৩২০টি প্রাইমারি পিসিআই: হৃদ্‌স্পন্দনের আড়ালে ৩২০টি জীবনজয়ের গল্প

এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম

মতামত

প্রতিটি হৃদ্‌স্পন্দনের পেছনে আছে একটি জীবনের গল্প। প্রতিটি গল্পের আড়ালে আছে বেচে থাকার সংগ্রাম, প্রিয়জনের ভালোবাসা এবং নতুন করে স্বপ্ন

2026-10-08T17:14:54+06:00
2026-10-08T17:38:17+06:00
রোববার ● ১১ অক্টোবর ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
৩২০টি প্রাইমারি পিসিআই: হৃদ্‌স্পন্দনের আড়ালে ৩২০টি জীবনজয়ের গল্প
এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১৪ পিএম  আপডেট: ০৮.১০.২০২৬ ৫:৩৮ পিএম 
ছবি: সংগৃহীত
প্রতিটি হৃদ্‌স্পন্দনের পেছনে আছে একটি জীবনের গল্প। প্রতিটি গল্পের আড়ালে আছে বেচে থাকার সংগ্রাম, প্রিয়জনের ভালোবাসা এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার আকাঙ্ক্ষা।

আলহামদুলিল্লাহ।

কারও কাছে ৩২০ হয়তো নিছক একটি সংখ্যা। কিন্তু আমার কাছে এই সংখ্যার প্রতিটি অঙ্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের মুখ, স্বজনদের উৎকণ্ঠা, হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর এবং ক্যাথল্যাবের দরজার বাইরে দাড়িয়ে থাকা পরিবারের নীরব প্রার্থনা।

মনে পড়ে সেই অসহায় চোখগুলোর কথা, যারা প্রিয় মানুষটিকে হারানোর আশঙ্কায় বারবার আমাদের দিকে তাকিয়েছেন। মনে পড়ে সেই মুহূর্তগুলোর কথা, যখন একটি পরিবারের সমস্ত আশা যেন নির্ভর করছিল দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনারি ধমনিতে আবার রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার ওপর।

পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সেন্টারে ৩২০টি সফল প্রাইমারি পারকিউটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন বা প্রাইমারি পিসিআই সম্পন্ন হওয়ার মাইলফলক তাই আমার কাছে কেবল চিকিৎসাগত অর্জন নয়; এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টা, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ, অভিজ্ঞতা এবং মানবিকতার এক অনন্য অধ্যায়।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫। এই দিনটিতে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউ ও ক্যাথল্যাবের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি সুস্পষ্ট স্বপ্ন ও অঙ্গীকার নিয়ে: তীব্র হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীদের জন্য দ্রুত, আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

আমরা জানতাম, এই পথ সহজ হবে না। কারণ হার্ট অ্যাটাক সময় মেনে আসে না। গভীর রাত, ভোর, ছুটির দিন, ঈদ কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানের মাঝেও যেকোনো মুহূর্তে বেজে উঠতে পারে জরুরি ফোন।

আমরা এটাও জানতাম, শুধু একটি আধুনিক ক্যাথল্যাব থাকলেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনোলজিস্ট, কার্যকর সিসিইউ, জরুরি বিভাগের প্রস্তুতি, নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয় এবং সর্বোপরি এমন একটি নিবেদিতপ্রাণ দল, যাঁরা দিনরাত যেকোনো মুহূর্তে রোগীর পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।

সেই অঙ্গীকারই ধীরে ধীরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

রাত তিনটার ফোন, অসমাপ্ত রাতের খাবার আর অপেক্ষায় থাকা একটি পরিবার

রাত দুইটা কিংবা তিনটা। হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। জরুরি বিভাগ থেকে জানানো হয়, একজন রোগী তীব্র হার্ট অ্যাটাক নিয়ে এসেছেন। দ্রুত প্রাইমারি পিসিআই প্রয়োজন।

কখনো ভোর চারটায় অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায়। কখনো ইফতারের ঠিক আগে হাসপাতালের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে হয়। কখনো তারাবিহর নামাজের সময়, কখনো সেহরির মুহূর্তে, আবার কখনো ঈদের নামাজের প্রস্তুতি ছেড়ে ছুটতে হয় ক্যাথল্যাবে।

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে ফজরের আজানের আগেই পুরো ক্যাথল্যাব টিমকে প্রস্তুত হতে হয়েছে।

কখনো পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার অসমাপ্ত থেকে গেছে। কখনো কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি। কখনো সন্তান অভিমানভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করেছে, ‘আবার হাসপাতালে যাচ্ছ?’

এই ছোট্ট প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা, অভিমান এবং আরও কিছুক্ষণ কাছে পাওয়ার আকুতি।

সন্তানের সেই মুখ মনে নিয়েই ঘর থেকে বের হতে হয়। কারণ হাসপাতালের অন্য প্রান্তে তখন আরেকটি পরিবার অপেক্ষা করছে। তাদের বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী কিংবা সন্তানের জীবন সংকটাপন্ন। তারা বিশ্বাস করে, আমরা সময়মতো পৌঁছাতে পারলে হয়তো প্রিয় মানুষটিকে আবার সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাবে।

চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্বের গভীরতা তখন নতুন করে উপলব্ধি করি।

নিজের পরিবারের অপেক্ষা আর রোগীর পরিবারের উৎকণ্ঠার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিদিন বেছে নিতে হয় পেশাগত দায়িত্বকে।

এই ত্যাগের কোনো প্রচার নেই, কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও সব সময় থাকে না। কিন্তু একজন রোগীর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ সেই দীর্ঘ রাতের ক্লান্তিকে অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়।

‘সময়ই হৃদ্‌পেশি’: হার্ট অ্যাটাকে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় একটি বহুল প্রচলিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ‘সময়ই হৃদ্‌পেশি’। অর্থাৎ সময় যত নষ্ট হবে, হৃদ্‌পেশির তত বেশি অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

বিশেষ করে এসটি-এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা এসটিইএমআইয়ের ক্ষেত্রে করোনারি ধমনি হঠাৎ বন্ধ হয়ে হৃদ্‌পেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়। এই অবস্থায় দ্রুত রক্তপ্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রাইমারি পিসিআইয়ের মাধ্যমে ক্যাথেটার, গাইডওয়্যার, বেলুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্টেন্ট ব্যবহার করে বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনারি ধমনিতে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।

তবে এই চিকিৎসার সফলতা শুধু একজন ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্টের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। জরুরি বিভাগে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, সময়মতো ইসিজি, প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ক্যাথল্যাব প্রস্তুত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যাথল্যাবের ভেতরে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন স্থিরতা, অভিজ্ঞতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।

রোগীর রক্তচাপ, হৃদ্‌স্পন্দন, কার্ডিয়াক রিদম, হেমোডাইনামিক অবস্থা এবং করোনারি এনজিওগ্রামের ফলাফল একসঙ্গে বিবেচনা করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

কখনো রোগী কার্ডিওজেনিক শকে থাকেন। কখনো কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর পুনরুজ্জীবিত অবস্থায় আসেন। কখনো একাধিক করোনারি ধমনিতে জটিল রোগ থাকে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যখন বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনারি ধমনি খুলে যায় এবং পুনরায় রক্তপ্রবাহ শুরু হয়, তখন মনিটরের সেই দৃশ্য আমাদের কাছে শুধু একটি সফল চিকিৎসাপদ্ধতির চিত্র নয়।

সেই রক্তপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি শিশুর বাবাকে ফিরে পাওয়ার আশা, একজন স্ত্রীর স্বামীকে নিয়ে ঘরে ফেরার স্বপ্ন কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবার সন্তানের মুখ আবার দেখার আকাঙ্ক্ষা।

তবে এটাও মনে রাখতে হয়, সফলভাবে ধমনি খুলে দেওয়া মানেই রোগীর সম্পূর্ণ সুস্থতা নিশ্চিত হওয়া নয়। পরবর্তী সিসিইউ পর্যবেক্ষণ, জটিলতা মোকাবিলা, যথাযথ ওষুধ, কার্ডিয়াক পুনর্বাসন, ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দায়িত্ব তাই ক্যাথল্যাবের দরজায় শেষ হয় না; বরং সেখান থেকেই রোগীর সুস্থ জীবনে ফিরে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।

৩২০টি প্রাইমারি পিসিআই আমাদের কী শিখিয়েছে

এই এক বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি জীবন সম্পর্কেও অনেক কিছু শিখিয়েছে।

শিখিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা ও বিচক্ষণতা।

শিখিয়েছে, একজন চিকিৎসক যত অভিজ্ঞই হোন না কেন, একটি সুসংগঠিত টিম ছাড়া জটিল হৃদ্‌রোগের জরুরি চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির পরও মানুষের জীবন ও মৃত্যুর বাস্তবতা আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়।

সব রোগী একই অবস্থায় হাসপাতালে আসেন না। কারও হার্ট অ্যাটাকের পর অনেক সময় পেরিয়ে যায়। কারও ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ কিংবা অন্যান্য জটিলতা থাকে। কারও হৃদ্‌পেশির উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।

আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সব রোগীর পরিণতি এক রকম হয় না।

সফল চিকিৎসা আমাদের আনন্দিত করে। আর জটিল ও প্রতিকূল অভিজ্ঞতা আমাদের আরও সতর্ক, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও দক্ষ হওয়ার শিক্ষা দেয়।

প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা থেকে শেখার আছে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। প্রতিটি বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিটি জটিলতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়েই একটি কার্ডিয়াক সেন্টার আরও উন্নত হয়ে ওঠে।

এই অর্জন একজনের নয়, পুরো কার্ডিয়াক টিমের

৩২০টি সফল প্রাইমারি পিসিআইয়ের এই মাইলফলক কোনো একক চিকিৎসকের অর্জন নয়।

এটি আমাদের চিকিৎসক, নার্স, ক্যাথল্যাব টেকনোলজিস্ট, সিসিইউ টিম, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগ, জরুরি বিভাগের সহকর্মী, কার্ডিয়াক কাস্টমার কেয়ার টিম, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগ, হাসপাতাল প্রশাসন এবং সব পর্যায়ের সহায়ক কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

গভীর রাতে যে নার্স রোগীর রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করেন, যে টেকনোলজিস্ট জরুরি মুহূর্তে ক্যাথল্যাব প্রস্তুত রাখেন, যে সহকর্মী একটি ফোন পেয়েই হাসপাতালে ছুটে আসেন কিংবা যে কর্মী উদ্বিগ্ন স্বজনদের শান্তভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য জানান, প্রত্যেকের অবদান এই অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আমাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি।

আমাদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অসমাপ্ত পারিবারিক আয়োজন, উৎসবের দিনে অনুপস্থিতি এবং গভীর রাতের জরুরি দায়িত্ব তাঁরা ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে মেনে নিয়েছেন।

তাদের এই নীরব সহযোগিতা ছাড়া এমন একটি নিরবচ্ছিন্ন জরুরি হৃদ্‌রোগ চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন হতো।

আমাদের হাসপাতালের নেতৃত্ব ও প্রশাসনের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, যাঁদের সহযোগিতা ও সমর্থন এই সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আল্লাহর রহমত, মানুষের আস্থা ও চিকিৎসকের দায়িত্ব

এই দীর্ঘ পথচলায় মহান আল্লাহর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অপরিসীম।

আলহামদুলিল্লাহ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের রোগীর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করার সুযোগ দেয়। কিন্তু চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

আমার বিশ্বাস, চিকিৎসকের জ্ঞান ও দক্ষতা একটি পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা, মানবিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে পালন করতে হয়।

আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করি। আর সুস্থতা মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত।

সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ আমাদের রোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি। জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত ও সংকটময় মুহূর্তে তারা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন।

এই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ শুধু সফলভাবে একটি চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পন্ন করা নয়; বরং রোগীর প্রতি আন্তরিক থাকা, চিকিৎসার প্রতিটি সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীল হওয়া এবং রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে সততা ও সহমর্মিতার সম্পর্ক বজায় রাখা।

যখন কোনো রোগী সুস্থ হয়ে ফলোআপে এসে বলেন, ‘স্যার, আমি এখন ভালো আছি’, তখন গভীর রাতের ক্লান্তি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পারিবারিক জীবনের অনেক ত্যাগ নতুন অর্থ খুজে পায়।

একজন রোগীর মুখের হাসি, একটি পরিবারের স্বস্তি এবং সুস্থ জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশাই আমাদের কাজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় পৌঁছে দিতে হবে সময়মতো হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা

পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক বছরের এই অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানের অর্জন নিয়ে ভাবায় না; ভাবায় বাংলাদেশের লাখো হৃদ্‌রোগীর ভবিষ্যৎ নিয়েও।

দেশে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সময়মতো জরুরি করোনারি ইন্টারভেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে।

রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরে আধুনিক কার্ডিয়াক চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও দূরবর্তী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক রোগী দ্রুত বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অনেক রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়। কোথাও দ্রুত ইসিজি হয় না, কোথাও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ নেই, কোথাও অ্যাম্বুলেন্স ও রেফারেল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, এসটিইএমআই রোগীর ক্ষেত্রে উপযুক্ত সময়সীমার মধ্যে অভিজ্ঞ টিমের মাধ্যমে প্রাইমারি পিসিআই করা সম্ভব হলে এটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রক্তপ্রবাহ পুনঃস্থাপন চিকিৎসা।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাইমারি পিসিআই সম্ভব না হলে এবং রোগী উপযুক্ত হলে দ্রুত রক্ত জমাট গলানোর চিকিৎসা শুরু করে পরবর্তী সময়ে পিসিআই-সক্ষম হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অর্থাৎ প্রতিটি রোগীর জন্য সময়োপযোগী রক্তপ্রবাহ পুনঃস্থাপন চিকিৎসার একটি সুসংগঠিত পথ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোম বা এসিএস নেটওয়ার্ক।

এই নেটওয়ার্কের আওতায় পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে ২৪ ঘণ্টা প্রাইমারি পিসিআই সেবা চালু করতে হবে। জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জরুরি বিভাগ, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং বিশেষায়িত কার্ডিয়াক সেন্টারের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রয়োজন দ্রুত ইসিজি, প্রশিক্ষিত জরুরি চিকিৎসাকর্মী, টেলি-ইসিজি সুবিধা, পূর্বনির্ধারিত রেফারেল প্রটোকল এবং রোগী আসার আগেই ক্যাথল্যাব টিমকে প্রস্তুত করার ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সক্ষমতাকে একটি জাতীয় কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিটি কেন্দ্রের চিকিৎসার সময়, জটিলতা, ফলাফল ও মৃত্যুহার নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করতে হবে।

আমার স্বপ্ন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক কিংবা সাধারণ মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে যেন চিকিৎসা কোথায় পাবেন, কীভাবে যাবেন কিংবা খরচ কীভাবে বহন করবেন, এই অনিশ্চয়তায় মূল্যবান সময় হারিয়ে না ফেলেন।

দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সময়মতো হৃদ্‌রোগের জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব।

এক বছরের অর্জন, আগামীর নতুন অঙ্গীকার

আজ এই মাইলফলকে দাড়িয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের, যারা আমাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান, ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের শৃঙ্খলা এবং রোগীর প্রতি দায়িত্বশীল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।

তাদের শিক্ষা ও আদর্শ আজও প্রতিটি জটিল সিদ্ধান্তে আমাকে পথ দেখায়।

আমাদের সামনে এখনো অনেক পথ বাকি।

প্রয়োজন আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত ক্লিনিক্যাল অডিট, চিকিৎসার সময় কমিয়ে আনা, জটিল রোগীদের ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং টিমভিত্তিক চিকিৎসাসেবাকে আরও শক্তিশালী করা।

আমরা চাই, আমাদের প্রতিটি অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের রোগীদের আরও উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার ভিত্তি হয়ে উঠুক।

মহান আল্লাহ যতদিন আমাকে সুস্থতা, শক্তি ও সামর্থ্য দান করবেন, ততদিন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত মানুষের পাশে থেকে নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করে যাব, ইনশাআল্লাহ।

আবার হয়তো গভীর রাতে ফোন বেজে উঠবে।

আবার হয়তো পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার অসমাপ্ত রেখে হাসপাতালে ছুটতে হবে।

আবার হয়তো ক্যাথল্যাবের বাইরে একটি পরিবার উদ্বিগ্ন চোখে অপেক্ষা করবে।

আর আমরা, আমাদের পুরো কার্ডিয়াক টিম, সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে চেষ্টা করব সেই পরিবারের প্রিয় মানুষটির জন্য।

কারণ প্রতিটি হৃদ্‌স্পন্দন মূল্যবান।

প্রতিটি রোগীর হাসপাতালের বাইরেও একটি জীবন আছে, আছে পরিবার, ভালোবাসা, দায়িত্ব এবং অপূর্ণ স্বপ্ন।

আর আমাদের কাছে চিকিৎসার জন্য আসা প্রতিটি মানুষই সর্বোচ্চ মনোযোগ, দক্ষতা, সম্মান ও সহমর্মিতা পাওয়ার অধিকারী।

৩২০টি প্রাইমারি পিসিআই তাই কেবল ৩২০টি চিকিৎসাপদ্ধতির হিসাব নয়।

এটি ৩২০টি মানুষের জীবনরক্ষার প্রচেষ্টা, অসংখ্য স্বজনের অপেক্ষা, একটি নিবেদিতপ্রাণ দলের নিরলস পরিশ্রম এবং মানুষের পাশে থাকার এক বছরের অঙ্গীকারের স্মারক।

বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ এবং পপুলার ক্যাথল্যাবের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে আমাদের হাতে আরও দক্ষতা আসুক, চিকিৎসায় আরও মানবিকতা যুক্ত হোক এবং বাংলাদেশের আরও বেশি মানুষ সময়মতো জীবনরক্ষাকারী হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার সুযোগ পাক।

এইচইএএল (HEAL): জ্ঞান, দক্ষতা ও যত্নে সুস্থতার পথে।

হার্ট (HEART): ভালোবাসা, মানবিকতা ও মর্যাদায় হৃদয়ের পাশে।

হোপ (HOPE): প্রতিটি রোগী, প্রতিটি পরিবার এবং সুস্থ বাংলাদেশের প্রত্যাশায়।

আলহামদুলিল্লাহ।

৩২০টি প্রাইমারি পিসিআই: এক বছরের সেবা, সংগ্রাম, শিক্ষা, কৃতজ্ঞতা এবং নতুন আশার গল্প।

লেখক:
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ), এমডি (কার্ডিওলজি)
ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট
বিভাগীয় প্রধান ও চিফ কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজি বিভাগ
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৯

বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ ও পপুলার ক্যাথল্যাবের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ
  বিষয়:   মতামত  পিসিআই  হৃদ্‌স্পন্দন 


মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত