শাহীন রাজা লালন, আমাদের খুব প্রিয় একটা চরিত্র। সে হচ্ছে হারফুনমৌলা! সব সে জানে, সব করতে সে পারে। এটাই তার বদ্ধমূল ধারণা। কেউ তাকে এখান থেকে নড়াতে পারেনি। ছোটখাটো যে কোনো সমস্যা। লালন সহজেই তার সমাধান বলে দেবে। তাই ছোটখাটো উটকো ঝামলায় পড়লেই প্রথমেই লালনের কথা মাথায় আসে। বিলম্ব না করেই তাকে তলব করা হয়। সেই কিশোর বয়স থেকে সে আমাদের সঙ্গে ছায়ার মতো আছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুদের কাছে বিব্রত হতে হতো, ওকে নিয়ে। এক সময় দেখি বন্ধুদের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠেছে। বনভোজন থেকে রাতের আড্ডা, সবকিছুর জোগানদার লালন।
আমাদের লালন, দার্শনিকও বটে! হঠাৎ, হঠাৎ এমন সব কিছু বলে, আমাদের অবাক করে দেয়! লালন, এক জন গণতান্ত্রিকও! সব সময়, সব সরকারের বিরোধী পক্ষ সে। আমাদের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের থেকে ঠিক উল্টো চরিত্র। লালন, আজ পর্যন্ত কখনোই সরকার দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেয়নি এবং ভোট দিতে পারুক আর নাই পারুক ইলেকশনের দিন কেন্দ্রে ভোট দিতে যাবেই, যাবে!
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই পক্ষাঘাতগ্রস্ত। চলত শক্তিহীন। ঘরে চোর ঢুকলে এরা চোরকে বাধা দেয়ার সাহস রাখে না। কিন্তু পর দিন সকালে চুরির ঘটনা রসিয়ে, রসিয়ে বলেন।
তারা, সরকার থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেবে। কিন্তু সরকারের কোনো কাজের দায়িত্ব নেবে না। এমনকি ইলেকশনের দিন লাইনে দাড়িয়ে ভোট দিতেও যায় না।
আমার জন্মভূমি, পুরান ঢাকা থেকেই তার সঙ্গে সখ্যতা আমার। বন্ধুও বলা যেতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব একটা বেশি এগুতে পারেনি। বাপ ছিল, রাজমিস্ত্রি। পুরান ঢাকায় আবার রাজমিস্ত্রিকে ওস্তাগর বলে ডাকে। লালন কিন্তু তার বাপের পেশা বেছে নেয়নি। রাজমিস্ত্রির কাজ না করলেও নির্মাণ সামগ্রীর ছোটখাটো একটা দোকানের মালিক সে। দোকানটি আজ থেকে ৩০ বছর আগে যেমনটা ছিল, আজো তেমনই। দোকান আর কি, সারা দিন রাজনৈতিক আড্ডা চলে। একটু পরপর স্টিলের মগে চা আসে। আড্ডার সবাই ভাগযোগ করে খেয়ে নেয়। চা, পুড়ি-পেয়াজুর দাম লালনের টেক বাক্স থেকে মিটানো হয়। এক সময় আমিও এই আড্ডায় শামিল হতাম। নিবাস এখন আমার ঢাকা উত্তর সীমান্ত বরাবর। কর্ম এবং নিবাসের দূরত্বের কারণে পুরান ঢাকায় তেমন একটা যাওয়া হয় না। লালনের সঙ্গে ফোনেই আলাপ, আলোচনা চলে।
ফোন করে প্রথমেই বলবে, জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোয়া! আর ভালো কিছু খাওয়ার উপায় নেই। এ তো দাম বাড়লে মানুষ কি করে খাবে। আলুর দাম ৪০ আর পেয়াজ ৬০ টাকা। সয়াবিনের কথা তো আর কইলাম না। পরদিন বলবে দুর মিয়া হালায় কি দেশে আছি! কারেন্টের বিল দিতে দিতে তো ফতুর হইয়া গেলাম। এই মাসে চাইলের দাম জানোনি। তুমি জানবা কি কইরা। বাজার সদায় তো তুমি আর করো না। জানবা কেমতে। বড় মাইয়া বেড়াইতে আইছে। নাতি কয় গরুর গোশতের সালুন দিয়া ভাত খাইব। কি আর করা। বাজারে যাইয়া দাম শুইনা আতকা লাইগা গেল। শখ হালারে বিদায় দিছি অনেক আগেই। এহন নাতি কইছে!
প্রতিবারের মতো, সরকার এবং সরকারের মন্ত্রীদের একচোট নেবে। রিজার্ভ, শেয়ার বাজার, আমেরিকা, ইনডিয়া এবং চায়না। সব তার ধারাবাহিক বচন।
আমার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক বন্ধু, প্রফেসর সাহেব। নামটা ধরে নেন, নুরুল আমীন। দেখা হলেই ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বলবে, সাংঘাতিক সাহেব না কি? তোমরা বৈজ্ঞানিকরা দেশটা শেষ কইরা (আমার রাজনৈতিক দল), এখন আছো ভুয়া নিউজ মানুষকে কেমনে খাওয়াবে। মাস্টোর তোমার বাক্য সংযত এবং মার্জিত হতে হবে।
মেজাজটা দিকছি আগের মতোই আছে, তোমার। তোমাদের চোখে ভালো কিছু পড়ে না? এখন পৃথবীর সবাই বাংলাদেশেরে চিনছে। এই দেশে এ তো কিছু আগে কখনো হয়েছে। সত্যি করে বলো। দেখছো কি না বলো। খালি ভোট, ভোট কর। ভোটের আগে ভাত। এইটা মাথায় রাখতে হবে।
আমি বলি, হ, ঠিকই বলছো। তোমরা তো সত্তরের ইলেকশনেও বলছিলা, ভোটের আগে ভাত চাই! তারপর যুদ্ধ দেইখা ঘরে ঢুকছো। আজকে যে কথাগুলো বললে, এরশাদের সময়েও তুমি এগুলোই বলেছিলা। তুমি হইলা, খালেকের উচিত শিষ্য তুমি!
এদেশের এক জন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। যার সঙ্গে কিছুদিন আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। দেশের পরিবেশ উন্নয়নে ইওরোপের উন্নত জীবন বাদ দিয়ে চলে এসেছেন। তার ধ্যান এবং জ্ঞান হচ্ছে, বাংলাদেশের পরিবেশ উন্নয়ন। তার সঙ্গে কাজ করার সময় আমাদের বসার ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। বিষয়টি তার কাছে বলাতে জবাবে বলেছিলেন, বিখ্যাত হতে হলে চেয়ারের মায়া ত্যাগ করতে হবে। আরে মিয়া যারা নোবেল পাইছে তারা চেয়ার নিয়ে মাথা ঘামায় না।
পরিশীলিত ভাষায় শুধু বলেছিলাম, নোবেল পাওয়ার জন্য এখানে কাজ করতে আসি নাই। ইউনিভার্সিটির পড়ালেখা শেষ, পেটের ধান্ধায় এখানে কাজ করছি। আমার ধান্ধা কাজ করে মাস শেষে বেতন। আর আপনার চিন্তা নোবেল। দুজনের দুই পথ। আর আমার মেধায় আমি জানি, গন্তব্য কোথায়। কিন্তু আপনারটা আপনি জানেন না।
এর পর দিন আমি প্রতিষ্ঠানের, লাভ লেটার পেয়ে যাই। মুক্তি পেয়ে আমিও খুশি। পরবর্তী সময়ে ওই পরিবেশবিদ, সব সময় সকল সরকারের পদলেহন করেছে। এবং এখনো করছে। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, অর্থ- বৈভব সব পেয়েছে। কিন্তু নোবেল বা তার কাছাকাছি আন্তর্জাতিক মানের কোন পুরস্কার লাভ করতে সক্ষম হননি। তবে ইওরোপ থেকে যে উদ্দেশ্যে আসা তা তার পূর্ণ হয়েছে।
এই ধরনের আরেকটি ঘটনা বলছি। ভদ্রলোক বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের এক জন সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা। অবসর নেয়ার পর দেশের মানুষের জন্য কিছু করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। এ কাজে তিনি আন্তর্জাতিক এক ব্যাঙ্কের সহযোগিতা নেন। এক দিন তিনি তার অধস্তন কর্মকর্তাদের বলছেন, তোমরা যে গ্রামে যাও সঙ্গে একটা মশারি নিয়ে যেও। কারণটা জানতে চাইলে বলেন, এখনো গ্রামের লোকরা অনেক অতিথি পরায়ণ। তোমরা থাকতে চাইলে না করবে না। লোকটার আসল উদ্দেশ্য ছিল, জুনিয়র কর্মকর্তাদের রাহা খরচ কাটছাট করা।
এবারো আমি মুখ বন্ধ রাখতে পারিনি। তাকে মার্জিতভাবে বলি, গুলশানে তো আপনার বাড়ি খালি পড়ে থাকে। সেখানে চাকর-বাকরও আছে। তারপরও আপনি সোনারগাঁও হোটেলে বিজনেস স্যুট নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া ঢাকা শহরে আপনার অবস্থাপন্ন ভাই-বোন আছেন, সেখানেও তো থাকেন না। আপনি জানেন কি না আমরা প্রত্যেকে যার যার পরিবার থেকে এসেছি এবং প্রত্যেকে ইউনিভার্সিটির শিক্ষা শেষ করে এখানে এসেছি। আমরা গ্রামের লোকের কাছে মুসাফির বা তবলিগের লোকদের মতো রাত্রি যাপনের জন্য অনুরোধ জানাতে হবে!
এবারো আমার একই অবস্থা। তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সুবিধার সব টুকুন নিতেন। পরবর্তী সময়ে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন অর্থের মাপকাঠিতে। বিদ্যা, শিক্ষা, জ্ঞান কোনোটাই তিনি প্রাধান্য দেননি।
এই হলো আমাদের মধ্যবিত্ত লোকদের জীবনচরিত। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই পক্ষাঘাতগ্রস্ত। চলত শক্তিহীন। ঘরে চোর ঢুকলে এরা চোরকে বাধা দেয়ার সাহস রাখে না। কিন্তু পর দিন সকালে চুরির ঘটনা রসিয়ে, রসিয়ে বলেন। এরা, সরকারের থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেবে। কিন্তু সরকারের কোনো কাজের দায়িত্ব নেবে না। এমনকি ইলেকশনের দিন লাইনে দাড়িয়ে ভোট দিতেও যায় না। ভোটের দিন আরাম কেদারায় গা এলিয়ে টিভির সামনে বসে ইলেকশন পর্যবেক্ষণ করবে! আর তার প্রজাতিদের কাছে ফোন করে ইলেকশন বিজ্ঞ কথোপকথন চালাবে। সরকারি দল পরাজিত হলে তাদের প্রথম মন্তব্যটি হবে, এ তো অনিয়ম! এ তো অন্যায়। এগুলো করে কি পার পাওয়া যায়!
শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক