যে আগুনে, পুড়ছি আমরা !

শাহীন রাজা

মতামত

হাজার বছর আগের এক কাহিনী। এটি একটা উপকথার উপাখ্যান। বিষয় হচ্ছে,এক 'সোনার বেঁজী'র কল্পকথা। এই সোনার বেঁজীকে নিয়ে 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণে'র

2026-09-30T23:24:12+06:00
2026-09-30T23:24:12+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
যে আগুনে, পুড়ছি আমরা !
শাহীন রাজা
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৪ পিএম  
শাহীন রাজা
হাজার বছর আগের এক কাহিনী। এটি একটা উপকথার উপাখ্যান। বিষয় হচ্ছে,এক 'সোনার বেঁজী'র কল্পকথা। এই সোনার বেঁজীকে নিয়ে 'ভগবান  শ্রীকৃষ্ণে'র সাম্রাজ্যের প্রজাকুল আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওঠে ! এই সোনার বেঁজীটা যার হাতেই  যায়, কিছুক্ষণের মধ্যে সেই আততায়ীর হাতে প্রাণ হারায়। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলছে ! একদিকে সোনার বেঁজী লাভের লোভ। আরেকদিকে অবধারিত মৃত্যু। এই মহাসঙ্কট থেকে পরিত্রাণ লাভের আশায়, অবশেষে প্রজাকুল ভগবান কৃষ্ণের দরবারে হাজির হয়। প্রজারা প্রার্থনা জানায়, "ভগবান , আমাদের এই সঙ্কট থেকে উদ্ধার করুন। এর একটা বিহিত না হলে গোটা জনপদ জনশূন্য হয়ে যাবে" ! 

প্রজাদের কথা শুনে শ্রীকৃষ্ণ চিন্তিত হয়ে ওঠেন। তাঁর দক্ষিণ হস্ত এবং সার্বক্ষণিক সঙ্গী অর্জুনকে ঘটনার বিষদ বর্ণনার জন্য অনুরোধ জানান। অর্জুন ধারাবিবরণী দিতে যেয়ে বলেন, ভগবান এ হচ্ছে এক অশনি সঙ্কেত। এখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। এরপর সোনার বেঁজী উপাখ্যান সম্পর্কে বলতে থাকেন। ভগবান আপনি কি জানেন,"আপনার সাম্রাজ্যের এক রাজ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। ক্ষুধা'র জ্বালায় প্রজাকুলের প্রাণান্ত অবস্থা। এমন অবস্থায়-ও এক সামন্ত রাজা, রাজ্যের ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করতে হয়েছে। তবে শর্ত হলো, প্রতি এলাকা থেকে মাত্র একজন ব্রাহ্মণ  রাজার অতিথি হয়ে আসবেন।  

রাজার নিমন্ত্রণে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ-ও রাজ দরবারে ভোজ খেতে উপস্থিত হয়েছিলেন।  যেয়ে দেখেন, অতিথিদের জন্য যে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে তা যৎসামান্য। সাথে যে উপঢৌকন দেয়া হয়েছে তা-ও খুবই স্বল্প মূল্যের। দুর্ভিক্ষের কারণেই রাজাকে এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ব্রাহ্মণ খাবার হাতে নিয়ে দেখেন, একজনের অতিরিক্ত নয়। নিজে না খেয়ে অসুস্থ স্ত্রী'র জন্য খাবারটি নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেন। 

রাজ বাড়ি থেকে আনা খাবার ব্রাহ্মণ স্ত্রী'র দিকে বাড়িয়ে বলেন,খাও।খাবারটিতে কোন স্পর্শ না দেখে ব্রাহ্মণের স্ত্রী বলেন, এ দেখছি তুমি কিছুই খাওনি। জবাবে ব্রাহ্মণ বলেন, অনেক বয়স হয়েছে। এখন সংসারে আমার থেকে তোমার প্রয়োজন অনেক বেশী। এই বলে ব্রাহ্মণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।ব্রাহ্মণের স্ত্রী খাবারটি হাতে নিয়ে ভাবতে থাকে, এই খাবার তাঁর থেকে ছেলের বেশী প্রয়োজন। যা ভাবা, তাই কাজ। ছেলেকে ডেকে বলেন, বাবা আমার ঢের বয়স হয়েছে। পরপারে যাওয়ার সময়-ও হয়ে এসেছে। তোমার নতুন জীবন, তোমাকে বাঁচতে হবে। ছেলের হাতে খাবারটি দিয়ে, তিনিও পরপারে যাত্রা করেন। ছেলে অবাক হয়ে বাবা-মা'র মৃত দেহের তাকিয়ে থাকেন। শুধুমাত্র ক্ষুধা'র কারণেই বাবা-মাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে !  

খাবার হাতে ছেলের মনে হয়, বউ-তো সন্তান সম্ভাবনা। খাবারটি তাঁর থেকে বউয়ের বেশী প্রয়োজন। অবশেষে বউয়ের হাতে খাবারটি তুলে দিয়ে বলেন, বউ আমাদের আগামী ভবিষ্যতের জন্য এই খাবারটুকু তোমাকে দিলাম। তুমি নাও। খাবারটি বউয়ের হাতে দিয়েই ব্রাহ্মণের ছেলে-ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
 
ছেলের বউ, পাশাপাশি তিনজনের মৃতদেহ দেখে শোক-দুঃখে উন্মাদ হয়ে যায়। একটুকুন খাবারের জন্য তিন তিনটি লোক পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল ! এই খাবার কোনভাবেই তাঁর পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এই বলে খাবারটি দুড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। এবং ক্ষুধা'র কষ্টে তাঁকেও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হয়।

উঠোনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খাবার  পাশের জঙ্গল থেকে একটা বেঁজী এসে খেয়ে নেয়। বেঁজী যেই না খাবার মুখে দিয়েছে অমনি আগুনে পুড়তে থাকে। আগুনে পুড়ে,পুড়ে বেঁজীটি সোনায় রূপান্তরিত হয়। এরপর ভিটে শুন্য ব্রাহ্মণের বাড়ি এক সময় জঙ্গল হয়ে ওঠে। চারপাশে শুধুই জঙ্গল।

অর্জুন বলেন, এর অনেকদিন পরের কথা। এক কাঠুরে কাঠ কাটতে, কাটতে এক সময় ব্রাহ্মণের বাড়ির কাছাকাছি চলে আসে। হঠাৎ সোনার বেঁজীটা তাঁর চোখে পড়ে। সোনার বেঁজী দেখে চোখ তাঁর জ্বল, জ্বল করতে থাকে। কাঠুরে,বেঁজী-টা তাঁর ঝোলায় তুলে নেয়। সারাদিন নিশ্চুপ,নিঃশব্দ।  সাথীদের কাছে এ নিয়ে একটি কথাও বলেনি। একমনে কাঠ কাটতে থাকে। এ কথা বলতে না পেরে কাঠুরে একসময় অস্থির হয়ে যায়। একসময় ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর দেখা পায়। বন্ধুকে না বলে আর থাকতে পারে না। সব বলে দেয়। এরপর বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। রাত পার হয়ে যায়। কাঠুরে আর ঘরে ফিরে না। 

নিখোঁজ কাঠুরিয়ার  মৃতদেহ জঙ্গলের ভেতর পরে থাকতে দেখা যায়। এরপর সোনা'র বেঁজীটি হাত বদল হতে থাকে। এবং একের পর এক হত্যা আর হত্যা। এই মহাসঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে 'ভগবান' অবশেষে আপনার দরবারে হাজির হয়েছে সবাই।"

পুরো ঘটনা শুনবার পর, ভগবান কৃষ্ণ বেশ খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থাকেন। চোখ খুলে বলেন, "ক্ষুধা, কাম, ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকার আকুতির আগুন এই বেঁজীতে। তাই এই বেঁজী যার কাছেই যাবে তাঁর মৃত্যু অবধারিত। কেননা বেঁজীটা পুড়ে সোনায় রূপ নেবার পর ওখানে লোভ-ও ঢুকে গেছে। এর কারণে রাজ্যের পর রাজ্য জনশূন্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই একে দুরে, বহুদুরে যতদুর যায় ছুড়ে ফেলে দাও"। কৃষ্ণ এই দায়িত্ব পালনের জন্য, অর্জুনকে নির্দেশ দেন। কৃষ্ণ বলেন, অর্জুন, তোমার তীর-ধনুক নিয়ে আসো। এই স্বর্নের বেঁজী-টা তীরের মাথায় শক্ত করে বাঁধো। অর্জুন, শ্রী কৃষ্ণের নির্দেশ যথাযথ পালন করেন। এরপর শ্রী কৃষ্ণ আদেশ দেন, তির-টা ধনুকে নিয়ে যতোটা শক্তি আছে তা দিয়ে ছুঁড়ে মারো। অর্জুন ধনুর ছিলায় বাণ লাগিয়ে সমস্ত শক্তি ছুড়ে দেন। এরপর বাণ এসে পড়ে বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী। বেঁজী পড়ার সাথে, সাথেই চারদিক থেকে বালি জমতে থাকে। এবং অবশেষে বঙ্গ বা সমতট ভূমি সমুদ্র পৃষ্ঠে জেগে ওঠে। যা আজকের বাংলাদেশ !  

'মহাভারত' থেকে অনুসৃত এর বস্তুগত বক্তব্য হচ্ছে, এই অঞ্চলে স্থানীয়রা একে অপরের বিরুদ্ধে সবসময় আক্রমনাত্মক। প্রাচীনকাল থেকে মধ্যকাল পর্যন্ত সামন্ত রাজাদের মধ্যে সবসময় যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকতো। এবং তা এখনও চলমান। শুধু ধরণ পাল্টিয়েছে।এখনও, ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে এক এলাকার লোকজন আরেক এলাকার  লোকদের উপর দা-বল্লম নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। সামান্য ইস্যু নিয়ে রক্তারক্তি বিবাদ চলে।  বংশগত ঐতিহ্য, সামাজিক প্রাধান্য এবং নিজ গ্রামের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালয়। এই নিয়ে প্রতিবছরই বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলমান। 

এই সামন্তয়ী গ্রামীণ সংস্কৃতি রাজনীতিতে অনেক আগেই ঢুকে গেছে। এখন তার নগ্ন প্রকাশ চলছে শুধু । আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রতিপক্ষের নেতা এমনকি সর্বজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিকে জঘন্য শব্দে গালিগালাজ। এই অবস্থা বাড়তে থাকলে একসময় গালিগালাজ হাতাহাতিতে রূপ নেবে। এমনকি একে অপরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণেও যেতে পারে। তবে এমন অবস্থায় যেন কখনোই না পৌঁছায়, কায়মনে আমাদের  এই প্রার্থনা সবসময়। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, রাজনীতিতে অশ্লীল বাক্য ব্যবহার এবং নোংরা কৌশল ব্যবহার দেশ ও জাতির জন্য শুভ বা সুখকর নয়। স্বল্প মেয়াদে এই কাজগুলো ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু  দীর্ঘমেয়াদে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার জন্য চরম অমঙ্গল ডেকে আনে। গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ। তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপপ্রচার দিনশেষে পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানকেই ধ্বংস করে দেয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, রাজনীতিতে যখন অশ্লীল বাক্য ব্যয় ও অপপ্রচার চরম আকার ধারণ করে, তখন সাধারণ মানুষ ও স্বাধীন ভোটাররা রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। এ ধরনের আচরণের ফলে সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে চরম মেরুকরণ তৈরি হয়। যা জাতিগত সংকটের সময়েও দলগুলো এক টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে

এই অন্তঃকলহকে পুঁজি করেই বিদেশি শক্তি আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলিয়ে বসে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে তা দৃশ্যমান। আমরা দেখতে পাই, আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কলহকে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শক্তি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আছে। এখনও তারা একই কাজ করছে। তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে  সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে এখন আর সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। তারা এখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দল এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোকে তাদের হাতিয়ার বা 'প্রক্সি' হিসেবে ব্যবহার করে। সরকার বিরোধী দলগুলোকে আর্থিক বা লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে থাকে। বিরোধী দলগুলোকে দিয়ে বড় বড় র‍্যালি, সমাবেশ এবং দেশব্যাপী ধর্মঘটের আয়োজন করে। প্রোপাগান্ডা এবং তথ্য যুদ্ধ চালানো হয়। স্থানীয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রাজনৈতিক দল বা তাদের আইটি সেলকে ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা, প্রচার করা হয়। সরকারের দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অর্থনৈতিক ব্যর্থতার বিষয়গুলোকে (যা অনেক সময় অতিরঞ্জিত) সামনে নিয়ে আসা হয়। 

এছাড়া গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার রক্ষার নামে সুশীল সমাজ ও এনজিওদের ব্যবহার করা হয়। রাজনৈতিক দলের বাইরে শক্তিধর দেশগুলো তাদের সমর্থিত সুশীল সমাজ, থিংক ট্যাংক এবং এনজিওগুলোকে সরকার বিরোধী বক্তব্য দেয়ায়। বাহিরের দেশের বিভিন্ন সংস্থা গণতন্ত্রায়ন বা মানবাধিকার রক্ষার নামে আর্থিকভাবে সহযোগিতা দেয়া হয়। এগুলো পরে সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

একারণেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, শাসকের পক্ষে একই সাথে ভালোবাসার পাত্র এবং কঠিন হওয়া উত্তম। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন সেই কঠিন হওয়া যেন ঘৃণায় পরিণত না হয়।
মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত