২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর, দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের লিওঁ শহরে ‘জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়’-এর বিরুদ্ধে আয়োজিত এক বিক্ষোভের সময়, লিওঁ পর্যটন কার্যালয়ের সামনে কাদানে গ্যাসের ধোয়ার মধ্যে দাড়িয়ে থাকা এক বিক্ষোভকারী একটি বস্তু লাথি মেরে সরিয়ে দিচ্ছেন । ছবি: এএফপি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং সরকারি নীতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুর পর্যন্ত সারা দেশে ১৪০টি বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে, এতে অংশ নেন প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ মানুষ। এ সময় দেশজুড়ে ২৫০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিসের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। মুখোশ ও হুড পরা কয়েকটি দলের বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাদানে গ্যাস ব্যবহার করে। রাজধানীর কেন্দ্রের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বর ও আশপাশের সড়কে বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভ শুরুর আগেই কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।
প্যারিস থেকে আলজাজিরার সংবাদদাতা নাতাশা বাটলার জানান, বিক্ষোভস্থলে পুলিশ ব্যাপকভাবে স্টান গ্রেনেড ও কাদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ঘিরে ফেলে। এতে তারা পুলিশের অবস্থানের মধ্যে আটকা পড়েন এবং সেখান থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীরা সিটি হলের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় কয়েকটি দোকানে লুটপাট চালান বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, লিও শহরে স্থানীয় পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে গণমাধ্যম।
পশ্চিম ফ্রান্সের রেন শহর থেকে আলজাজিরার সংবাদদাতা রোজি বার্চার্ড বলেন, ফ্রান্সের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্তমানে দেশটিতে বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে। ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে আগামী বছর দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শনিবারের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন, স্বাস্থ্যকর্মী, কৃষক এবং সাধারণ নাগরিকেরা অংশ নেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের প্রতিকূল পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই বৃহত্তর বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আগের বিক্ষোভে পুলিশের হাতে কয়েকজন গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর হাত হারানোর ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবারের কর্মসূচিতে ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরাও যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওই আন্দোলনের কর্মীরা ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সজুড়ে বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলনটি আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন আলজাজিরার সংবাদদাতা রোজি বার্চার্ড।
প্যারিসভিত্তিক সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চের গবেষক ব্রুনো কাত্রে আলজাজিরাকে বলেন, শনিবারের বিক্ষোভ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলনের সম্মিলিত প্রকাশ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নার্স, কৃষক ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকদের অংশগ্রহণে এই কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তার মতে, উচ্চ করের বোঝা, জাতীয় ঋণ এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ে ফরাসি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এসব আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার মানুষের বিভিন্ন দাবি পূরণে সমস্যার মুখে পড়ছে। দেশের ভবিষ্যৎ ও চলমান বাজেট সংকট থেকে উত্তরণের পথ নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিক্ষোভের আগের দিন শুক্রবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিক্ষোভ ও মতপ্রকাশের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। তবে এ অধিকারের সঙ্গে মানুষ ও সম্পদের প্রতি সম্মান দেখানোর দায়িত্বও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা সম্পত্তির ক্ষতি করা কিংবা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভের পরবর্তী পরিস্থিতি এবং সরকারের পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ব্যয় ও বাজেট সংকট ঘিরে চলমান অসন্তোষ দেশটির রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।