নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে বিএনপি-জামাতের অবস্থান

আহসান হাবিব বরুন

মতামত

নীতি, নৈতিকতা ও দলীয় জবাবদিহির প্রশ্নে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক আচরণ ও পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনে

2026-10-02T15:24:41+06:00
2026-10-02T15:24:41+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে বিএনপি-জামাতের অবস্থান
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৪ পিএম  
সংগৃহীত ছবি
নীতি, নৈতিকতা ও দলীয় জবাবদিহির প্রশ্নে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক আচরণ ও পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও অর্থবহ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সততা, আদর্শিক স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে এলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তাদের কথা ও কাজের ব্যবধান প্রকট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলীয় শৃঙ্খলারক্ষায় ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে যে তাৎপর্যপূর্ণ ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তা তাদের দৃঢ় নৈতিকতা,রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতারই প্রমাণ বহন করে।

একটি সাধারণ পরিবারের চাকরি প্রত্যাশী মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা অঞ্চলের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের হৃদয়বিদারক ও বর্বর ঘটনাটি দেশবাসীর স্মৃতিতে এখনো দাগ কেটে আছে। এটি কেবল একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র নয়, বরং এটি একটি তথাকথিত সুশৃঙ্খল ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচনকারী চরম এক বাস্তব দলিল। ঘটনার সূত্রপাত এক অত্যন্ত করুণ, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক পটভূমিতে। জীবিকা ও চাকরির আশায় এমপি গাজী নজরুল ইসলামের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তরুণী মরিয়ম। একজন ধর্মীয় লেবাসধারী জনপ্রতিনিধি ও প্রবীণ রাজনীতিকের কাছে সাহায্য চাইতে আসা অসহায় তরুণীটি ভেবেছিলেন, তিনি পরম নিরাপদে আছেন। কিন্তু মরিয়ম ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি যে ধর্মের বাহ্যিক পোশাক আর সুশীল লেবাসের অন্তরালে লুকিয়ে আছে চরম এক অনৈতিক, কামুক ও নিষ্ঠুর রূপ। নিজের চেয়ে প্রায় ৬০ বছরের ছোট একটি মেয়ের সঙ্গে নৈতিকভাবে চরম বিপর্যস্ত গাজী নজরুল ইসলাম অনৈতিক সখ্য ও সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ধর্মীয় প্রলোভন, বিয়ের মিথ্যা আশ্বাস এবং লালসার জালে আটকে ফেলা হয় অসহায় মরিয়মকে।
 
পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যকার অত্যন্ত আপত্তিকর ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও সর্বসমক্ষে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ধিক্কার ও তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। এই বিষময় ও বিতর্কিত পরিস্থিতি সামাল দিতে গাজী নজরুল ইসলাম তড়িঘড়ি করে একটি ‘দ্বিতীয় বিয়ের নাটক’ সাজিয়ে নিজেকে নিষ্পাপ প্রমাণের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতারণা, শোষণ ও অনৈতিকতার সেখানেই সমাপ্তি ঘটেনি। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের কাছে সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত ও সংরক্ষিত সরকারি আবাসন—‘ন্যাম ভবন’-এর সরকারি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় এই কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের নিথর মরদেহ।
 
মরিয়মের আত্মহত্যার পর উদ্ধার করা সুইসাইডাল নোট থেকে যে রোমহর্ষক, লোমহর্ষক ও নৃশংস নির্যাতনের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে, তা যেকোনো স্বাধীন ও বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে বাধ্য। সুইসাইডাল নোটে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, কীভাবে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী যৌথভাবে মরিয়মের ওপর দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। চাকরির লোভ দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্কের ফাঁদে ফেলা থেকে শুরু করে একজন সম্ভাবনাময় তরুণীকে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করা—এ যেন এক মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও নির্মমতার প্রতিচ্ছবি। অথচ এই সম্পূর্ণ অনৈতিক, ঘৃণ্য ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রধান অনুঘটক গাজী নজরুল ইসলাম আজও বহাল তবিয়তে একজন সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করে যাচ্ছেন।
 
মরিয়মের সঙ্গী নজরুলের আপত্তিকর ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র জনরোষের মুখে পড়ে জামায়াতে ইসলামী। নিজেদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতে তারা গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। শুধু তাই নয়, জনগণের বাহবা কুড়ানো এবং সাময়িকভাবে লোকদেখানোর জন্য তারা ইসি ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে একটি চিঠি পাঠানোর নাটকও মঞ্চস্থ করে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর ও প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় হলো, বহিষ্কারের কয়েক মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও নজরুল ইসলাম কীভাবে আজও সংসদ সদস্য পদে বহাল তবিয়তে টিকে আছেন? এটিই মূলত জামায়াতে ইসলামীর সুচতুর, অপকৌশলপূর্ণ ও দ্বিচারিতাপূর্ণ রাজনীতির প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে দেয়।
 
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো দলীয় সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অত্যন্ত সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক আইনি পথনির্দেশ প্রদান করে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কাঠামোগত বিধান অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীকালে তিনি উক্ত দল থেকে পদত্যাগ করেন, সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেন কিংবা রাজনৈতিক দল যদি তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করে, তাহলে নির্বাচন কমিশন (EC) ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে সংবিধান ও নির্দিষ্ট বিধিমোতাবেক তাঁর সদস্যপদ বাতিলের সুনির্দিষ্ট আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তবেই তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষিত হয়।
 
ঠিক এখানেই জামায়াতের রাজনৈতিক অসততা ও ভণ্ডামির সবচেয়ে বড় প্রমাণটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো রাজনৈতিক দল যদি সত্যিই আন্তরিকভাবে চায় যে তাদের দল থেকে বহিষ্কৃত ও অনৈতিকতায় জড়িত কোনো সদস্য সংসদে প্রতিনিধিত্ব না করুন, তবে তাদের শুধু সাধারণ একটি আইওয়াশমূলক চিঠি কিংবা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলে না। সাংবিধানিক নিয়ম অনুসরণ করে স্পিকারের মাধ্যমে বিষয়টির আইনগত চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে এগোতে হয় এবং প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের (EC) কাছে সুস্পষ্ট রেফারেন্স পাঠিয়ে শুনানি ও বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে আসনটি আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণার কার্যকর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়।
 
কিন্তু জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুচতুরভাবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সেই কঠোর ও বাধ্যতামূলক পথে হাঁটেনি। তারা কেবল উপরিভাগে লোকদেখানো সাধারণ চিঠি ও বহিষ্কারের খবর প্রকাশ করেই নিজেদের দায় শেষ করেছে। সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থার যে কার্যকর প্রয়োগের দরকার ছিল, সেখানে জামায়াত সম্পূর্ণ নীরবতা ও কৌশলী নিষ্ক্রিয়তা পালন করছে। এটি স্পষ্টতই সাধারণ জনগণ ও ভোটারদের বোকা বানানোর এক অশুভ রাজনৈতিক কৌশল। একদিকে জনগণের সামনে নিজেদের নীতিবান ও সৎ প্রমাণের জন্য বহিষ্কারের নাটক সাজিয়ে নৈতিকতার বাহবা কুড়ানো, অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে নিজেদের সংসদীয় সুবিধা, দলীয় প্রভাব এবং আসনটি হাতছাড়া না করার সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ বজায় রাখা—এটি জামায়াতের নীতিহীনতা ও চরম রাজনৈতিক ভণ্ডামির প্রকাশ। মুখে ধর্মের দোহাই দেওয়া এবং পোশাকে-আশাকে নিজেদের নিষ্পাপ দাবি করা এই দলটি যে বাস্তবে রাজনীতিতে কেবল সুবিধাবাদ ও ফায়দা লোটায় ব্যস্ত, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দলিল।
 
জামায়াতে ইসলামীর এই কৌশলগত দ্বিচারিতা, নিষ্ক্রিয়তা ও ছলচাতুরীর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে বিএনপি যে রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তা নীতিগত ও নৈতিকতার বিচারে বিএনপির অবস্থানকে অত্যন্ত স্বচ্ছ, স্বাধীন ও দৃঢ় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে।
 
