ছবি: সংগৃহীততিন যুগের অভিনয়জীবন, ২৯৯টি সিনেমা, অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা। বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানা ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকতেই অভিনয় থেকে সরে দাড়ান। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এবং মা হিসেবে তাদের পাশে থাকার তাগিদেই যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
আফরোজা সুলতানা রত্না, যিনি দর্শকের কাছে শাবানা নামেই পরিচিত, মাত্র আট বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিষেকের পর ১৯৬৭ সালে একই পরিচালকের উর্দু ছবি ‘চকোরী’তে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
নায়িকা থেকে ভাবি, মা, বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন শাবানা। চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং আজীবন সম্মাননা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেছেন ২৯৯টি সিনেমায়। এর মধ্যে আলমগীরের বিপরীতে তার অভিনীত ছবির সংখ্যা ১৩০। রাজ্জাকের সঙ্গেও তার জনপ্রিয় জুটি ছিল।
শাবানার বাবা ফয়েজ চৌধুরী চট্টগ্রাম আদালতপাড়ায় টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। মা ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে পরিচালক এহতেশাম শাবানার বাবার কাছে মেয়েকে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। প্রথমে মেয়ের লাজুক স্বভাবের কথা ভেবে বাবা রাজি হতে চাননি। পরে এহতেশামের আগ্রহে সম্মতি দেন তিনি।
‘নতুন সুর’ ছবিতে শাবানার প্রথম দৃশ্য ছিল ভাইকে খুশির খবর জানাতে দৌড়ে যাওয়ার। প্রথম শটেই তিনি সফল হন। পরে বাবা ফয়েজ চৌধুরীও চলচ্চিত্র পরিচালনায় যুক্ত হন। তার পরিচালিত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তি’, ‘মালকাবানু’, ‘বিজয়িনী সোনাভান’, ‘আলতাবানু’ ও ‘রাজার মেয়ে বেদিনী’। এর মধ্যে ‘মালকাবানু’ বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।
অভিনয়জীবনের ব্যস্ত সময়ে শাবানার সিদ্ধান্ত ছিল পরিবারকে বেশি সময় দেওয়া। বড় মেয়ে সুমী এ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর ছোট মেয়ে ঊর্মি ও ছেলে নাহিনও সেখানে চলে যান। সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থেকে তাদের বেড়ে ওঠার সময় হারাতে চাননি তিনি।
প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাবানা বলেন, সন্তানদের তাকে খুব মনে পড়ত। কাজের ফাকে দেশে তাদের দেখতে পেলেও বিদেশে যাওয়ার পর সেই সুযোগ কমে যায়। মা হিসেবে সন্তানদের গড়ে তোলার দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে শেষ পর্যন্ত অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
শাবানার প্রযোজক স্বামী ওয়াহিদ সাদিকও এ সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসার সুযোগ থাকায় পরিবার নিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তারা। দীর্ঘদিনের সহশিল্পী, পরিচালক ও চলচ্চিত্রজগতের মানুষদের ছেড়ে যাওয়া কষ্টকর হলেও জীবনের প্রয়োজন বিবেচনায় সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল বলে মনে করেন শাবানা।
শাবানার সন্তানরা পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল এমবিএ শেষ করে বিয়ে করেছেন। ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। ছেলে নাহিন সাদিক রটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন এবং বিয়ে করে সংসার শুরু করেছেন।
সন্তানদের শিক্ষাজীবন শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা শাবানার কাছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি। শৈশব থেকে অভিনয়ে যুক্ত থাকায় নিজের জন্য সময় বের করার সুযোগ কম পেয়েছিলেন তিনি। একটানা প্রায় ৩৫ বছরের কর্মজীবনে কাজকে প্রাধান্য দেওয়ার পর পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের খোজখবর রাখেন শাবানা। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে দেশের সিনেমা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন তিনি। ঢাকায় থাকাকালে শাকিব খানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। শাবানার স্মৃতিতে, শাকিব ছিলেন সুদর্শন, ভদ্র ও অমায়িক।
দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শাকিব খানের নাম বেশি শোনেন বলে জানান শাবানা। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পাশাপাশি শাকিবের সিনেমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুক্তি পাওয়া আনন্দের ও গর্বের বিষয়।
বিভিন্ন সময়ে নতুন সিনেমায় শাবানার ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বেগম রোকেয়ার জীবনভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রে তাকে দেখা যেতে পারে বলেও একসময় গুঞ্জন ছড়ায়। তবে বর্তমানে অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা নেই তার।
এখন পরিবার, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়েই সময় কাটে এই অভিনেত্রীর। পুরোনো সিনেমার স্মৃতি মনে করেন, পরিবারের সদস্যদের নিজের অভিনীত ছবির গল্পও শোনান। টেলিভিশনে তার অভিনীত সিনেমা প্রচারিত হয়, নতুন প্রজন্মও সেসব কাজের মাধ্যমে তাকে চিনতে পারে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে দর্শকের ভালোবাসা পাওয়া শাবানা মনে করেন, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। সন্তানদের পাশে থাকার জন্য অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং পরিবারের জন্য সময় দিতে পারা এবং সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা তার জীবনের বড় সাফল্য।