লিটন দেবনাথ বান্দরবান বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক (ডিডি) লিটন দেবনাথ এর বিরুদ্ধে চারা বিতরণ ও প্রদর্শনীর নামে ৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলেও ফের একটি প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছেন ।
পূর্বের অর্থবছরের প্রকল্পে সাত উপজেলায় চারা বিতরণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে প্রদর্শনীর অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। বিতরণ করা চারার মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ, রোপণ ও প্রদর্শনীর জন্য প্রথম ধাপে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আরও ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, আগের প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতার যথাযথ মূল্যায়ন কিংবা অনিয়মের তদন্ত ছাড়াই আবার একই কর্মকর্তার হাতে দেওয়া হয়েছে কোটি টাকার এই প্রকল্পের দায়িত্ব।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় জেলায় ৩ কোটি টাকার ফলদ ও বনজ প্রকল্প বরাদ্দ দেয়। রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও সদর উপজেলার কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই প্রকল্প এরইমধ্যে কাগজে কলমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাস্তবে ৭টি উপজেলায় এই প্রকল্পের অধীনে একটি চারা তো দূরে থাক, একটি বাঁশের কঞ্চিও খাঁড়া নেই। প্রকল্পটির দায়িত্বে ছিলেন বান্দরবান বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক (ডিডি) লিটন দেবনাথ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩ কোটি টাকা ব্যয়ের ওই প্রকল্প কৃষকদের কোনো কাজেই আসেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টার নিজেদের উদ্যোগে কোনো বনজ চারা উৎপাদন করেনি। ফলদ চারাও পর্যাপ্ত ছিল না। এ অবস্থায় বেসরকারি নার্সারি থেকে নিম্নমানের চারা চড়া দাম দেখিয়ে কিনে কৃষকদের হাতে গছিয়ে দেওয়ায় রোপণের কিছুদিনের মধ্যে তা শুকিয়ে যায়।
বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপপরিচালক (ডিডি) লিটন দেবনাথের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা ফলদ ও বনজ প্রকল্পটির আওতায় ১ শতাংশ প্রদর্শনীর অস্তিত্বও এখন মাঠে নেই। তবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ ও প্রদর্শনী স্থাপন প্রকল্পের দায়িত্ব ফের লিটন দেবনাথকেই দেওয়া হয়েছে।
বান্দরবান জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক ইয়াসিনুল হক রিপন অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রীর সুনজরে থাকা লিটন দেবনাথ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বান্দরবানে বদলি হয়ে আসেন। যদিও বদলি আদেশ আওয়ামী লীগের আমলেই হয়। রিপন বলেন, ফ্যাসিস্টের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় এই কর্মকর্তা বর্তমান সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হর্টিকালচার সেন্টারে পর্যাপ্ত ফলদ ও বনজ চারা মজুদ না থাকাকে কৃষি বিশ্লেষকেরা সংশ্লিষ্ট সেন্টারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার চরম অবহেলা বলে মত দেন।
থানচির ভুক্তভোগী কৃষক অংশৈ মারমা বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নের কথা বলে যেসব চারা দেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশই মরা ও দুর্বল। বাঁশের চারা যেগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো সুতার মতো চিকন, যা মাটিতে রোপণ করার পরই শুকিয়ে গেছে। সরকারের এত কোটি টাকা খরচ হলো, অথচ আমাদের এক টাকার উপকারও হলো না।’
এমন ব্যাপক অনিয়ম ও ব্যর্থতার পরও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১ লাখ ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ, রোপণ ও প্রদর্শনী করার জন্য বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদকে প্রথম ধাপে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদকে কাগজে কলমে সাফল্যের গল্প শুনিয়ে উপপরিচালক লিটন দেবনাথ পুনরায় চারা সরবরাহ, বিতরণ ও প্রদর্শনী স্থাপনের কাজ নিয়েছেন। এ বছরও বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে পর্যাপ্ত চারা না থাকায় আবার বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্নমানের চারা কিনে কৃষকদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিতরণ করা ফলদ ও বনজ চারা বিল-ভাউচারে হর্টিকালচার সেন্টারে উৎপাদিত উন্নতমানের চারা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লিটন দেবনাথ বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। একটু পজিটিভ নিউজ করুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আপনি কিছু মনে করবেন না।’
পুনরায় একই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে বান্দরবান দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে, হর্টিকালচার সেন্টারে লোকবলের অভাব। প্রদর্শনী প্লট করলেই হয় না। সেটা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। রক্ষণাবেক্ষণ করার লোক কোথায়? আশ্চর্য বিষয় হলো, যে কর্মকর্তা আগের বছর ৩ কোটি টাকার চারা বিতরণে এত বড় দুর্নীতি করলেন, তাকেই আবার দেড় কোটি টাকার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে কীভাবে? জেলা পরিষদের অসাধু কর্মকর্তাদের মদদ ছাড়া এই লুটপাট সম্ভব নয়। জেলা পরিষদ যদি তার সঙ্গে জড়িত না থাকে, তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ফলদ ও বনজ প্রকল্পের আওতায় চারা বিতরণের পর একটা চারা খারাপ হলেও তা পরিবর্তন করে দিতে হবে। কারও বিরুদ্ধে স্পষ্ট অনিয়ম-দুর্নীতি খুঁজে পেলে জেলা পরিষদ সরাসরি ব্যবস্থা নেবে। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ এর আগেও দুর্নীতিকে জিরো ট্রলারেন্সে রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন।