ছবি: যাযাদিব্যবসায়িক লেনদেনের নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া চেকের ভিত্তিতে একাধিক মামলা দায়ের, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মেঘনাঘাটে অবস্থিত আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী সরকারি খাসজমি ও বিরোধপূর্ণ জমি দখল করে বালু ভরাটের অভিযোগও উঠেছে তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের আর্থিক হিসাব নিষ্পত্তি না করেই সিকিউরিটি চেকের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। এসব মামলাকে কেন্দ্র করে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কামাল বা তার প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, পাচ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাওনা আদায়ের নামে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্য ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। একই চেকের বিপরীতে একাধিক মামলা দায়ের এবং কথিত মিথ্যা জিআর মামলা করে ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগও করেছেন তারা।
এ ছাড়া সিআইডি ও ডিবি পুলিশের নাম ব্যবহার করে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। হক ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৬ ও ৫০৬ ধারায় দায়ের করা মামলাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের বক্তব্য, মামলায় উল্লেখ করা ঘটনার দিন সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেশে ছিলেন না। আল মোস্তফার কার্যালয়ের একজন পিয়নকে বাদী করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যবসায়িক লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে নদী ভরাট, জমি দখল ও কারখানা নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যারবাজার এলাকার সাতভাইয়াপাড়া ও চর লাউয়াদী মৌজায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি না কিনে এবং নদীতীরবর্তী সরকারি খাসজমি ও হালট দখল করে গত এক সপ্তাহ ধরে বালু ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বৈদ্যারবাজার ঘাট এলাকার জমির মালিক হাজী আজিজুল্লাহ জানান, সাতটি দাগে প্রায় ১ একর ১০ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে তার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-তিন আসনের সাবেক বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের স্ত্রী সুরাইয়া করিম মুন্নীর বিরোধ রয়েছে। এ নিয়ে তিনি আদালতে মামলা করেছেন।
আজিজুল্লাহর অভিযোগ, মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সুরাইয়া করিম মুন্নী বিরোধপূর্ণ জমি হেরিটেজ পলিমার অ্যান্ড সেমি টিউবস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের কাছে বিক্রি করেন। পরে ওই জমিতে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে বালু ভরাটের কাজ শুরু করা হয়।
আজিজুল্লাহ বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে এবং জমিটির ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তার অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্থানীয় চেয়ারম্যান ডা. আব্দুর রউফ একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোম্পানির পক্ষে জমি দখল ও বালু ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি এবং অভিযোগের অন্যান্য দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় দোকানদার সাব্বির আহমেদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও তার লোকজন দোকানপাট ভেঙে জায়গা খালি করে দেওয়ার জন্য তাদের বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন। সাব্বির বলেন, দোকান ভেঙে দেওয়া হলে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে হেরিটেজ পলিমার অ্যান্ড সেমি টিউবস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের বক্তব্য জানতে সাংবাদিক পরিচয়ে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি মহল নদী ও সরকারি খাসজমি দখল করে আসছে। তবে আল মোস্তফা গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর বসতভিটা ও খামার হারানোর আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ব্যবসায়ী মহলের দাবি, প্রকৃত পাওনা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবের খাতা বা লেজার নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই চেকের বিপরীতে দায়ের করা মামলাগুলোর আইনগত পর্যালোচনা এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী সরকারি জমি ও বিরোধপূর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে বালু ভরাটের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আল মোস্তফা গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।