সংগৃহীত ছবি আজ ১০ অক্টোবর, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো, ভুল ধারণা দূর করা এবং সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতেই প্রতিবছর পালিত হয় দিনটি। তবে সচেতনতার বার্তা যতই ছড়াক, বাস্তবতা হলো—মানসিক কষ্টের কথা প্রকাশ করতে এখনও অনেকেই দ্বিধা বোধ করেন।
একজন মানুষ প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছেন, ক্লাস করছেন, পরিবারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছেন। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, অথচ ভেতরে ভেতরে হয়তো তিনি দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা তীব্র মানসিক চাপের সঙ্গে লড়ছেন। অনেক সময় সেই কষ্টের কথা কাউকে বলাও হয় না। কারণ, শরীর খারাপ হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া স্বাভাবিক হলেও মনের সমস্যার কথা জানালে এখনও নানা প্রশ্ন, ভুল ধারণা ও সামাজিক বিচার-বিশ্লেষণের মুখে পড়তে হয়।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখানেই। সমস্যা থাকলেও অনেকে তা স্বীকার করতে চান না।স্বীকার করলেও চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং নিতে দ্বিধা করেন। এর সঙ্গে রয়েছে বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা, সেবাপ্রাপ্তির সীমিত সুযোগ এবং চিকিৎসার ব্যয় বহনের চাপ।
২০২৬ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অভিজ্ঞতার কথা শুনুন, বাস্তব পরিবর্তন আনুন’। এবারের বার্তায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নীতি, পরিকল্পনা ও সেবাব্যবস্থায় কার্যকর পরিবর্তন আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে সমস্যাটা কতটা বড়
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে। ২০১৮-২০১৯ সালের এই জরিপে দেখা যায়, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা ছিল। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রেও এই হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় চিকিৎসা নেওয়ার হার। জরিপ অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা বা সেবা পায়নি।
এই জরিপের তথ্য ২০১৮-২০১৯ সালের। তাই এটিকে ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি পরিমাপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বড় ঘাটতি যে দীর্ঘদিনের সমস্যা, তা এই তথ্য থেকে স্পষ্ট।
কেন মানুষ সাহায্য নিতে চান না
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাংলাদেশে এখনও বড় বাধা সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণা। কেউ বিষণ্নতায় ভুগছেন বললে অনেক সময় তাকে বলা হয়, 'বেশি ভাবছ', 'নিজেকে শক্ত করো' বা 'সব ঠিক হয়ে যাবে'।
দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা মন খারাপকেও অনেকে স্বাভাবিক জীবনের অংশ ভেবে এড়িয়ে যান। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ চিকিৎসা নেওয়ার আগেই দীর্ঘ সময় সমস্যার সঙ্গে একা লড়েন।
এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসাসেবায় পৌঁছানোর সমস্যা। বিশেষজ্ঞের সংখ্যা কম, সেবা অনেকটাই বড় শহরকেন্দ্রিক এবং নিয়মিত কাউন্সেলিং বা চিকিৎসার খরচ অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষজ্ঞের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। তাই শুধু বিশেষজ্ঞনির্ভর চিকিৎসা নয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে কী বদলাচ্ছে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক না রেখে পরিবার ও সমাজের কাছাকাছি নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন দীর্ঘদিনের জন্য মানসিক রোগীদের প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালকেন্দ্রিক রাখার পরিবর্তে সমাজভিত্তিক, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সেবার ওপর জোর দিচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো মানুষ যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়ে নিজের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে থেকেই জীবনযাপন করতে পারেন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে—মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় থাকা মানুষকে শুধু রোগী হিসেবে দেখা নয়, তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করা।
কী ধরনের সেবা প্রয়োজন, কোথায় মানুষ বাধার মুখে পড়ে কিংবা কেন অনেকে চিকিৎসা নিতে পারেন না।এসব বিষয়ে সেই মানুষগুলোর অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু চিকিৎসা নয়, সহায়ক পরিবেশও দরকার
মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও বন্ধুবান্ধব, সব জায়গার পরিবেশ একজন মানুষের মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে।
বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের ক্ষেত্রে পড়াশোনার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক চাপ, অনলাইন হয়রানি কিংবা অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শিশু ও তরুণদের মানসিক সুস্থতা তাদের শেখা, সম্পর্ক তৈরি ও সমাজে অংশগ্রহণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সমস্যা গুরুতর হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি শুরু থেকেই সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
কর্মক্ষেত্রেও বদল দরকার
দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা কিংবা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্যহীনতা মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপের কথা বলতেও অনেকেই ভয় পান। এতে দুর্বল বা কাজের জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এখানে পরিবর্তন দরকার। একজন কর্মী শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার সুযোগ পান, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
এর জন্য শুধু ছুটি নয়, কথা বলার পরিবেশ, অতিরিক্ত চাপ চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তায় পৌঁছানোর সুযোগও দরকার।
মানসিক স্বাস্থ্য মানেই শুধু রোগ নয়
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরেকটি ভুল ধারণা হলো—এ নিয়ে কথা মানেই গুরুতর মানসিক রোগের কথা বলা।
আসলে মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার অংশ। এটি মানুষকে জীবনের চাপ সামলাতে, নিজের সক্ষমতা কাজে লাগাতে, শেখতে, কাজ করতে এবং সমাজে অংশ নিতে সহায়তা করে।
তাই দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, কাজে মনোযোগ দিতে না পারা কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার মতো বিষয়কে সবসময় এমনিই ঠিক হয়ে যাবে বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
তবে প্রতিটি মন খারাপ বা দুশ্চিন্তাকে রোগ হিসেবেও দেখা ঠিক নয়। জীবনের স্বাভাবিক চাপ ও সাময়িক মন খারাপ মানুষের জীবনের অংশ। কিন্তু এসব অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হয়ে দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা, কাজ বা সম্পর্ককে ব্যাহত করলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বদল দরকার
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না। পুরো ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার।
প্রথমত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও ভালোভাবে যুক্ত করতে হবে। এতে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও প্রাথমিক পর্যায়ে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
দ্বিতীয়ত, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর, নার্সসহ প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরেও সেবার সুযোগ বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যেন শুধু সামর্থ্যবান মানুষের নাগালের মধ্যে না থাকে, সে জন্য সরকারি সেবার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।
সবশেষে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার কমাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে।
'শুনুন, বিচার করবেন না'
২০২৬ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের মূল কথাই হলো—মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, তাদের শুধু নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সুযোগ দিলেই হবে না-নীতি, সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বজুড়েই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সমাজভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘও এবারের বার্তায় মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং সমাজের কাছাকাছি থেকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের জন্যও এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবর্তন শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে আসবে না। পরিবারে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং প্রয়োজনের সময় সহজে পেশাদার সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
মনের যত্নকে স্বাভাবিক করতে হবে
শরীরে জ্বর হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। দাঁতে ব্যথা হলে চিকিৎসা নিই। কিন্তু মন দীর্ঘদিন ধরে অস্থির থাকলে, ঘুম নষ্ট হলে কিংবা সবকিছু অসহ্য লাগলেও অনেক সময় কাউকে কিছু বলি না।
এই জায়গাটিই বদলানো দরকার
মানসিক সমস্যায় থাকা কাউকে 'পাগল', 'দুর্বল' বা 'অতিরিক্ত আবেগী' বলে দূরে সরিয়ে না দিয়ে তার কথা শোনা, বিচার না করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহ দেওয়া,এটুকুই বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস তাই শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়। এটি মনে করিয়ে দেওয়ার দিন—সুস্থ থাকার অর্থ শুধু শরীর সুস্থ থাকা নয়, মানুষের মন, অনুভূতি, সম্পর্ক ও সামাজিক জীবনও সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তবে পরিবর্তনের কাজও শুরু হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই কাজকে আরও বিস্তৃত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রান্তিক বিষয় না রেখে মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা।
কারণ একজন মানুষ বাইরে থেকে যতই স্বাভাবিক দেখাক, তার ভেতরের লড়াইটি সবসময় চোখে দেখা যায় না। তাই কখনও কখনও সমাধানের প্রথম ধাপ চিকিৎসা নয়—প্রথম ধাপ হলো মন দিয়ে শোনা।