শাহীন রাজা খেলছে! অবিরাম খেলেই চলছে! একটার পর একটা চাল দিয়ে আমাদের সামনে চলার পথে আটকে দিতে চায়। অদৃশ্য এ-ই ছায়া খেলোয়াড়! দেখা যায় না, খেলোয়াড়দের। এরা কখনোই ছায়া থেকে কায়া হয়ে সামনে আসে না। ধরা-ছোয়ার বাইরে থেকেই খেলে যাচ্ছে। তাদের খেলা দেখা যায় না। কিন্তু বুঝা যায়। সবটাই ছায়ার কায়াকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল। এই অদৃশ্য খেলোয়াড়রা আমাদের ভেঙেচুরে তছনছ করে দিচ্ছে। আমরা শুধুই তাদের খেলার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে আছে কিছু ঘর শত্রু বিভীষণ। এই বিভীষণদের মুখ দিয়ে কখনো মানবাধিকারের কথা বলায়। কখনো আবার বাক স্বাধীনতা কিংবা গণতন্ত্রের কথা শোনায়। আসল কথা একটাই, আমাদের রাজনীতিতে নাক গলানো। এভাবে এক সময় আমাদের মতো ছোট ছোট দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আমার দেশের সঙ্গেও এমনটাই করতে চাইছে।
গত কয়েক দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্র দেখে তা-ই মনে হচ্ছে। খেলোয়াড়রা প্রতি মুহূর্তে নতুন, নতুন গুটি চালছে। এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিপর্যস্তার পথে নিয়ে চলছে। যারা খেলছে তারা হয়তো স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায় না। তাদের প্ল্যান হয়তো একটা অস্থিতিশীল বাংলাদেশ। তাই তারা প্রতি মুহূর্তে খেলার ধরন পাল্টাচ্ছে। কখনো ধর্মকে ব্যবহার করছে। আবার প্রগতিশীলতার নামে মানুষের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা।
বাইরের এ-ই অপশক্তির প্রধান প্রতিপক্ষ হচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক শক্তি। আর বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনা বাহিনী। রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ গড়ে তোলা। এর জন্য এক দলের প্রতিপক্ষ হিসেবে আরেক দলকে দাড় করিয়ে দেয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আজ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। এর পরিবর্তে আছে শত্রুতা। কি করে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে পরাজিত করা যায়। আদর্শিকভাবে পরাজিত করা নয়। শারীরিকভাবে ধ্বংস করে দেয়ার কর্মকাণ্ড চলছে। এর ফলে এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে, অবিশ্বাস আর সন্দেহের দোলাচল।
রাজনৈতিক দলের মানসিক গঠন এখন আর আদর্শিক নয়। অনেকটা সামন্তীয় চিন্তাভাবনা। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে পারলেই গোটা দেশের মালিক হওয়া যাবে! এই অবস্থা মহাসংকট রূপে দেখা দিয়েছে ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে। ৫ আগস্ট পরবর্তীতে বর্তমান সময়ের সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের মনোভাব, এই রাজ্যে তারাই একমাত্র রাজা। সরকার অবস্থায় থাকুক কিংবা সরকারের বাইরে থাকুক। তাদের মনোভাব, তাদের কথাতেই দেশ চলতে হবে। তা না হলে দেশকে, তার মতো করে চলতে দেয়া হবে না।
ছায়া শক্তি ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কাকে কি কথা দিয়েছে, তা এই দেশের সাধারণ মানুষ জানে না। হয়তো এক-এক দলকে এক-এক রকম করে বুঝ দিয়েছে ছায়া শক্তি। তবে সব দলের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, সবাইকে-ই কথা দিয়েছে তাদের দলকেই ক্ষমতায় আনতে সহযোগিতা করবে। তাই এখন পরাজিত দলের নেতাদের আচরণ এমনটাই- কিসের ইলেকশন, কিসের গণতন্ত্র, ক্ষমতাই হচ্ছে সব। এ কারণেই দলগুলো, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ধার ধারছে না।
সরকারি দলের মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো লক্ষণ নেই। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সরকার কিছু লোককে পুনর্বাসন করতেই ক্ষমতায় এসেছে। গত ১৭ বছর দেশের গণতন্ত্র এবং দলকে রক্ষায় আওয়ামী সরকারের নানা অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরিবার বা ঘর ছাড়া থাকতে হয়েছে বছরের পর বছর। এমনকি ধান ক্ষেতে বা ঝোপঝাড়ে দিনের পর দিন রাত কাটাতে হয়েছে। এতো বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও দলের আদর্শ ত্যাগ করেনি।
বিরোধী দল সরকার পরিচালনায় বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। এটা হয়তো জানে না। না হয় জানতে চায় না। বর্তমানে এদের একটাই কাজ, কিভাবে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা যায়। এই লক্ষ্যে নানা ফন্দিফিকির করেই চলছে।
দলের ত্যাগী কর্মীরা যখন দেখছেন, গত ১৭ বছর যে লোকগুলো দেশে এবং দেশের বাইরে সুখ সাচ্ছন্দ্যে বসবাস করেছে। এখন তারাই দল বা সরকারের আশপাশে। গত ১৭ বছর আওয়ামী অত্যাচার দলের তেমন ক্ষতি করতে না পারলেও দলের ভেতর এই বৈষম্য দলের ভিত দূর্বল করে দিতে পারে। এ ছাড়া আওয়ামী শাসনামলে শুধু জেল-জুলুম নির্যাতনই হয়নি। আওয়ামী ঘরনার বাইরে সব পেশার লোক বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছে। হয়তো তারা শারীরিকভাবে হননি। কিন্তু কেউ পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কেউ আবার চাকরি সীমা পার হওয়ার আগেই পেশা হারিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য করতে পারেননি। আওয়ামী আমলের গোটা সময় গাটের পয়সা ভেঙে চলতে হয়েছে তাদের। নির্যাতনের পরিধি ছিল ব্যাপক। এই বঞ্চিত শ্রেণি রাষ্ট্র বা সরকারের কাছ থেকে কোনো বাড়তি সুবিধা আশা করে না। তাদের একটাই আকাঙ্ক্ষা তারা আর স্বৈরাচার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। এই বিষয়টি সরকারকে ভাবতে হবে।
সরকারি দলের ভূমিকা অনেকটাই মন্থর এবং শ্লথ গতিতে এগুচ্ছে। দলে গতির সঞ্চার ঘটালে, এক সময় স্থবির হয়ে যাবে। এই স্থবিরতা থেকে বের হয়ে আসতে, নানাবিধ রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে হবে। বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে সভা-সমাবেশ করতে হবে। এর সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। এর বাইরে দলীয় কর্মীদের দিয়ে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বিভিন্ন দিবস পালন করতে হবে। দলে গতির সঞ্চার ঘটাতে না পারলে নেতা-কর্মী সব অলস হয়ে পড়বে। কোনো কিছু করার না থাকায়, এই অলস লোকেরা এক সময় প্রশাসনের ঘাড়ে চেপে বসবে। চাদাবাজি এবং তদবির বাণিজ্যে ঝুকে যাবে। একদিকে দল যেমন সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। অন্যদিকে জনমনে দলের প্রতি বিরূপ ধারণা জন্মে। এখন সরকারি দলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সে কোন পথে চলবে।
বিরোধী দল সরকার পরিচালনায় বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। এটা হয়তো জানে না। না হয় জানতে চায় না। বর্তমানে এদের একটাই কাজ, কিভাবে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা যায়। এই লক্ষ্যে নানা ফন্দিফিকির করেই চলছে। কখনো নিজ দলের নেতা-কর্মীরা। কখনো আবার ভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে। সবকিছু যে এক জায়গা থেকে হচ্ছে, তা সাধারণ জনগণ বুঝে। এরা মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় যেয়ে ধর্মীয় সম্প্রতির কথা বলে। অন্যদিকে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবেহ করে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে। মাজার ভাঙচুর করে সমাজকে বিভাজিত করে দেয়। গান বাজনা বন্ধের কথা বলে দেশ এবং জাতিকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এই সবের একটাই উদ্দেশ্য সমাজে সাম্প্রদায়িক, সম্প্রীতি বিনষ্টের মধ্য দিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। বিরোধী দলের লোকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার মনোনীত ভিসি উৎখাতে দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখে। সরকার হকার উচ্ছেদ বা ব্যাটারি রিকশা নিষিদ্ধ করতে গেলে বিরোধী দল তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। এর সবকিছুই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার মহাপরিকল্পনা।
বিরোধী দলের প্রতি বিনীত অনুরোধ, এই বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনারা অনেক জানেন। কিন্তু আমার মতো সাধারণ মানুষরাও কম জানে না। ঐতিহাসিকভাবে আপনারা দলের জন্মলগ্ন থেকে ভুল রাজনীতি করে আসছেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করব না। শুধু এইটুকু বলব, এক/এগারোর সরকারকে বিশ্বাস বা সহযোগিতা করে সব থেকে বড় মাশুল দিয়েছেন আপনারা। ওই সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য যা যা করার তার সবটাই করেছিলেন, আপনারা। আপনাদের এক প্রয়াত নেতা (সেই ভুলের কারণে ফাসির কাষ্ঠে ঝুলে তাকে মাশুল দিতে হয়েছে) সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ইলেকশনে অংশ নিতে মানসিক চাপ দিয়েছিলেন। ওই ইলেকশনে যাওয়ার ভুল সিদ্ধান্তের জন্য, আপনাদের দলে শীর্ষ নেতাদের অনেককে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। যাদের ফাসি হয়েছে ওই পর্যায়ের নেতা আগামী ৫০ বছরে আপনাদের দেখা মিলবে কি না সন্দেহ আছে। সুতরাং ভেবে চিন্তে পা ফেলবেন। আপনাদের বিরোধিতার কারণে হয়তো সরকার বিদায় নেবে। কিন্তু আগামীতে যে শক্তি আসবে তারা কি আপনাদের সহযোগী হবে? না ২০০৮ নির্বাচিত সরকার পরবর্তী যা হয়েছে তা থেকেও ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে?
সবশেষে ছায়া শক্তির উদ্দেশ্যে আমার কথা। আপনারা হয়তো জানেন। কিংবা জানেন না। ষড়ঋতুর দেশ এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ, হেমন্ত বা শীতের রোদের মতো কোমল। বসন্তের রঙে রঙিন। আবার চৈত্র-বৈশাখের মতোই কঠিন এবং প্রলয়ঙ্করী। কিংবা আষাঢ়, শ্রাবণে নদীর জলের মতোই দুর্বার! অনিয়ম, অন্যায়, ষড়যন্ত্র সব প্লাবণের জলে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বিষয়টি বিবেচনার জন্য অনুরোধ।
শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক