সংগৃহীত ছবিপায়রা বন্দর সচল রাখতে আবারও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দরটির রাবনাবাদ চ্যানেলে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় চ্যানেলে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ১২ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করে নাব্যতা ৯ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে পায়রা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে। বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং প্রতিষ্ঠান জান ডি নুল ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চ্যানেলটির ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন করে। তবে পরবর্তী দুই বছর ড্রেজিং না হওয়ায় চ্যানেলে পলি জমে নাব্যতা সংকট তৈরি হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, চ্যানেলের গভীরতা বাড়িয়ে নাব্যতা ধরে রাখা গেলে বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরের টার্মিনালে ভিড়তে পারবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে আগের ড্রেজিংয়ের সুফল, নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও সুশাসনকর্মীরা।
পায়রা বন্দরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের চার্ট বিশ্লেষণে কাঠালধার পয়েন্টে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে চ্যানেলের গড় গভীরতা ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিটারে নেমে এসেছে। স্থান ও জোয়ারের সময়ভেদে সর্বোচ্চ ড্রাফট পাওয়া যাচ্ছে ৬ দশমিক ৫ মিটার। অথচ ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরুর আগেও রাবনাবাদ চ্যানেলের স্বাভাবিক গভীরতা ছিল ৫ দশমিক ৬ মিটার।
বন্দরের কার্যক্রমের পরিসংখ্যানেও জাহাজ চলাচল কমার চিত্র দেখা যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্দরে ১১১টি বিদেশি বড় জাহাজ আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে ১২৩ হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮৫টিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসেছে মাত্র ২৯টি বিদেশি জাহাজ।
চ্যানেলের গভীরতা কম থাকায় কয়লাবাহী জাহাজকেও পণ্য পরিবহনে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চে বন্দরের বহির্নোঙরে আসা ইন্দোনেশিয়ার কয়লাবাহী এমভি থেরেসা গ্রেসকে গভীরতার সীমাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে যেতে হয়। সেখান থেকে লাইটার জাহাজ ও বাল্কহেডে কয়লা খালাস করে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।
দুই বছর বিরতির পর ৭ অক্টোবর পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনালে ভেড়ে চীনের পতাকাবাহী জাহাজ ‘ফান ঝউ-৬’। বন্দরের জন্য কেনা পাঁচটি কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম নিয়ে জাহাজটি সরাসরি টার্মিনালে নোঙর করে। কর্তৃপক্ষের আশা, চ্যানেলের নাব্যতা বজায় রাখা গেলে এ ধরনের মাদার ভেসেল সরাসরি টার্মিনালে আসতে পারবে।
বন্দর চালুর পর প্রায় এক দশকে কাস্টমস ও বন্দর মাশুল বাবদ ১ হাজার ৯০৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিফাত ফেরদৌস বলেন, পায়রা বন্দর এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে সেটিকে বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে বন্দর সচল করার পর আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, দেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত হয়। প্রকল্প শেষ হলেই ঋণ পরিশোধ হয়ে যায় না, সেই দায় শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়। তাই বন্দর সচল রাখার উদ্যোগের পাশাপাশি বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল জেলা সভাপতি অধ্যাপক গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, পায়রা বন্দরের চ্যানেলে নাব্যতা সংকট দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। এর আগে বিপুল অর্থ ব্যয়ে ড্রেজিং করা হলেও সেই কাজের সুফল কতটা পাওয়া গেছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, আগের প্রকল্পের ফলাফল যাচাই না করে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি থাকে। প্রতিটি কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করে পরবর্তী উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, দুই-তিন বছর পরপর বড় বাজেটের ড্রেজিংয়ের পরিবর্তে প্রতিবছর নিয়মিত ড্রেজিং চালু রাখা গেলে চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখা সহজ হতে পারে।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ-উল ইসলাম বলেন, রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং সম্পন্ন হলে বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়বে। বন্দরের অন্যান্য মূল অবকাঠামো ও সুবিধা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ায় ড্রেজিং শুরু হলে অতিরিক্ত চার মিটারের মধ্যে কয়লাবাহী মাদার ভেসেলের পাশাপাশি গাড়ি, খাদ্য, সার ও নির্মাণসামগ্রীবাহী জাহাজ প্রবেশের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও চালানো সম্ভব হবে।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে যাতে নাব্যতা সংকটের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পায়রা বন্দরের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নাব্যতা ধরে রাখা। নতুন ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি আগের কাজের কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।