না—সবাই মিলে এই গল্পের অংশ।
এই গল্প আরও অনেক দূর যাক। আরও মানুষের কাছে পৌঁছাক। আরও নতুন প্রজন্মের গল্প বলুক।
আর হৃদয়ে তারুণ্য নিয়েই চ্যানেল আই এগিয়ে যাক- অপ্রতিরোধ্য এক বাংলাদেশ হয়।

রাজু আলীম 
মহাব্যবস্থাপক , অনুষ্ঠান 
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম,  চ্যানেল আই।
মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত