ছবি: যাযাদিচারদিকে পানি, অথচ পান করার মতো মিষ্টি পানির সংকট। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের উপকূলীয় গ্রাম খাগড়াঘাট ও কৈখালির মানুষের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ লাঘবে চালু হয়েছে দুটি রিভার্স অসমোসিস (আরও) পানি শোধনাগার। বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপের অর্থায়নে স্থাপিত শোধনাগার দুটির মাধ্যমে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) শোধনাগার দুটি উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ। এর একটি খাগড়াঘাটে নূরউদ্দীনের বাড়ির সামনে এবং অন্যটি কৈখালিতে আলাউদ্দিন মল্লিকের বাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়েছে।
সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগরের এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানির কারণে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে কয়েক মাস চললেও বছরের বাকি সময় মিষ্টি পানির জন্য দূরে যেতে হতো। পানি সংগ্রহের এই দায়িত্বের বড় অংশ পালন করতে হতো নারীদের। এতে তাঁদের দৈনন্দিন কাজের চাপ বাড়ত, পাশাপাশি শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতও ব্যাহত হতো।
খাগড়াঘাটের গৃহবধূ রহিমা বেগম (৪৫) বলেন, এখন কল চালু করলেই মিষ্টি পানি পাওয়া যাচ্ছে। আগে বর্ষার পানি শেষ হয়ে গেলে লোনা পানি পান করতে হতো। এতে তাঁর সন্তানদের প্রায়ই পেটের অসুখ হতো বলে জানান তিনি।
কৈখালির ষাটোর্ধ্ব আমেনা খাতুন বলেন, আগে এক কলস মিষ্টি পানির জন্য দুই থেকে তিন মাইল হাটতে হতো। এখন বাড়ির কাছেই পানি পাওয়ায় তাঁদের কষ্ট অনেকটাই কমেছে।
রহিমা বেগম আরও বলেন, আগে মেয়েশিশুরা পানি আনতে গিয়ে স্কুলে যেতে পারত না। এখন পানি সংগ্রহের ঝামেলা কমায় তাদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, উপকূলীয় এলাকার পানির সংকট তাঁদের গভীরভাবে ভাবিয়েছে। এমন একটি স্থায়ী সমাধান গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য ছিল, যা মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন এবং শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরীক্ষাগারের পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগার চালুর পর পানিতে মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (টিডিএস) পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কৈখালির সাধারণ নলকূপের পানিতে টিডিএসের পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে ৮ হাজার ২১৭ মিলিগ্রাম, যা শোধনের পর কমে হয়েছে ২৮ মিলিগ্রাম। খাগড়াঘাটে আগে এ পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে ৪ হাজার ৮১ মিলিগ্রাম, শোধনের পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২ মিলিগ্রামে।
পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, কৈখালির পানিতে আয়রনের পরিমাণও প্রতি লিটারে ১ মিলিগ্রাম থেকে কমে ০.০১ মিলিগ্রামে নেমেছে। স্থানীয় চিকিৎসক ডা. আমজাদ হোসেন জানান, পানিতে আয়রনের আধিক্য থাকলে পানির রং লালচে হতে পারে এবং স্বাদে তেতো ভাব দেখা দিতে পারে।
শোধনাগারগুলোতে পানি বিতরণের জন্য ডিজিটাল কার্ডভিত্তিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্থানীয় গ্রাহকেরা কার্ড ব্যবহার করে পানি সংগ্রহ করতে পারবেন। কলের সামনে কার্ড ধরলে পানি বের হবে এবং কার্ড সরিয়ে নিলে পানি পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। এতে পানির অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিটি শোধনাগারে স্থাপন করা হয়েছে ১০টি করে সৌর প্যানেল। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পাম্প পরিচালনার ফলে প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সময়ও পানি সরবরাহ সচল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি বিতরণ ব্যবস্থায় স্থানীয় তরুণদের যুক্ত করা হয়েছে। শ্যামনগরের তরুণদের সংগঠন শরুব ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যরা শোধনাগার দুটি পরিচালনা করছেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের দক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, শোধনাগার দুটি উপকূলীয় এলাকার সুপেয় পানির সংকট কমাতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি পানি সংগ্রহে সময় ও শ্রম কম ব্যয় হওয়ায় নারী ও শিশুদের শিক্ষা, দৈনন্দিন কাজ এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।