ছবি: যাযাদিজলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় দেশের অর্থনীতিকে আরও সহনশীল করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও জনজীবনের জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বন্যা, অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততার কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন ঝুকি তৈরি হচ্ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, অভিযোজন ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল মান্নান এবং সংরক্ষিত নারী আসন-৪৯-এর সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন উপস্থিত ছিলেন।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমে কারখানার শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি ও সুপেয় পানির ওপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা ও জ্বালানি খাতের চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। এটি চূড়ান্ত হিসাব নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি অর্থনীতির সহনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে জলবায়ু ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
কৃষি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস, বাজারের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তায় কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশে সেচব্যবস্থার উন্নতি হলেও কৃষি এখনো অনেকাংশে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি কমাতে সময়োপযোগী অভিযোজন কৌশল ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও যথাযথ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও কার্যকর অভিযোজনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। বন্যায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর বিরূপ প্রভাবে দেশটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে বৈশ্বিক রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহীর, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, হ্যামস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস. এম. মনিরুল ইসলাম।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, জলবায়ু অর্থায়ন, টেকসই কৃষি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিসহায়তার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেড এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডকল) সম্মাননা দেওয়া হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্যামস গার্মেন্টস আন্তর্জাতিক লিড প্লাটিনাম সনদে ১১০-এর মধ্যে ১০৮ স্কোর অর্জন করেছে। অন্যদিকে, সৌর হোম সিস্টেমের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বিপরীতে ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কার্বন রাজস্ব দেশে আনার স্বীকৃতি পেয়েছে ইডকল। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।