আমি বহুবার আমার বিভিন্ন কলাম, রাজনৈতিক নিবন্ধ ও বিশ্লেষণে দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছি যে, বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা একমাত্র তারেক রহমানেরই রয়েছে। তিনি যে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বা নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন, তা কেবল কোনো সাময়িক নির্বাচনী বা রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের ইতিবাচক, কাঠামোগত ও গুণগত পরিবর্তনের এক সুদৃঢ় ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে, তারেক রহমান কেবল একজন সাধারণ রাষ্ট্রনায়ক বা দলের শীর্ষ নেতা নন—তিনি এ দেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারকারী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন দেশনেত্রী, সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি। রক্তপ্রবাহ, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ত্যাগের গভীরতায় তিনি এ দেশের আপামর মানুষের মূল রাজনৈতিক স্পন্দনকে হৃদয়ে ধারণ করেন। আজ নানামুখী সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে থাকা ১৮ কোটি সাধারণ মানুষ এক নতুন আশা ও প্রত্যয় নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে।
 
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিনিয়তই প্রমাণ করে চলেছেন যে, এ দেশের মাটি, মানুষ এবং সাধারণ জনগণের প্রাত্যহিক অনুভূতিকে তিনি কতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন ও অন্তরে লালন করেন। তাঁর বিনয়ী ও সাধারণ জীবনযাপন, রাষ্ট্রীয় অপচয় বন্ধে কঠোর ব্যক্তিগত উদ্যোগ, পরমতসহিষ্ণু আচরণ এবং জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে দিনরাত নিরলস শ্রম ও সততা প্রমাণ করে যে, তিনি বাংলাদেশে এক সম্পূর্ণ নতুন ধারার রাষ্ট্রনায়কত্ব উপহার দিচ্ছেন। তিনি একদিকে যেমন উদার, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে তিনি ইস্পাতকঠিন, আপসহীন ও অত্যন্ত কঠোর।
 
সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্রে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। খবরটি জানার সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রকার কালক্ষেপণ, দলীয় পক্ষপাতিত্ব, বিচারিক বিলম্ব বা ঢাকঢাক-গুড়গুড় নীতির সুযোগ দেয়নি বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রী কালবিলম্ব না করে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই উক্ত এমপিকে পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন, সংশ্লিষ্ট পুরো সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেন এবং অভিযুক্তদের দল থেকে সরাসরি বহিষ্কার করে কঠোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। দলীয় এমপির অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এটাই প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতেও কোন মন্ত্রী-এমপি কিংবা নেতাকর্মী সরকার ও দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে ছাড় পাবেন না।
 
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নিজের দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সরাসরি এমন কঠোর সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং একই সঙ্গে কুষ্টিয়ার শিক্ষকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে তাঁকে সসম্মানে মুক্ত করার প্রশাসনিক ও বিচারিক নির্দেশ প্রদান করা—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অন্যায় করে পার পাওয়ার অপসংস্কৃতির যুগ তারেক রহমানের নেতৃত্বে চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে। মিরপুরের ঘটনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং কুষ্টিয়ার শিক্ষককে মুক্ত করার নির্দেশ তারই জীবন্ত ও অমলিন প্রমাণ।
 
শুধু তাই নয়, দলীয় এমপিকে পদ থেকে অব্যাহতি বা দল থেকে বহিষ্কার করেই বিএনপি কিংবা সরকার ক্ষান্ত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয়ভাবে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তে যদি উক্ত এমপির অপরাধের সামান্যতম সংশ্লিষ্টতাও প্রমাণিত হয়, তবে কোনো প্রকার দলীয় অনুকম্পা বা শিথিলতা ছাড়াই তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে আইনানুযায়ী চার্জশিট প্রদান করা হবে এবং আইন সম্পূর্ণ নিজস্ব গতিতে চলবে।
 
এই ধারাবাহিক ও আপসহীন পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটি স্পষ্ট ও পরিষ্কার বার্তা পৌঁছে গেছে: অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, রাজনৈতিক পদ-পদবিতে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনায় অপরাধের প্রশ্নে বিএনপি এবং বর্তমান সরকার ‘শূন্য সহনশীলতা’ (Zero Tolerance) নীতি লালন করে। তিনি দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না। এটি কেবল মুখের ফাঁকা বুলি নয়, এটি কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়িত এক উজ্জ্বল সত্য। বিএনপি প্রমাণ করেছে যে, তারা দলীয় স্বার্থের চেয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ স্থানে রাখে।
 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান বিশ্বভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর দিকে গভীরভাবে তাকালে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই চরম সংকটময় ও রূপান্তরকালীন মুহূর্তে তারেক রহমানের মতো প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব পাওয়া সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ। তিনি যে মহাপরিকল্পনা, আধুনিক চিন্তাধারা ও রাষ্ট্রীয় সংকল্প নিয়ে আজ দেশকে সুশাসনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছেন, সেই সংকল্প বাস্তবায়নে তাঁকে বিজয়ী ও সফল করতেই হবে; এখানে কোনো প্রকার পিছপা হওয়া, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা কিংবা ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ নেই।
 
আমাদের অত্যন্ত গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে, তারেক রহমানের এই রাষ্ট্রীয় প্রয়াসের ব্যর্থতা মানে কেবল একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল বা কোনো একক সরকারের ব্যর্থতা নয়; তারেক রহমানের ব্যর্থতা মানে গোটা বাংলাদেশ ও এই জাতির অগ্রগতির স্বপ্নভঙ্গ। তাঁর গৃহীত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়াস যদি থমকে যায়, তবে এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্যের বিড়ম্বনা, অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্যের ইতিহাস আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। তাই মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং অবৈধ দখলদারমুক্ত এক আধুনিক, সুখী, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এই মুহূর্তে তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।
 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাষ্ট্রীয় খরচের অপ্রয়োজনীয় লাগাম টেনে ধরেছেন, রাষ্ট্র ও সমাজের চারদিকে জমে থাকা দীর্ঘদিনের জঞ্জাল পরিষ্কার করছেন এবং সুদূরপ্রসারী নানা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারমূলক কাজে হাত দিয়েছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল, দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাভোগী চক্রের তা সহ্য হচ্ছে না। আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে, প্রশাসনিক ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি নীরব অসহযোগিতার মাধ্যমে সরকারের এসব সংস্কারমূলক কাজকে বাধাগ্রস্ত করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সরকারের এই সুদূরপ্রসারী জাতীয় উদ্যোগগুলোর গভীরতা উপলব্ধি না করে অহেতুক, অপ্রাসঙ্গিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।
 
এই বিরোধী দলগুলো সম্ভবত দূরদর্শিতার অভাবে অনুধাবন করতে পারছে না যে, দেশে অহেতুক অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি হলে তার চূড়ান্ত সুবিধা কার পকেটে যাবে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতীতে অপসৃত, গণবিচ্ছিন্ন ও পলাতক স্বৈরাচারী ও চক্রান্তকারী শক্তি পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চক্রান্ত করতে পারে। আর যদি কোনোভাবে সেই পতিত স্বৈরাচার বা অশুভ শক্তির পুনরুত্থান ঘটে, তবে বর্তমান বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ, নির্মম ও মারাত্মক হবে, তা ক্ষমতার অন্ধ লোভে পড়ে তারা হয়তো আজ উপলব্ধি করতে পারছে না।
 
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে বাস্তবমুখী হয়ে বুঝতে হবে যে, বর্তমান নাজুক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা কেবল একটি সাধারণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক আচরণের এক অপরিহার্য অংশ এবং দেশপ্রেমের মূল তাগিদ। কেবল ‘বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা’ করার পুরোনো ও পচা রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন, চাঁদাবাজি রোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার যেসব যুগান্তকারী সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, সেগুলোতে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করাই বিরোধী দলগুলোর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দায়িত্ব। একটি সুস্থ, পরিপক্ব ও আদর্শিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সরকারের ভালো ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগগুলোকে গতিশীল করতে গঠনমূলক সহযোগিতা করাই প্রকৃত রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পরিচয়।
 
রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘নীতি’ ও ‘নৈতিকতা’ কেবল মুখে বলা কথা, গলার জোর, টুপি-দাড়ি কিংবা ধর্মীয় বাহ্যিক পোশাক-আশাক দিয়ে কখনোই পরিমাপ করা যায় না। নীতি হচ্ছে মানুষের মনে-মননে লালন করার বিষয়, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে তা চর্চা করার বিষয় এবং কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তগুলোতে নীতিকে শতভাগ বাস্তবায়ন করার বিষয়।
 
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রতিনিয়ত নিজেদের সততা ও নৈতিকতার একচ্ছত্র প্রতীক হিসেবে জাহির করে এসেছে। অথচ তাদের নিজেদেরই একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের চরম অনৈতিক আচরণ, একজন অসহায় তরুণীকে প্রতারণার জালে ফেলে আত্মহত্যার মুখে ঠেলে দেওয়া এবং ন্যাম ভবনের মতো সুরক্ষিত জায়গায় লাশের মর্মান্তিক উপস্থিতির পরও জামায়াতের আইনি নিষ্ক্রিয়তা ও লোকদেখানো প্রেস রিলিজের নাটক প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তাদের নৈতিকতা কেবল পোশাকেই সীমাবদ্ধ। তারা ধর্মীয় লেবাসকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা ও ফায়দা লুটতে সিদ্ধহস্ত হলেও প্রকৃত ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার পরীক্ষায় তারা চরম সুবিধাবাদী ও ব্যর্থ।
 
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি উদার, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এবং মানবিক নীতিতে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবারও প্রমাণ করেছে যে—আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং নৈতিকতার মানদণ্ড সবার জন্য সমান। দলীয় পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মূল্য বিএনপির কাছে সবচেয়ে বেশি।
 
কাজী নজরুল ইসলামের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, তরুণী মরিয়মের করুণ আত্মহত্যা এবং জামায়াতের সাংবিধানিক অপকৌশল ও ছলচাতুরীর বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তাৎক্ষণিক, কঠোর ও আপসহীন সিদ্ধান্ত এবং একই সঙ্গে কুষ্টিয়ার শিক্ষকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে তাঁকে সসম্মানে মুক্ত করার দৃষ্টান্ত সমগ্র জাতিকে এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। নিজের দলের সংসদ সদস্যকে পদত্যাগে বাধ্য করা, পুরো সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেওয়া, অভিযুক্তদের দল থেকে সরাসরি বহিষ্কার করা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করা প্রমাণ করেছে যে—ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অন্যায় ধামাচাপা দেওয়ার দিন যেমন শেষ হয়েছে, তেমনি জনগণের বাক্‌স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার প্রকৃত রাজধর্মও আজ দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
পরিশেষে বলতে চাই,দেশকে যাবতীয় অনিয়ম ও জঞ্জাল থেকে মুক্ত করা, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার যে কঠিন ও ঐতিহাসিক সংকল্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্রহণ করেছেন, তা বাস্তবায়নে আজ পুরো জাতি তাঁর পাশে ঐক্যবদ্ধ। সুতরাং দেশের ১৮ কোটি মানুষের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রত্যাশা হলো—দেশপ্রেম, সততা, সহনশীলতা, উদারতা ও ইস্পাতকঠিন নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান যে নতুন যুগের দিগন্ত উন্মোচন করেছেন, সেই সৎ ও আদর্শিক পথে হেঁটে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে নীতি, নৈতিকতা, সততা এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার এই কঠিন ঐতিহাসিক পরীক্ষায় জামায়াতে ইসলামী আজ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে এবং বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে তারা সর্বতোভাবে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা সবাইকে সহিহ্ বুঝ নসিব করুন।
 
লেখক পরিচিতি: 

আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 

  বিষয়:   নীতি-নৈতিকতা  বিএনপি-জামাত  অবস্থান 


মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত