কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ শেখ হাসিনার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের যোগদান ঘিরে রীতিমত তোলপাড় চলছে। এই সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি এবং সহকর্মীকে নদীতে ফেলে হত্যাসহ নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এত কিছুর পরেও তার কাস্টমসে যোগদানের সুযোগ পাওয়ার ঘটনায় রীতিমত হইচই পড়ে গেছে।
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মো. করিম আব্দুল হাই নামের এক বাসিন্দা দুর্নীতি দমন কমিশনে এমন অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট, মতিঝিল ডিভিশনের ডেপুটি কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ আছে। তিনি একজন অপরাধপ্রবন ব্যক্তি। বিগত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী সরকারের বিশেষ সুবিধাভোগী সচিব আবু হেনা রহমাতুল মুনীমের আজ্ঞাবহ। সে হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং পেয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একপ্রকার ব্ল্যাক চেক পেয়েছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের কাস্টমস বিভাগে তিনি সহকারী কমিশনার (জেটি পরীক্ষণ) হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ফাইল যাচাই প্রক্রিয়ার গতি এবং কঠোরতা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সিঅ্যান্ডএফ কর্মীরা তাকে অবরুদ্ধ করেছিলেন। বিক্ষোভকারীরা তার নামফলক ভেঙে ফেলে। পাশাপাশি ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। শতভাগ কন্টেইনার কায়িক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়ায় সিন্ডিকেটের তোপের মুখে পড়েন। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে প্রশাসন দ্রুত তাকে সেখান থেকে বদলি বাতিলপূর্বক প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত থাকাকালীন ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন এই কর্মকর্তা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেন। দাবিকৃত টাকা না দিলে ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া এবং মামলায় জড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখাতেন ব্যবসায়ীদে। সেই ধারাবাহিকতায় মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে এক রেস্তোরা ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় তার নেতৃত্বে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের একটি দল একটি সুপারশপে অভিযান চালায়। শপটির মালিক বৈধভাবে সরকারি নিলামের মাধ্যমে কোটি টাকার পণ্য কেনার দাবি করেন। কিন্তু এই কর্মকর্তা ব্যবসায়ীর কোন কথা না শুনেই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সমস্ত মালামাল জব্দ করে নিয়ে যান। এ ঘটনাটি স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম হয়। যা ওই সময় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কাফির মৃত্যুর জন্য সরাসরি তাকে দায়ি করা হয়। জনশ্রুতি আছে, এই কর্মকর্তা কাফিকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে হত্যা করেন। কাফির সাতার না জানার দুর্বলতার বিষয়টি তিনি জানতেন। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই কাফিকে কৌশলে হত্যা করে। যাতে করে পানিতে ডুবে মারা গেছে বলে চালিয়ে দেয়া যায়। এমনিতেই পানিতে পড়ে কারো মৃত্যু হলে তিনি পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, তা তদন্ত বের করা কঠিন। কারণ ধাক্কা দেয়ার পর মানুষ পানিতে পড়ে গেলে শরীরে অন্যের ধাক্কা দেয়ার হাতের বা পায়ের ছাপ থাকে না। ওই সময় আহাদের অপকর্ম নিয়ে কথা উঠায় কাফিকে হত্যা করে আহাদ একজন প্রত্যক্ষ স্বাক্ষীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। আওয়ামী সরকারের লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে অন্তত ২ কোটি টাকার বিনিময়ে নিজেকে হত্যার দায় থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। নতুন করে ঘটনাটি তদন্তের দাবি করা হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ক্ষমতা আর প্রভাবের জোর খাটিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করে সিদ্ধান্ত নিতেন। অনিয়ম ও হয়রানিমূলক আচরণ করতেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হলে সরকারি রাজস্ব আদায়, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং সংশ্লিষ্ট নাগরিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ঢাকার জুরাইনের ‘আইরিশ পাব এন্ড রেস্টুরেন্ট লিমিটেড’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে এই কাস্টমস কর্মকর্তা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সম্পূর্ন ব্যক্তিগত স্বার্থে অভিযান চালান। অভিযানে গিয়ে তিনি নিজেই মদ্যপান করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মারধর করেন। উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযানে এসে অভিযানিক দলের মদ্যপান, প্রতিষ্ঠানের স্টাফদেরকে অত্যাচার-নির্যাতন, বৈধ মালামাল জব্দের ভিডিও দেশের স্বনামধন্য টেলিভিশন চ্যানেল এবং পত্র-পত্রিকায় প্রচারিত হলে দেশের সকল সেক্টরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। অবৈধ অভিযানের নামে কর্মচারীদের মারধর ও সম্পদের ক্ষতিসাধনের কারণে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়। ওই মামলায় তিনি চার্জশিটভুক্ত আসামী। আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান মামলা দায়ের করলে বিগত আওয়ামী সরকারের তৎকালীন কতিপয় অসাধু নেতা মামলার বাদিকে নানাভাবে হুমকি দেন। এমন ক্ষোভ থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা ইউটিউবারসহ নানাভাবে বাদীকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন।
দুদকে করা অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, চাকরি জীবনে তিনি যেখানেই বদলি হয়েছেন, সেখানেই দূর্নীতির আখড়া গড়ে তুলেছেন। ব্যাবসায়ীদের কাছে ঘুষ দাবি করে চাপ প্রয়োগ, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বল প্রয়োগ, অত্যাচার নির্যাতন, প্রাইজ পোস্টিং সকল সুবিধা নিয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হওয়ায় ডিপার্টমেন্টের সকল আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্র দাপট দেখিয়েছেন তিনি। ঘুষ নেয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। তার টাকার কিছু অংশ বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের দিয়ে বৈধ করেছেন। নামে-বেনামে ঢাকার রামপুরা ও বনশ্রীতে ৩ ও ৫ কাটার ৪ টি প্লট কিনেছেন, ঢাকার আফতাব নগর ও মাটিকাটায় একটি ছয় তলা আরেকটি তিন তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। উত্তরা ও বনানিতে ৫০০০ ও ৯৫০০ বর্গফুটের দুইটি ফ্ল্যাট আছে। দেশ থেকে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা পাচার করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপের বিভিন্ন হোটেল- রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টের শেয়ার কিনেছেন।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। তার পর পরই কাস্টমস কর্মকর্তা আব্দুল আহাদও পালিয়ে যান। তিনিও দেশ ত্যাগ করেন। কোটি কোটি টাকা খরচ করে আবার দেশে ফেরেন। সকল অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি নেন। সরকারি দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ বা বিদেশে পলায়নের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন ছিল। পরবর্তীতে অন্তবর্তী সরকারের তৎকালীন এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আতাত করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ২০২৬ সালে ফিরে আসেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত না শেষ করে স্মারক নং-০৮.০০.০০০০.০৩৮.২৭.০৫২.১৪-৫৯, তারিখঃ ০১/০১/২০২৬ ইং তারিখে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে প্রকাশিত একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। তাকে পুনরায় যোগদানের সুযোগ করে দেয়া হয়। যা নিয়ে রীতিমত সমালোচনা চলছে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত কাস্টমস কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি ফোন রিসিভ করেননি।