মো. মামুন হাসান
ছবি: যাযাদিহাসপাতালের বারান্দায় বসে এক স্বামী বলছিলেন, আর দশ মিনিট সময় পেলে তার স্ত্রীও হয়তো নিচে নেমে আসতে পারতেন। কথাটি কক্সবাজারের ইনানীর সেই ভোরের, যেদিন আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন পর্যটক। তাদের মধ্যে ছিলেন একজন নারী ও পাচ বছরের একটি শিশু। সংবাদে মৃত্যুর সংখ্যা ১০, কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন, প্রিয়জনের অপেক্ষা আর একটি জীবনের অনিবার্য সমাপ্তি।
পর্যটনের শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে এই ঘটনা আমাকে শুধু শোকাহত করে না, গভীরভাবে বিচলিতও করে। কারণ পর্যটনের সাফল্য আমরা সাধারণত পর্যটকের সংখ্যা, হোটেলের কক্ষ, বিনিয়োগ কিংবা আয়ের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করি। অথচ একজন পর্যটক নিরাপদে রাত কাটাতে পারবেন কি না, বিপদের মুহূর্তে বেরিয়ে আসার পথ পাবেন কি না, সেই মৌলিক প্রশ্নটিই আমাদের উন্নয়ন আলোচনায় প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। ইনানীর আগুন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানোর আয়োজন থাকলেই আতিথেয়তা পূর্ণতা পায় না। তার জীবন রক্ষার প্রস্তুতিও থাকতে হয়।
গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেকে তুপতুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠ ও বাশের তৈরি ভবনে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ভবনের ওপরের অংশ ধসে পড়ে এবং ভেতরে থাকা অতিথিরা বিপদের মুখে পড়েন। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাতের আশঙ্কা করা হলেও প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে। তবে আগুনের উৎস নিয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই একটি প্রশ্নের উত্তর খোজা জরুরি। একটি আবাসনে আগুন লাগার পর এতগুলো প্রাণ রক্ষার ব্যবস্থা কেন কার্যকর ছিল না?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির ফায়ার সেফটি সনদ ছিল না এবং এর আগে সেটিকে ঝুকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ভবনে জরুরি বহির্গমন পথের অভাব এবং কাঠের সিড়ির অবস্থান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, বিপদের আশঙ্কা আগে থেকেই চিহ্নিত হওয়ার পরও যদি কোনো প্রতিষ্ঠান অতিথিদের আবাসনের জন্য চালু থাকে, তবে সেটি কেবল অবকাঠামোগত ত্রুটি নয়, তদারকি ও জবাবদিহিরও ব্যর্থতা।
আগুন লাগা সব সময় ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু আগুন লাগার পর মৃত্যু ঠেকানোর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। উন্নত পর্যটন ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন এখানেই। একটি দায়িত্বশীল আবাসন প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘর, বৈদ্যুতিক সংযোগ, জেনারেটর, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমন পথ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ এমনভাবে নিশ্চিত করতে হয়, যেন দুর্ঘটনা ঘটলেও তার পরিণতি প্রাণঘাতী না হয়। নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, এটি আতিথেয়তা শিল্পের মৌলিক শর্ত।
দুর্ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করতে মনোবিজ্ঞানী জেমস রিজনের প্রস্তাবিত ‘সুইস চিজ মডেল’ গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বড় দুর্ঘটনা সাধারণত একটি বিচ্ছিন্ন ভুলের কারণে ঘটে না। নিরাপত্তাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে থাকা দুর্বলতাগুলো একত্র হলে বিপর্যয় ঘটে। ইনানীর ঘটনায় যদি অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, জরুরি নির্গমন পথের অভাব, দাহ্য নির্মাণসামগ্রী এবং দুর্বল তদারকি একই সঙ্গে ভূমিকা রেখে থাকে, তবে তা একক কোনো ভুলের চেয়ে অনেক বড় ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। তদন্তে এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
আরও গভীরভাবে দেখলে এখানে রয়েছে নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি। সমাজবিজ্ঞানী ডায়ান ভন একে বলেছেন ‘বিচ্যুতির স্বাভাবিকীকরণ’। অর্থাৎ কোনো নিয়মের ব্যত্যয় বারবার ঘটলেও তাৎক্ষণিক বিপর্যয় না ঘটায় একসময় সেই অনিয়মকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়। একটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যবসা চলতে থাকে, কর্তৃপক্ষ নীরব থাকে এবং অতিথিরাও ঝুকি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন, তবে বিপদ ধীরে ধীরে দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে অদৃশ্য আশঙ্কায় পরিণত হয়। দুর্ঘটনা সেই অদৃশ্য আশঙ্কাকেই নির্মম বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যর্থতার দায় কার? হোটেল কর্তৃপক্ষের, অগ্নিনিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থার, স্থানীয় প্রশাসনের, নাকি সমন্বয়হীন পুরো ব্যবস্থার? বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আলাদা হলেও পর্যটকের নিরাপত্তা একটি অভিন্ন জাতীয় স্বার্থ। কোনো একটি সংস্থার কাজ শেষ হলেই অন্য সংস্থার দায় শেষ হয়ে যায় না। উলরিখ বেকের ঝুকিবিষয়ক সমাজতাত্ত্বিক চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক সমাজে বিপদের ঝুকি অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর মধ্যেই তৈরি হয়। দায়িত্ব অস্পষ্ট থাকলে সবাই বিপদের কথা জানলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার মানুষটি অনুপস্থিত থেকে যান।
এই দায়হীনতার মূল্য শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটন একটি আস্থাভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একজন পর্যটক কোনো গন্তব্য বেছে নেওয়ার সময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবহন, আবাসন, খাবার ও বিনোদনের পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তাও বিবেচনা করেন। মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর চাহিদা তত্ত্বে নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম। সেই নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে গন্তব্যের অন্য আকর্ষণও মানুষের কাছে গুরুত্ব হারায়।
