দখলমুক্ত রাড্ডা: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে আশাব্যাঞ্জক বার্তা

আহসান হাবিব বরুন

মতামত

যেকোনো সভ্য সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেখানে আইনের শাসন কতটুকু সুপ্রতিষ্ঠিত, তার ওপর ভিত্তি করে। নিখুঁত

2026-09-29T14:21:58+06:00
2026-09-30T11:42:56+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
দখলমুক্ত রাড্ডা: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে আশাব্যাঞ্জক বার্তা
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:২১ পিএম  আপডেট: ৩০.০৯.২০২৬ ১১:৪২ এএম 
সংগৃহীত ছবি
যেকোনো সভ্য সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেখানে আইনের শাসন কতটুকু সুপ্রতিষ্ঠিত, তার ওপর ভিত্তি করে। নিখুঁত বা অপরাধহীন কোনো সমাজ বাস্তবে পাওয়া রূপকথার গল্পের মতোই অসম্ভব। সুতরাং কোনো একটি দেশে অপরাধ ঘটতে পারে, কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সরকারের অবস্থান কী, রাষ্ট্র কতটা দ্রুত এবং নির্মোহভাবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে—তা-ই একটি সরকারের সুশাসন ও সদিচ্ছার প্রকৃত পরিচয় বহন করে। 

অতি সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও দখলের ন্যক্কারজনক ঘটনার পর সরকারের দ্রুততম সময়ে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ এবং ১০০ ঘণ্টার কম সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক সেবামূলক পরিবেশে ফিরিয়ে আনা নিঃসন্দেহে দেশের মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক ও ইতিবাচক বার্তা।  

এটি সাধারণ নাগরিকদের মনে এক ধরনের স্বস্তির সুবাতাস এনে দিয়েছে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে কেবল রাড্ডা ক্লিনিকেই এই কঠোর অবস্থান সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রকে এমন আপসহীন ও দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ স্থাপন করতে হবে। অন্যায়কারীর একমাত্র পরিচয় হতে হবে যে সে একজন অপরাধী; কোনো প্রকার রাজনৈতিক কিংবা প্রভাবশালীদের পরিচয় এখানে পার পাওয়ার ঢাল হতে পারবে না।
 
পুরো ঘটনাটির গভীর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চক্রান্তের চিত্র ফুটে ওঠে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বাইরে যাওয়ার পরপরই একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও দুষ্কৃতকারী চক্র দেশকে অস্থিতিশীল করার এক মরিয়া চেষ্টায় মেতে ওঠে। 

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকার এই সংক্ষিপ্ত সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে জমি ও প্রতিষ্ঠান দখলের অপচেষ্টা চালানো হয়, যার অন্যতম প্রধান শিকার মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সেখানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় এবং ক্লিনিকের মূল সাইনবোর্ড সরিয়ে রাতারাতি ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি অবৈধ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। 

বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত একটি জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে ঘিরে এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন সাধারণ অপরাধ ছিল না, বরং এর পেছনে রাষ্ট্রকে বিপদে ফেলার এবং সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন করার গভীর নীল নকশা বিদ্যমান ছিল। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
 
আরো বিপজ্জনক হচ্ছে,এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনেও কিছু রহস্যজনক ও স্পর্শকাতর ঘটনার উদয় হতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকাকালীন ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ইনটেলিজেন্স ব্যুরো বা আইবির একজন সক্রিয় সদস্য রবিউল ইসলামকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যিনি পরবর্তীতে চার দিনের রিমান্ডে যান। এই ব্যক্তি গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন।  

শুধু তা-ই নয়, ২৫ সেপ্টেম্বর কোনো ধরনের পূর্বানুমোদন ছাড়াই একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভারতীয় গোয়েন্দা বিমান বাংলাদেশের আকাশসীমার ওপর দিয়ে অত্যন্ত নির্দ্বিধায় উড্ডয়ন করে। এই সবকটি ঘটনাকে যদি একটি সুতোয় গাথা হয়, তবে পরিষ্কার বোঝা যায় যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুপস্থিতিকে দেশের ভেতরে ও বাইরের একটি অশুভ গোষ্ঠী মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা পুরোপুরি বিনষ্ট করা।
 
কিন্তু চক্রান্তকারীদের সেই সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে সময় নেয়নি। জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো পরিস্থিতির ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্র আইনের কঠোর প্রয়োগ শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেই প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন, যা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সুতরাং অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাটাই প্রমাণ করে যে এই সরকার কোনো অন্যায়কে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দিতে রাজি নয়। রাড্ডা ক্লিনিক দখলের ঘটনায় পুলিশের তাৎক্ষণিক অভিযানের ফলে ইতোমধ্যে ৯ জন মূল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে লুট হয়ে যাওয়া দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। 

একই সাথে ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনে অবহেলা করায় শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে সরকার প্রমাণ করেছে যে, কেবল অপরাধীই নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্বে থেকে কেউ শিথিলতা দেখালেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। 
 
সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে দখলদারদের টাঙানো অবৈধ সাইনবোর্ড উচ্ছেদ করে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নিজস্ব সাইনবোর্ড আবার স্বগৌরবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

ভাঙচুরের দাগ পুরোপুরি না শুকালেও থেমে থাকেনি এর চিকিৎসাসেবা। ভেতরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের কাজ চালুর পাশাপাশি বাইরে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে সাধারণ মানুষদের নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি কেবল একটি দখল হওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের গল্প নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দারুণ নিদর্শন। 

অন্যায় ঘটতে পারে, কিন্তু সেই অন্যায়ের মুখোমুখি হয়ে সরকার অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ায় নাকি কঠোর হস্তে আইন প্রয়োগ করে—সেটিই আসল প্রশ্ন। আর এ ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারের ইতিবাচক ও শক্তিশালী অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
 
তবে এই সুসংবাদের পাশাপাশি একটি গম্ভীর সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করা জরুরি। ভবিষ্যতে কোনো সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী যেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রশাসনিক শিথিলতার ফায়দা তুলে এরকম নজিরবিহীন দুঃসাহস দেখাতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রশাসনকে দিনরাত সতর্ক থাকতে হবে। 

বাংলাদেশের মতো ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে স্পর্শকাতর এবং সম্ভাবনাময় দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও জনগণের সমর্থনপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে অনবরত ষড়যন্ত্র থাকাটাই স্বাভাবিক। 
দেশের ভেতরের ও বাইরের চক্রান্তকারীরা যেকোনো মুহূর্তে সরকারের সামান্যতম অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করবে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই সরকারকে প্রতি মুহূর্তে বিচক্ষণতার সাথে পা ফেলতে হবে। 

পরিশেষে বলতে চাই, রাড্ডা ক্লিনিক উদ্ধার করে সরকার আইনের শাসনের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে, তা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গি ও কঠোর অবস্থান বজায় থাকলে দেশ থেকে অপরাধ প্রবণতা যেমন কমবে, তেমনই আইনের শাসনের ওপর সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা সম্পূর্ণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লহ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
 
লেখক পরিচিতি: 

আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 

  বিষয়:   রাড্ডা  আইনের শাসন  আশাব্যাঞ্জক 


মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত