সবার জন্য স্বাস্থ্য: দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহির মাধ্যমে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশের

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মতিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম

মতামত

একজন অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা ও আশ্রয়ের প্রত্যাশায়। তাঁর কাছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে কয়েকটি সরল প্রশ্নের

2026-09-27T19:10:21+06:00
2026-09-27T19:10:21+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
সবার জন্য স্বাস্থ্য: দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহির মাধ্যমে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশের
স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠনে প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগ, উন্মুক্ত ক্রয় ব্যবস্থা, পরিকল্পিত জনবল, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং সমন্বিত বাস্তবায়ন
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মতিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১০ পিএম  
যাযাদি ছবি
একজন অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা ও আশ্রয়ের প্রত্যাশায়। তাঁর কাছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে কয়েকটি সরল প্রশ্নের ওপর—সময়মতো চিকিৎসক পাওয়া গেল কি না, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হলো কি না, ওষুধ পাওয়া গেল কি না এবং চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবার বিপর্যস্ত হলো কি না। স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি সংস্কারের কেন্দ্রে থাকতে হবে এই মানুষের প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ অর্থের অপচয় কিংবা আত্মসাতের প্রভাব সরাসরি রোগীর জীবনে পড়ে। অনিয়মের কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র কেনা হতে পারে, জরুরি যন্ত্র মেরামতে আটকে থাকতে পারে কিংবা প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ বিলম্বিত হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধকে রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা প্রাপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সরকারের কঠোর পদক্ষেপের অর্থ স্পষ্ট—অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা, প্রমাণ সংরক্ষিত রাখা, নিরপেক্ষ তদন্ত করা, আইন অনুযায়ী দায় নির্ধারিত করা এবং একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তির সুযোগ বন্ধ করা। এই ব্যবস্থার আওতায় পদমর্যাদা বা পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ছাড় থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে সৎ কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন দায়িত্ব পালনে অযথা হয়রানি বা সিদ্ধান্তহীনতার শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠনের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত হাসপাতালের উন্নয়নকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনায় আনতে হবে। হাসপাতালের সম্প্রসারণ, জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারকে একটি সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে। সেখানে প্রতিটি কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, প্রয়োজনীয় অর্থ, সময়সীমা এবং অগ্রগতি যাচাইয়ের সূচক নির্ধারিত থাকবে। বিদ্যমান নিরীক্ষা, তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সমন্বয় করতে হবে; যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কেবল সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূল্যায়নের ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে দেওয়া যাবে না।

প্রথম কাজ হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন সব অধিদপ্তর, হাসপাতাল, প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্পের ঝুঁকিকেন্দ্রিক পর্যালোচনা। বড় অংকের ক্রয়, বারবার ব্যয় বৃদ্ধি, অসমাপ্ত নির্মাণ, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, অস্বাভাবিক সরবরাহ বিল, নিয়োগে অভিযোগ এবং একই প্রতিষ্ঠানের বারবার কাজ পাওয়ার মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। এগুলো তদন্তের সংকেত হিসেবে বিবেচিত হবে; প্রমাণ ছাড়াই অপরাধের সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত বাজেট, প্রকৃত ব্যয়, জনবল, ওষুধের মজুদ, যন্ত্রপাতির অবস্থা, চলমান প্রকল্প ও চুক্তির হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কাগজের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব অবস্থা মিলিয়ে দেখতে হবে। হাসপাতালে সরবরাহ দেখানো পণ্য সত্যিই পৌঁছেছে কি না, নির্মাণকাজ ঘোষিত মানে হয়েছে কি না এবং কেনা যন্ত্র রোগীর কাজে লাগছে কি না—এসব সরেজমিনে যাচাই জরুরি।

অভিযোগ পাওয়ার পর নথি, ডিজিটাল রেকর্ড, বিল, গ্রহণপত্র ও সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নথি পরিবর্তন বা ধ্বংসের ঝুঁকি থাকলে আইনসম্মত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্তে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে এমন ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে হবে। প্রশাসনিক ত্রুটি, অবহেলা, আর্থিক অনিয়ম ও অপরাধের মধ্যে পার্থক্য করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয় ব্যবস্থা, অর্থ পুনরুদ্ধার, চুক্তিগত প্রতিকার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফৌজদারি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। সম্পদ বা ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিতে হবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ করা যেতে পারে, তবে ব্যক্তিগত তথ্য, সাক্ষীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি প্রধান ক্ষেত্র হলো নিয়োগ, পদায়ন ও বদলি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত পদ, শূন্যপদ এবং বাস্তব প্রয়োজনের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। নিয়োগের যোগ্যতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও ফল নির্ধারণের মানদণ্ড আগে জানাতে হবে। পরীক্ষার গোপনীয়তা, মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা এবং অভিযোগ পর্যালোচনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের স্বার্থের সংঘাত ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

পদায়ন ও বদলির জন্য রোগীর চাপ, এলাকার প্রয়োজন, চাকরির কাল, বিশেষ দক্ষতা এবং যুক্তিযুক্ত ব্যক্তিগত পরিস্থিতিভিত্তিক নীতি থাকতে হবে। নিয়মের ব্যতিক্রম হলে কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন, কোন তথ্যের ভিত্তিতে নিয়েছেন এবং অনুমোদন কোথা থেকে এসেছে—এসব নিরীক্ষাযোগ্য হতে হবে। বর্তমান আউটসোর্সিং ভিত্তিক জনবল নিয়োগ বন্ধ করে নিয়মিত ও স্থায়ী প্রয়োজনের কাজে অনুমোদিত পদে সরাসরি, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করছি। এই পরিবর্তনের জন্য বিদ্যমান চুক্তি, কর্মরত জনবল, বেতন ও প্রকৃত কাজ পর্যালোচনা করতে হবে। বর্তমানে কর্মরত কর্মীদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার রক্ষা করে, তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনার সুযোগ রেখে প্রযোজ্য নিয়মে নতুন ব্যবস্থায় যেতে হবে। বিকল্প জনবল নিশ্চিত করার আগেই কর্মী সরিয়ে হাসপাতালের সেবা ব্যাহত করা যাবে না।

স্বাস্থ্যখাতের সব প্রকল্প, দরপত্র ও ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অনলাইনে নথিভুক্ত ও অনুসরণযোগ্য করতে হবে। চাহিদা নিরূপণ, অনুমোদন, দরপত্রের শর্ত, মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, সরবরাহ, গ্রহণ, বিল পরিশোধ এবং নিরীক্ষা একই ধারাবাহিক রেকর্ডে যুক্ত থাকতে হবে। বিদ্যমান ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্যের পুনরাবৃত্তি ও বিচ্ছিন্নতা কমাতে হবে। অনলাইন পদ্ধতিতেও পক্ষপাতমূলক শর্ত কিংবা যোগসাজশের ঝুঁকি থাকে। তাই দরপত্রের শর্ত কোনো নির্দিষ্ট সরবরাহকারীকে সুবিধা দিচ্ছে কি না, প্রতিযোগিতা যথেষ্ট হয়েছে কি না এবং মূল্য বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক কি না—তা যাচাই করতে হবে। দরপত্রদাতার প্রকৃত মালিকানা, সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্কের প্রকাশের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, সময়সীমা, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী, কাজের অগ্রগতি এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করতে হবে। চুক্তি পরিবর্তন বা সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তও একই রেকর্ডে থাকতে হবে। জরুরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের ব্যাখ্যা, অনুমোদন ও পরবর্তী নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

যন্ত্রপাতি কেনার আগে লিখিত প্রয়োজন মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। কত রোগীর কাজে লাগবে, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে সেবাটি চালু করা সম্ভব কি না, প্রশিক্ষিত জনবল আছে কি না এবং নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কী—এসব বিবেচনা করতে হবে। যন্ত্র বসানোর জায়গা, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, ব্যবহার্য উপকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তুতি ছাড়া ক্রয় অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। মূল্যায়নে ক্রয়মূল্যের সঙ্গে পুরো ব্যবহারকালের সম্ভাব্য ব্যয় যুক্ত করতে হবে। ওয়ারেন্টি, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং মেরামতের সময়সীমা চুক্তিতে স্পষ্ট থাকতে হবে। সরবরাহের পর মডেল, সিরিয়াল নম্বর, আনুষঙ্গিক উপকরণ ও কার্যকারিতা যাচাই করে গ্রহণ করতে হবে। চাহিদা তৈরি, ক্রয় মূল্যায়ন এবং সরবরাহ গ্রহণের দায়িত্ব যথাসম্ভব পৃথক রাখতে হবে।

সব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের ডিজিটাল তালিকায় অবস্থান, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ব্যবহার, অচল হওয়ার সময় ও মেরামতের অগ্রগতি থাকতে হবে। অব্যবহৃত বা অচল যন্ত্রের ক্ষেত্রে মেরামত, অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, প্রতিস্থাপন কিংবা যথাযথ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন ক্রয়ের আগে বিদ্যমান সম্পদের ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করতে হবে।

ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণের ক্ষেত্রেও সংগ্রহ থেকে রোগীর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত হিসাবের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। ব্যাচ নম্বর, মেয়াদ, পরিমাণ, গুদামে গ্রহণ, বিভাগে বিতরণ ও অবশিষ্ট মজুদ নথিভুক্ত রাখতে হবে। নিয়মিত বাস্তব গণনার সঙ্গে ডিজিটাল হিসাব মিলিয়ে দেখতে হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সতর্কবার্তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈধভাবে মজুদ পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সরকারি হাসপাতালে কোন প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা পাওয়া যাচ্ছে, সে তথ্য রোগীকে সহজভাবে জানাতে হবে। মজুদ থাকার পরও বাইরে থেকে কিনতে বলা কিংবা সুলভ সেবা না দেওয়ার অভিযোগ দ্রুত যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্বও নির্ধারিত থাকতে হবে।

নির্মাণকাজে ভূমি ও প্রয়োজন যাচাই, বাস্তবসম্মত নকশা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, উপকরণের মান এবং কাজের অগ্রগতি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কাজের পরিমাপ ও মান নিশ্চিত করার পর চুক্তি অনুযায়ী বিল দিতে হবে। ভবন হস্তান্তরের সময় বিদ্যুৎ, পানি, অগ্নিনিরোধ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রবেশের প্রস্তুতি যাচাই করতে হবে। নির্মাণের ত্রুটি সংশোধনের দায়িত্ব ও সময়সীমা কার্যকর করতে হবে।

দুর্নীতি চিহ্নিত করার জন্য রোগী, কর্মী ও নাগরিকদের নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা জরুরি। অনলাইন, টেলিফোন ও সরাসরি অভিযোগ—সব পদ্ধতি রাখতে হবে। প্রতিটি অভিযোগে নম্বর, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অগ্রগতি জানার সুযোগ থাকতে হবে। জরুরি রোগীর নিরাপত্তার অভিযোগ দ্রুত আলাদা করে ব্যবস্থা নিতে হবে; অন্যান্য অভিযোগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাচাই করতে হবে। পরিচয় গোপন রেখে তথ্য দেওয়ার সুযোগ এবং প্রতিশোধমূলক হয়রানি থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হলেই অভিযোগকারীকে অসৎ ধরে নেওয়া যাবে না। একইভাবে যাচাই ছাড়া অভিযুক্তকে দোষী ঘোষণা করা যাবে না। অভিযোগের সংখ্যা, নিষ্পত্তির সময় ও গৃহীত ব্যবস্থার সারসংক্ষেপ ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দিয়ে প্রকাশ করা যেতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়েও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। সেবার সক্ষমতা, মান ও মূল্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে। পরীক্ষা, শয্যা, অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা-পদ্ধতির মূল্য বাস্তব ব্যয়, মান এবং মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মূল্যসীমা এবং জটিল চিকিৎসায় ব্যাখ্যাসহ সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিসর রাখা যেতে পারে। মূল্যতালিকা, প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত সেবা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের শর্ত আগে জানাতে হবে। রোগীকে খাতভিত্তিক বিল দিতে হবে। ঘোষিত কমিশন ও আর্থিক স্বার্থের কারণে রোগী পাঠানোর অনিয়ম প্রতিরোধ করতে হবে। সরকারি অর্থে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা কেনা হলে যোগ্য রোগী নির্বাচন, সেবা যাচাই, বিল পরিশোধ এবং অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সীমা চুক্তিতে স্পষ্ট থাকতে হবে।

এই সংস্কার পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল প্রয়োজন। সরকারের কাছে আমার প্রস্তাব— ৫১তম বিসিএসে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নিন, এই নিয়োগে বয়সসীমা ৩৪ বছর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন এবং নিয়োগের পর চার মাসের সমন্বিত প্রশিক্ষণ নির্দেশিত করুন।** এটি একটি প্রস্তাবিত নিয়োগ-লক্ষ্য; শূন্যপদ, সম্প্রসারিত সেবার প্রয়োজন ও অর্থায়ন যাচাই করে বাস্তবায়নের কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। চিকিৎসকের সঙ্গে নার্স, টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও সহায়ক কর্মীর প্রয়োজনও পূরণ করতে হবে।

প্রস্তাবিত প্রশিক্ষণে দুই মাস মৌলিক প্রশিক্ষণ, এক মাস হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং এক মাস চিকিৎসক–রোগীর কার্যকর যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিদ্যমান প্রশিক্ষণের সঙ্গে সমন্বয় করে এর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নৈতিকতা, রোগীর অধিকার, সম্পদের সঠিক ব্যবহার, অনিয়ম জানানোর পদ্ধতি এবং স্বার্থের সংঘাত চিহ্নিত করার বিষয়ও পাঠ্যক্রমে রাখতে হবে। সকল স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পর্যালোচনা করে এর ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। বিভাগীয় সহযোগী কেন্দ্র, ব্যবহারিক অনুশীলন, নিয়মিত পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণকে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে।

পুরো কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নিম্নোক্ত সময়সূচি প্রস্তাব করছি—

১. প্রথম ৩০ দিন: দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও সমন্বয়ব্যবস্থা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা সচল এবং উচ্চঝুঁকির প্রকল্প ও ক্রয়ের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করতে হবে। জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ সচল রাখতে হবে।

২. ৩১ থেকে ৯০ দিন: নির্বাচিত উচ্চঝুঁকির প্রতিষ্ঠানে আর্থিক ও বাস্তব যাচাই শুরু, জনবল ও যন্ত্রপাতির তালিকা প্রস্তুত এবং ক্রয় ও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তদন্তযোগ্য অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে।

৩.তিন থেকে ছয় মাস: অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নিরীক্ষার সুপারিশ বাস্তবায়ন, প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়োগ ও পদায়নের স্বচ্ছ মানদণ্ড চালু এবং আউটসোর্সিং থেকে উত্তরণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও বিলের সমন্বিত ডিজিটাল হিসাব পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে।

৪.ছয় থেকে বারো মাস: পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার ফল যাচাই করে সফল পদ্ধতি সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শুরু এবং মূল্যতালিকা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।

৫.প্রতি বছর: অর্থ পুনরুদ্ধার, নিরীক্ষার আপত্তি নিষ্পত্তি, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়, ওষুধের প্রাপ্যতা, যন্ত্রপাতির সচলতা, রোগীর অপেক্ষার সময় এবং অভিযোগ সমাধানের ফল প্রকাশ করতে হবে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা সংশোধন করতে হবে।

সাফল্য মূল্যায়নে মামলা, শাস্তি বা অর্থ পুনরুদ্ধারের সংখ্যার পাশাপাশি রোগীর সেবা প্রাপ্তির পরিবর্তন দেখতে হবে। চিকিৎসা সুলভ হলো কি না, ওষুধ পাওয়া গেল কি না, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমলো কি না এবং দায়িত্বশীল কর্মীরা নিরাপদে কাজ করতে পারলেন কি না—এসবই গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালের ফল তুলনায় রোগের তীব্রতা, রোগীর ধরন ও তথ্যের মান বিবেচনায় রাখতে হবে।

স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, পেশাগত দক্ষতা এবং ধারাবাহিক নজরদারি। সিদ্ধান্তের কারণ দৃশ্যমান হলে, ব্যয়ের হিসাব যাচাইযোগ্য হলে, অভিযোগের প্রতিকার মিললে এবং অনিয়মের প্রমাণে ব্যবস্থা নেওয়া হলে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান—প্রতিটি নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রতিটি ক্রয়ে প্রয়োজনের প্রমাণ, প্রতিটি প্রকল্পে মান যাচাই এবং প্রতিটি অভিযোগে ন্যায়সংগত প্রতিকার নিশ্চিত করুন। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সম্পদ মানুষের চিকিৎসায় যথাযথভাবে ব্যবহৃত হলেই সবার জন্য স্বাস্থ্য এবং সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তব রূপ পাবে।


অধ্যাপক ডা. এ কে এম মতিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম

এমবিবিএস (বিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি)

বিভাগীয় প্রধান—কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা
মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত