অপ্রতিম । সংগৃহীত ছবি অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের কাদিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার বিকালে ১৩ বছরের অপ্রতিম বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। তার মায়ের আইফোনটি সঙ্গে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলাই ছিল তার উদ্দেশ্য। এমনটাই সে বাড়িতে বলে গিয়েছিল। সে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা খুজতে শুরু করে এবং ২২ ঘণ্টা পর পুলিশ কুমিল্লা ইউনিভার্সিটির কাছে একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিন জনকে আটক করা হয়েছে। আটককারীরা বলেছে, ফোনটি চুরি করার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে অপ্রতিমের মা বলেছেন, হত্যার উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন যে, কিছুদিন আগে তিনি মাদকসেবী কয়েকজনকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত মূল কারণ যাই হোক না কেন, হৃদয়বিদারক ঘটনা হচ্ছে ১৩ বছরের একটি শিশু বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর ফিরে আসেনি। এই শিশু খুনের ঘটনায় দেশবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
মিডিয়ায় প্রচারিত অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগমের কান্না সবার হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিনি বারবার জানতে চেয়েছেন, তার ছেলে এমন কি ভুল করেছিল, যার কারণে তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো। আমরা দেখেছি, কুমিল্লা-৬ আসনের এমপি মনিরুল হক চৌধুরী এই ঘটনায় আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছেন, এ কোন দেশে আমরা বাস করছি, যেখানে শিশুকে হত্যা করতে খুনির হাত কাপে না। এলাকার এক জন জনপ্রতিনিধি হিসেবে একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থতার জন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। এই ঘটনায় ঢাকা ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি সাদিক কায়েম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এর আগেও এ ধরনের বিভিন্ন ঘটনায় দেশ জুড়ে ক্ষোভ, প্রতিবাদ, দ্রুত বিচারের আশ্বাস এবং কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে। কিন্তু তারপরও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা থেমে নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৫ সালে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার এক হাজার ২৪টি ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের ২০ মে পর্যন্ত সংগঠনটি এ ধরনের ১১৮টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এবং ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টার পর ১৭টি শিশু হত্যার শিকার হওয়ার তথ্য জানিয়েছে। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা রয়েছে এবং এগুলোকে অপ্রতিমের মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা উচিত নয়। তবে একটি দিক স্পষ্ট যে, দেশের শিশুরা আশঙ্কাজনকভাবে চরম ঝুকিতে রয়েছে এবং বাংলাদেশ ক্রমেই এ ধরনের খুন-খারাবি-ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।
বর্তমান সাত মাস বয়সী সরকার এককভাবে এসব সমস্যার সৃষ্টি করেনি। তারা দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিভক্ত নেতা-কর্মী-জনগণ এবং ভঙ্গুর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তরাধিকার পেয়েছে। তবে এটাও ঠিক, একটি নির্বাচিত সরকার অনির্দিষ্টকাল ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পরিস্থিতির কথা বলে চলমান নিরাপত্তাহীনতাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। গণতান্ত্রিক বৈধতার সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত থাকে। এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, যা সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিমূলক হতে হবে। আর সরকারের দায়িত্ব শুধু অপ্রতিমের কথিত হত্যাকারীদের গ্রেফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এমন একটি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে দেয়া ঠিক হবে না, যেখানে জাতীয়ভাবে আলোচিত অপরাধগুলোর ক্ষেত্রেই কেবল পুলিশকে নড়েচড়ে বসতে দেখা যায়।
দেশবাসীর নিরাপত্তার মূল মাপকাঠি হলো অপরাধ প্রতিরোধ। ন্যায়বিচারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি আলোচিত অপরাধের পর ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’র দাবি উঠাই স্বাভাবিক। তবে দৃষ্টান্তমূলক বিচারকে দ্রুত বিচারের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজন এমন তদন্ত, যা যে কোনো প্রভাবশালীর বাধা মুখেও সঠিক রিপোর্ট দিতে পারে বা জনরোষকে নিরসন করার জন্য যেন অভিযুক্তর প্রতি অন্যায় না করা হয়। এর পরই কোর্ট রাজনৈতিক ও পারিপার্শিক প্রভাবমুক্ত থেকে রায় দিতে পারে। একটি ভুল সাজা বা অতিরিক্ত সাজা আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে না।
কোনো অবস্থায় আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া উচিত না এবং এ ধরনের কাজকে বরদাশত করা যাবে না। তাই সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত মবের ঘটনাবলিকে কারো পক্ষে যথাযথ বলা সম্ভব নয়। দেখা যাচ্ছে, আমরা একটি শিশুর হত্যায় যে পরিমাণ ক্ষুব্ধ, সেই আমরাই শুধু চুরি বা অন্য কোনো অপরাধের সন্দেহে কোনো মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনাকে হালকাভাবে বা কম গুরুত্ব দিয়ে দেখি। অন্যায়ের প্রতিবাদ সবার জন্য একই হতে হবে, আবার অভিযোগ মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয় কিংবা মনে রাখতে হবে রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধ নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না। সবার উপরে, একমাত্র কোর্টই নিশ্চিত করতে পারে কোনো অপরাধীর শাস্তি।
ফিরে আসি অপ্রতিমের মৃত্যু ঘটনায়। অপ্রতিম আর আমার ছেলে দৃপ্ত একই বয়সী। তারা দুই জনই ১৩ বছর বয়সী শিশু এবং ক্লাস সেভেনের শিক্ষার্থী। অপ্রতিম কুমিল্লায় বর্ডার গার্ড স্কুলে পড়ে আর আমার ছেলে ঢাকায় বর্ডার গার্ড স্কুলে পড়ে। কি অদ্ভুত মিল। এখন সবচেয়ে বড় অমিল হচ্ছে অপ্রতিম বেচে নেই, আমার ছেলে বেচে আছে। জাতি সংঘের শিশু অধিকার সংস্থার বিবেচনায় ১৮ বছরের নিচের সব বয়সীরা শিশু হিসেবে পরিগণিত হবে। আমার বাসা রাজধানীর হাজারীবাগ থানার রায়েরবাজারে অবস্থিত। রায়েরবাজার এলাকা অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। সেখানে কিশোর গ্যাং রয়েছে, ছিনতাইয়ের প্রকোপ রয়েছে এবং মাদক কেনাবেচা হয় প্রকাশ্যে। এ রকম একটি এলাকায় গত ১০ বছর ধরে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করে বাস করে যাচ্ছি। এ এলাকায় বাস করার একটিই কারণ হচ্ছে, এ এলাকার বাসা ভাড়া আশপাশের অন্য এলাকার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। আমাদের সন্তান দৃপ্তকে স্কুলে আমরা বাবা-মা’ই আনা-নেয়া করি। বাসার নিচে ও যাদের সঙ্গে খেলে তাদের সবাইকে আমরা ভালো করে চিনি। খেলার সাথীরা প্রায় সবাই একই বয়সী। কখনোই দৃপ্তকে একা দোকানে কেনাকাটার জন্য পাঠাই না। বন্ধুরা অনেক সময় মোবাইলে এক সঙ্গে গেম খেলে। মোবাইলে আমার ছেলেও গেম খেলে। তবে তা বাসায় এবং একা একা খেলে। বাইরে মোবাইল ফোন নেয়া নিষেধ।
অপ্রতিমকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তার সম্বন্ধে পত্রপত্রিকা থেকেই জেনেছি। অপ্রতিম এলাকায় যাদের সঙ্গে মিশত, তারা অনেকেই তার চেয়ে বয়সে তিন থেকে পাচ বছর পর্যন্ত বড় ছিল। তাদের সঙ্গে সে মোবাইল নিয়ে ঘোরাঘুরি করত। এমনকি ১৩ বছরের অপ্রতিম মোটর সাইকেল চালাত। বন্ধুদের সঙ্গে টিকটক ভিডিও বানাত। অপ্রতিমের বাবা-মা এলাকার কিছু তরুণ মাদকসেবীকে পুলিশেও দিয়েছে। এ কারণে অনেকে মনে করেন, অপ্রতিমের বাইরে যাওয়া ও বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা নিয়ে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। এই অসতর্কতার কোনোটাই তার খুনের যৌক্তিকতা নিরুপণ করে না। পাশাপাশি আমরা অনেকেই নিজেদের পূর্বধারণা নিয়ে মৃত অপ্রতিমের জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করেছি নিজেদের নৈতিকভাবে উচ্চতর অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, যা খুবই নির্মম ও একেবারেই অনুচিত। অনেকে সব দায় চাপিয়ে দিচ্ছি মৃত কিশোরটির বাবা-মায়ের ওপর। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম। শিক্ষিত হওয়ার পরও তারা নাকি নিজেদের সন্তানকে বিপদের মুখে পড়া থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখানেই বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এটিকে জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে দেখার বদলে আমরা প্রায়শই ব্যক্তির ওপর দোষ চাপাতে ব্যস্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা প্রতিটি সহিংস ঘটনাকে নানান যুক্তি দিয়ে সেই ঘটনা ন্যায্য বলে দাড় করাই।
অপ্রতিমকে কে হত্যা করেছে? এই প্রশ্নের চেয়েও নাগরিক সমাজের একটি বড় প্রশ্ন আমাদের শিশুরা কেমন একটি সমাজে বেড়ে উঠছে? এখনকার শিশুরা এন্ড্রয়েড ফোন ও সোশাল মিডিয়ার সর্বব্যাপী প্রভাবের মধ্যে বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা ক্রমবর্ধমান সহিংসতার ঘটনা নিয়মিত শুনছে এবং দেখছে। তারা বিভিন্ন সংঘাতকে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখে এবং প্রকাশ্য অপমান-অপদস্তকে ফান বা বিনোদন হিসেবে দেখে। দেশব্যাপী পথশিশুদের মধ্যে মাদকের ব্যবহার ও কিশোর গ্যাং বিস্তার লাভ করেছে। দেশে এবং আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে যখন সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন শিশু-কিশোররাও সেটা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে এবং অনুকরণ করে। একটি সমাজ তার সার্বিক আচরণের মাধ্যমেও মানুষকে শিক্ষা দেয়, ঠিক যেমন একটি স্কুল তার পাঠের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়।
এ কারণে শুধু সরকারি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। বাবা-মা, শিক্ষক, ইমাম-পুরোহিত, সমাজ কর্মী, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্র ও সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে, যার মধ্যে শিশুরা বেড়ে ওঠে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় নৈতিকতার দিক থেকে শিক্ষা দেয়ার সুযোগ রাখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও নৈতিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করার শিক্ষা দেয়। পলিশিয়ানদের উচিত সব ধরনের অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করা। গণমাধ্যমের উচিত অপরাধমূলক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হওয়া। ফলে কোনো ছেলে-মেয়েই মানসিকভাবেও সহিংস হয়ে উঠবে না। অপ্রতিম তার বন্ধুদের বিশ্বাস করেছিল। সিসিটিভিতে তার হত্যাকারীর সঙ্গে এক সঙ্গে হাটতে দেখা গিয়েছিল।
অপ্রতিমের মা কাদতে কাদতে একটি কথাই বারবার বলছিল, তার সন্তান কি অপরাধ করেছিল? সে কোনো অপরাধ করেনি। আমরা চাই, আরেকজন মাকে যেন একই প্রশ্ন করতে না হয়। আর সরকারের থেকে আরেকটি প্রতিশ্রুতিরও প্রয়োজন নেই যে, এই অপরাধের শাস্তি হবে। প্রয়োজন এমন একটি চেষ্টা ও ব্যবস্থার, যা অপ্রতিমের মতো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেবে। আমরা প্রতিনিয়ত এ ধরনের একেকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে একেকবার বিক্ষুব্ধ হই। আমরা চাই, এই অভ্যাস ত্যাগ করতে। আজ অপ্রতিম। তার আগে এ রকম আরো অনেক শিশু ছিল, যাদের নাম কিছুদিন পত্র-পত্রিকা ও সোশাল মিডিয়া গরম করে রেখেছিল। প্রতিটি ঘটনার পর সবাই বলেছিল, এ কেমন নির্মমতা? এরপর আমরা অন্য প্রসঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, মনোযোগ অন্য দিকে সরে গেছে। কিন্তু যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতায় সহিংস ঘটনাগুলো ঘটেছিল, সেগুলো আগের মতোই অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
অপ্রতিমের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। এই বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী হওয়া উচিত শিক্ষা, বন্ধুত্ব, পরিবার, বিনোদন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নে ভরা। যে শিশুটির উপস্থিতি একটি পরিবারের প্রতিদিনের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছিল, সে আর কখনো বাড়ি ফিরবে না। গ্রেফতার, তদন্ত কিংবা শাস্তি- কোনো কিছুই এই ক্ষতিকে পূরণ করতে পারে না।
সজীব ওনাসিস : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক যায়যায়দিন