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প যখন আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এ ধরনের দুর্ঘটনা দেশের ভাবমূর্তির জন্যও উদ্বেগজনক। পর্যটকের আস্থা অর্জন করতে দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু একটি বড় দুর্ঘটনা সেই আস্থাকে মুহূর্তেই দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রবাহের যুগে কোনো গন্তব্যের নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়তে পারে হোটেল বুকিং, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় মানুষের আয়ের ওপর। ফলে পর্যটন নিরাপত্তা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত।
এখন প্রয়োজন শোক প্রকাশের পাশাপাশি কার্যকর সংস্কার। প্রথমত, কক্সবাজারসহ দেশের সব পর্যটন গন্তব্যের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য আবাসন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে গুরুতর ঝুকি রয়েছে, সেগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধনের নির্দেশ দিতে হবে। জীবনহানির আশঙ্কা থাকলে আইন অনুযায়ী কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। ঝুকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; সংশোধন হয়েছে কি না, তারও যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য করতে হবে। প্রতিটি আবাসনের বৈধ অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন এবং জরুরি বহির্গমনব্যবস্থার তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা যেতে পারে। পর্যটনবিষয়ক সরকারি ওয়েবসাইট এবং বুকিং প্ল্যাটফর্মে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার অবস্থা যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে পর্যটকেরা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে নিরাপত্তার সনদ প্রদর্শন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তৃতীয়ত, দূরবর্তী পর্যটন এলাকায় জরুরি সাড়াদানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের দূরত্ব, সড়ক যোগাযোগ এবং স্থানীয় অবকাঠামো বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত স্থানে ছোট অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র, পানির সংরক্ষণব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রতিটি আবাসনে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখা, কর্মীদের নিয়মিত মহড়া করানো এবং পর্যটকদের জরুরি নির্গমন পথ সম্পর্কে অবহিত করাও বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, কাঠ ও বাঁশের তৈরি পর্যটন স্থাপনা মানেই অনিরাপদ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব। তবে সেগুলোর নকশা, নির্মাণসামগ্রী, বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরের অবস্থান এবং অগ্নিনিরাপত্তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। পর্যটনের পরিবেশবান্ধব চরিত্র বজায় রাখতে গিয়ে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে কখনোই উপেক্ষা করা যাবে না।
পঞ্চমত, পর্যটন ও আতিথেয়তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের তত্ত্বাবধানে হোটেলকর্মীদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক মহড়া এবং নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব। তবে পরিদর্শন ও আইন প্রয়োগের মূল দায়িত্ব অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহায়তা করতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।
সবশেষে নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহি। ইনানীর অগ্নিকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, তদন্তের ফলাফল প্রকাশ, অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। কারণ তদন্ত প্রতিবেদন যদি কেবল নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে পরবর্তী দুর্ঘটনার জন্যও পথ খোলা থেকে যায়।
পর্যটন মানে শুধু নতুন গন্তব্য আবিষ্কার নয়, মানুষের কাছে নিরাপদে ফিরে আসার নিশ্চয়তা দেওয়াও। সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের সবুজ, বনের নীরবতা কিংবা সূর্যাস্তের সৌন্দর্য মানুষকে ভ্রমণে আকৃষ্ট করে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের পাশে যদি জীবনের নিরাপত্তা না থাকে, তবে পর্যটন উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইনানীর দশটি প্রাণ আমাদের জন্য এক নির্মম শিক্ষা রেখে গেছে। তাদের হারানো জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। এখন দেখতে হবে, এই শোক কয়েক দিনের সংবাদ হয়ে মিলিয়ে যায়, নাকি নিরাপদ পর্যটনব্যবস্থা গড়ার এক গুরুত্বপূর্ণ বাকে পরিণত হয়।
আতিথেয়তার প্রথম শর্ত অতিথিকে স্বাগত জানানো, আর শেষ শর্ত তাকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে দেওয়া। ইনানীর আগুন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, এই দুই শর্তের মাঝখানে রয়েছে প্রস্তুতি, সতর্কতা ও জবাবদিহির দীর্ঘ পথ। সেই পথ তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের সবার, বিশেষ করে যাঁদের হাতে পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা রয়েছে। আগুন কখনো কখনো দুর্ঘটনাবশত লাগে, কিন্তু প্রাণহানির পেছনে অবহেলা থাকলে তার জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই। পর্যটককে আমন্ত্রণ জানানো উন্নয়ন, আর তাঁর জীবন রক্ষা করা সভ্যতা। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে এখন এই সত্যই ধারণ করতে হবে।
মো. মামুন হাসান
বিভাগীয় প্রধান
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