ড. খলিলের উচ্চমার্গীয় কূটনৈতিক চালে যেভাবে স্বপ্নভঙ্গ ভারতের

আহসান হাবিব বরুন

মতামত

চার দেয়ালের ভেতরে সুসংগঠিত শব্দমালা আর নীতিবাক্যের কূটনৈতিক মহড়া যখন বাস্তবতার কঠিন ভূমিতে বারবার আছড়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই জাতিসংঘের সাধারণ

2026-09-26T18:05:06+06:00
2026-09-26T18:05:06+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
ড. খলিলের উচ্চমার্গীয় কূটনৈতিক চালে যেভাবে স্বপ্নভঙ্গ ভারতের
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০৫ পিএম  
ড. খলিলুর রহমান
 চার দেয়ালের ভেতরে সুসংগঠিত শব্দমালা আর নীতিবাক্যের কূটনৈতিক মহড়া যখন বাস্তবতার কঠিন ভূমিতে বারবার আছড়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভেসে এলো এক অপ্রিয় সত্যের ধ্বনি। জাতিসংঘের অস্তিত্ব থাকা বা না থাকা নিয়ে বিশ্ববাসী সংশয়ী নয়; তারা জানতে চায়, সংস্থাটি আদৌ কার্যকর কি না। এই একটি তীক্ষ্ণ ও সাহসী প্রশ্নের মধ্য দিয়ে বদলে গেছে বৈশ্বিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশ। বিশ্বমঞ্চে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট, ক্ষমতার বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান যে অবস্থান নিয়েছেন, তা কেবল বহুপক্ষীয় কূটনীতির ইতিহাসেই এক নতুন মাত্রা যোগ করেনি, একই সঙ্গে ভেস্তে দিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ অর্জনে ভারতের বহুদিনের সাজানো সমীকরণ। 

ড. খলিলের এই নীতিভিত্তিক, কৌশলগত ও উচ্চমার্গীয় কূটনৈতিক অবস্থান নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষায় মারাত্মক ধাক্কা দিয়েছে। কোনো সরাসরি বৈরিতা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংঘাত না ঘটিয়েও, সর্বজনীন ন্যায্যতা ও কাঠামোগত সংস্কারের যে দর্শন তিনি তুলে ধরেছেন, তা ভারতের একক স্বার্থভিত্তিক কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করেছে।
 
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মাত্র ৫০টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘ। আজ তার সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৩-এ, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের আকার বাড়লেও বাড়েনি তার কার্যকারিতা ও সুশাসন। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন যে, কেবল টিকে থাকাই সাফল্যের প্রমাণ নয়। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যেখানে বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে, সেখানে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবাধিকার রক্ষায় বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন সহায়তা কমে গেছে ২৩ শতাংশ। 

একই সময়ে জাতিসংঘের গৃহীত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (SDG) এক-তৃতীয়াংশের অগ্রগতি বর্তমানে সম্পূর্ণ থমকে গেছে। খলিলুর রহমান জোর দিয়ে বলেন যে, বিশ্বাস এমনিতেই পাওয়া যায় না, তা অর্জন করতে হয়। নিষ্ক্রিয় মালিকানা যথেষ্ট নয় এবং আমরা যদি এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সক্রিয়ভাবে গ্রহণ না করি, তবে এর অবস্থার উন্নতির আশা করা যায় না। এই বক্তব্যের মূল সুরই ছিল, বিশ্বকে আজ এমন এক নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘের কাঠামো গঠন করতে হবে, যা গোটা বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে এবং কেবল প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক ক্লাবে পরিণত হয় না।
 
এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো,বিগত কয়েক দশক ধরে ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ অর্জনের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। বিশ্বমঞ্চে উদীয়মান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে জি-৪ (ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপান) জোটের মাধ্যমে দেশটি নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণ দাবি করে আসছিল। নয়াদিল্লির প্রধান লক্ষ্য ছিল পঁচাত্তর বছর আগের বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে একটি স্থায়ী আসন এবং সম্ভব হলে ভেটো ক্ষমতা অর্জন করা। ভারতের এই কৌশলটি ছিল মূলত নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একক চেষ্টা। তারা চেয়েছে কোনো সার্বিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে না গিয়ে বরং নির্দিষ্ট কিছু দেশকে স্থায়ী আসনে যুক্ত করে নিজেদের পথ সুগম করতে। কিন্তু ড. খলিলুর রহমানের কূটনৈতিক কৌশল ভারতকে এমন এক নৈতিক ও কৌশলগত ফাঁদে ফেলেছে, যার উত্তর নয়াদিল্লির কাছে নেই।
 
ড. খলিলুর রহমানের উপস্থাপিত সংস্কার দর্শনটি ভারতের প্রথাগত কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যে নিরাপত্তা পরিষদের সার্বিক পুনর্গঠনে আফ্রিকার গুরুত্ব সবচেয়ে জোরের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, আট দশক পেরিয়ে গেলেও নিরাপত্তা পরিষদে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশের কোনো স্থায়ী আসন নেই। ‘ন্যায্যতা, ন্যায়বিচার’ ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই আফ্রিকার এই দাবির নিষ্পত্তি করতে হবে। 

তিনি যখন মহাদেশীয় অগ্রাধিকার ও সার্বিক প্রতিনিধিত্বের ওপর জোর দেন, তখন ভারতের মতো একটি একক দেশের ব্যক্তিগত স্থায়ী আসনের দাবি নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ভারত যেখানে চেয়েছিল বিদ্যমান পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের পাশে নিজেদের মতো আরও কয়েকটি দেশকে যুক্ত করতে, সেখানে ড. খলিল জোর দিয়েছেন নিরাপত্তা পরিষদের সামগ্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য, ভেটো ব্যবস্থার অবসান বা সংশোধন এবং সর্বজনীন প্রতিনিধিত্বের ওপর। 

তিনি স্পষ্ট করেছেন, সংস্কার মানে কেবল ভেটো-ধারী দেশের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সার্বিক প্রক্রিয়ার গণতান্ত্রিকীকরণ। ভারত বরাবরই নিজেকে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করে নিরাপত্তা পরিষদের আসন দাবি করত। কিন্তু সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ড. খলিলুর রহমান যেভাবে ফিলিস্তিন, সুদান, গাজা, ইউক্রেন ও মিয়ানমারের সংকট সমাধানে জাতিসংঘের কাঠামোগত ব্যর্থতা তুলে ধরেছেন, তাতে প্রমাণিত হয় যে ছোট ও মধ্যমশক্তির দেশগুলোও নীতিভিত্তিক কূটনীতিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে, যা ভারতের একক আধিপত্যের রাজনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
 
ড. খলিলুর রহমান কেবল নেতিবাচক সমালোচনা বা সংস্কারের দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা যেমন স্বীকার করেছেন, তেমনি বিশ্বশান্তি রক্ষায় এর অবিচ্ছেদ্য অবদানের কথাও স্মরণে এনেছেন। তিনি ইরাকে প্রায় ৫০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ ভিটেমাটিতে ফিরে আসার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং নিরাপত্তাঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হাইতিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও ত্রাণ কার্যক্রমের কার্যকারিতার প্রশংসা করেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্বজুড়ে শান্তি রক্ষায় ‘ব্লু হেলমেট’ পরিহিত শান্তিরক্ষীদের অবদানকে তিনি পুনর্মূল্যায়ন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের প্রতিনিধি শান্তিরক্ষীদের কেবল সেনাসদস্য হিসেবে নয়, বরং সড়ক ও সমাজ বিনির্মাণকারী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ড. খলিলকে বিশ্বমঞ্চে একজন প্রাজ্ঞ, দূরদর্শী ও গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক নেতা হিসেবে স্থান দিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়নের পরিবর্তে তিনি পুরো সাধারণ পরিষদ তথা বিশ্ববাসীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
 
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অবস্থান বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ড. খলিলের এই কৌশল কেবল ভারতের একচেটিয়া বিশ্বনেতা হওয়ার বাসনাকে আটকে দেয়নি, বরং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বাধীন, সার্বভৌম এবং নীতিভিত্তিক আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও সুসংহত করেছে। নয়াদিল্লি এতদিন ধরে চেষ্টা করে আসছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে নিজেদের সুবিধানুযায়ী সম্প্রসারণ করতে। কিন্তু বাংলাদেশের কূটনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে যখন সার্বিক সংস্কার, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব এবং বহুপক্ষীয়তাবাদের সমতার এজেন্ডা অগ্রাধিকার পেল, তখন ভারতের ওই জাতীয় উদ্যোগ সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছোট ও উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, ভারতের অর্থনৈতিক বা সামরিক পেশিশক্তির দাবির চেয়ে ড. খলিলুর রহমানের নীতি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক অবস্থান আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য অনেক বেশি কার্যকর।
 
পরিশেষে বলতে চাই,ড. খলিলুর রহমানের এই উচ্চমার্গীয় কূটনৈতিক অবস্থান শেষ পর্যন্ত একটি সত্যই প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বব্যবস্থা আজ আর কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের খেয়ালখুশিমতো চলবে না। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার যদি হতেই হয়, তবে তা হবে বিশ্ববাসীর সর্বজনীন স্বার্থে, কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য নয়। জাতিসংঘের চার দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষের যে সাধারণ প্রশ্ন—এই সংস্থাটি আদৌ আমাদের জীবনে কার্যকর কি না—সেই কঠিন সত্যকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করে ড. খলিল ইতিহাস তৈরি করেছেন। আর এই সততা, কৌশল এবং দূরদর্শিতার কাছেই আজ ভারতের বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্থায়ী সদস্যপদের স্বপ্ন হোঁচট খেয়েছে। এটি কেবল ভারতের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং বৈশ্বিক বহুপক্ষীয়তাবাদ এবং ক্ষমতার সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।
 
লেখক পরিচিতি: 

আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]  

  বিষয়:   ড. খলিল  উচ্চমার্গীয়  কূটনৈতিক 


মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত