মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে সরকার, সোনালী ভবিষ্যতের হাতছানি

আহসান হাবিব বরুন

মতামত

ছোট্ট একটা ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীটির চোখে হয়তো পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন। তার সামনে খোলা বই, পাশে খাতা-কলম; কিন্তু জ্ঞানের

2026-10-24T18:41:46+06:00
2026-10-24T18:41:46+06:00
শনিবার ● ২৪ অক্টোবর ২০২৬
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে সরকার, সোনালী ভবিষ্যতের হাতছানি
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪১ পিএম  
প্রতীকী ছবি
ছোট্ট একটা ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীটির চোখে হয়তো পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন। তার সামনে খোলা বই, পাশে খাতা-কলম; কিন্তু জ্ঞানের বিশাল পৃথিবীতে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির সুযোগটি এখনো তার নাগালের বাইরে। সে হয়তো পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করেছে, নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে অর্জন করেছে সর্বোচ্চ সাফল্য, অথচ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রয়োজনীয় একটি কম্পিউটার তার পরিবারের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। এমন বাস্তবতায় রাষ্ট্র যখন মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়, তখন সেটি কেবল একটি উপহার বিতরণের কর্মসূচি থাকে না; বরং হয়ে ওঠে সম্ভাবনাময় একটি প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা, শিক্ষায় বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি।
 
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার সরকারের সিদ্ধান্ত সেই প্রত্যাশাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির গত ১০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এ উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় অসাধারণ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কতজন শিক্ষার্থীর হাতে ল্যাপটপ পৌঁছাল, তার ওপর নয়; বরং সেই প্রযুক্তি তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন গঠনে কতটা কার্যকর অবদান রাখল, তার ওপরও।
 
শিক্ষা কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। একটি দেশ তার প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা সাময়িক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে কিছু দূর এগিয়ে যেতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন জ্ঞাননির্ভর, দক্ষ ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদ। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে সেই মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান, বৈজ্ঞানিক চিন্তা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের দক্ষতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল বাণিজ্য ও অনলাইন শিক্ষার বিস্তারের যুগে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদেরও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলা জরুরি।
 
এই বাস্তবতায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপ তুলে দেওয়ার উদ্যোগকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একটি ল্যাপটপ একজন শিক্ষার্থীর সামনে পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানের জগৎ খুলে দিতে পারে। সে অনলাইনে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারে, বিজ্ঞান ও গণিতের জটিল বিষয়গুলো ডিজিটাল উপকরণের সাহায্যে বুঝতে পারে, ভাষা শেখার সুযোগ পেতে পারে, প্রোগ্রামিংয়ের প্রাথমিক ধারণা অর্জন করতে পারে এবং নিজের আগ্রহ অনুযায়ী গবেষণা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে। যথাযথ দিকনির্দেশনা পেলে এই সুযোগ ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
 
তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—প্রযুক্তি কি কেবল পুরস্কার, নাকি শিক্ষার অপরিহার্য উপকরণ? বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তিকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলের স্বীকৃতি হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার সম্ভব হবে না। বরং মেধার স্বীকৃতির পাশাপাশি শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়ন এবং প্রযুক্তিতে সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উদ্যোগটিকে দেখতে হবে। কারণ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফল করা শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমন শিক্ষার্থীদেরও এগিয়ে নেওয়া জরুরি, যারা প্রতিকূল পরিবেশ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা মানসম্মত শিক্ষার সুযোগের অভাবে নিজেদের সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত করতে পারে না।
 
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের কথা জানানো হয়েছে, যা বিগত সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এই বরাদ্দ বৃদ্ধির তথ্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের পরিসর বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে বাজেটের অঙ্ক যত বড়ই হোক, তার সাফল্য নির্ধারিত হবে অর্থের কার্যকর ব্যবহার, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফলে তার প্রতিফলনের মাধ্যমে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে, যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হবে, শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পাবেন, বিদ্যালয়ে প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়বে এবং শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
 
সরকারের এই উদ্যোগের পাশাপাশি প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা ইএফটি ও আইবাস++ পদ্ধতিতে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ কর্মজীবনে যাঁরা শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলেছেন, তাঁদের অবসর-পরবর্তী পাওনা যথাসময়ে পরিশোধ করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি অর্থ পাঠানোর ফলে প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং মধ্যস্বত্বভোগী বা অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য পৃথক তালিকা তৈরির সুপারিশ মানবিক প্রশাসনের গুরুত্ব তুলে ধরে। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে শিক্ষার গুণগত মানে স্থায়ী পরিবর্তন আনা কঠিন। কারণ একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণশক্তি কেবল ভবন, পাঠ্যক্রম কিংবা প্রযুক্তি নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষক।
 
এখানেই বর্তমান উদ্যোগের সঙ্গে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সম্পর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে বছরব্যাপী মূল্যায়নের পাশাপাশি তিন বা ছয় মাস অন্তর শিখনফল মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময়ে কত নম্বর পেল, সেটিই শিক্ষার একমাত্র পরিমাপক হতে পারে না। বরং সারা বছর ধরে তারা কতটুকু শিখল, কোন বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে, কীভাবে সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান কতটা প্রয়োগ করতে পারছে—এসব বিষয়ও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
 
পাসের হার কিংবা সর্বোচ্চ গ্রেডের সংখ্যা দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারণ করা যায় না। একটি শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কতটা বুঝতে শিখছে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারছে কি না, নতুন সমস্যার সমাধান করতে পারছে কি না এবং অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজে লাগাতে পারছে কি না, তার ওপর। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা তুলনা করতে হলে গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা ও ডিজিটাল দক্ষতার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই মূল্যায়ন যেন কেবল দুর্বলতা শনাক্ত করার উপায় না হয়; বরং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উন্নতির পথ দেখানোর কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে।
 
এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার মতো দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রস্তাবও তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো দেশের শিক্ষানীতি হুবহু অনুকরণ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না; বরং নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কার্যকর দিকগুলো গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা, যার মৌলিক লক্ষ্য, মানদণ্ড ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে না। পাঠ্যক্রম, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার হতে হবে গবেষণা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে পারলেই একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে উঠবে।
 
শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সংসদীয় কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে শিক্ষা খাতের বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা, অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গবেষণার প্রস্তাবটিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কেন শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে, কেন কেউ কেউ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে, পরিবারের আর্থিক চাপ, শিক্ষার ব্যয়, বিদ্যালয়ের পরিবেশ কিংবা শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক—কোন বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে, তা তথ্যভিত্তিকভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সমস্যার কারণ না বুঝে শুধু কর্মসূচি ঘোষণা করলে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।
 
এখানে ল্যাপটপ বিতরণ কর্মসূচির বাস্তবায়নেও কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা দরকার। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা ও পরিচয় যাচাই করে একটি স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিক্ষার্থীরা যাতে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ল্যাপটপের মান, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকলে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য ল্যাপটপের ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়তে পারে। তাই প্রযুক্তি সরবরাহের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহার এবং শিক্ষামূলক কনটেন্টের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টিও যুক্ত করা প্রয়োজন।
 
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অনলাইন নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করতে হবে। প্রযুক্তি যেমন জ্ঞান অর্জনের অসীম সুযোগ তৈরি করে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ল্যাপটপ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী নির্দেশনা এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকলে কর্মসূচিটির সুফল আরও বাড়বে। সরকার চাইলে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত শিক্ষাসামগ্রী, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুশীলন, ভাষা শেখার উপকরণ এবং প্রাথমিক প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণের একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে।
 
এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মেধা ও সুযোগের সম্পর্ক। মেধা বিকাশের জন্য ব্যক্তিগত পরিশ্রম অপরিহার্য, কিন্তু সাফল্যের সুযোগ সবার জন্য সমান থাকে না। শহরের একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং প্রত্যন্ত এলাকার সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীর বাস্তবতা এক নয়। তাই মেধাবীদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আর্থিক সামর্থ্য কোনো শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার পথে স্থায়ী বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। মেধার স্বীকৃতি ও শিক্ষার সমান সুযোগ—এই দুইয়ের সমন্বয়ই একটি ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিচায়ক।
 
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সামনে আজ একদিকে বৈশ্বিক কর্মবাজার, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উচ্চশিক্ষার নতুন সম্ভাবনা; অন্যদিকে দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। সব শিক্ষার্থী একই পথে এগোবে না, একই পেশা বেছে নেবে না। কেউ গবেষক হবে, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ দক্ষ কারিগর হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেকের জন্য যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা। সে কারণে ল্যাপটপ বিতরণের উদ্যোগকে বৃহত্তর দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর জাতীয় গুরুত্ব আরও বাড়বে।
 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি শিক্ষাবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সর্বসম্মত ধন্যবাদ এই উদ্যোগের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে শিক্ষা এমন একটি জাতীয় ক্ষেত্র, যেখানে কোনো কর্মসূচির সাফল্য দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত। উদ্যোগটি কতটা স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হলো, কতজন শিক্ষার্থী কার্যকরভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেল, তাদের শেখার সক্ষমতায় কী পরিবর্তন এল এবং শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কতটা ফলপ্রসূ হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে সরকারের প্রতি জনআস্থা বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা কর্মসূচির পরিকল্পনাও আরও বাস্তবসম্মত হবে।
 
সবশেষে মনে রাখতে হবে, একটি ল্যাপটপ নিজে থেকে কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না; কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা, মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং অনুপ্রেরণামূলক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অসংখ্য সম্ভাবনার দরজা খোলার চাবি। একইভাবে বড় বাজেট নিজে থেকে শিক্ষার মান বাড়ায় না; তার সঙ্গে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন। সরকারের এই উদ্যোগ তাই আশার বার্তা বহন করলেও এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে বাস্তবায়নের সততা ও অর্জিত ফলাফলের মাধ্যমে।
 
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের প্রতিটি মেধাবী শিক্ষার্থীর চোখে যে স্বপ্ন, তা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বপ্ন নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে রাষ্ট্রের সহায়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার গভীর ও টেকসই সংস্কার। মেধার যথাযথ মূল্যায়ন, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, শিক্ষকদের মর্যাদা, সমান সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান অর্জনের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের উদ্ভাবক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ তাই একটি সম্ভাবনাময় সূচনা—যার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পরীক্ষায় সাফল্য উদ্যাপন নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা, মানবিকতা ও উদ্ভাবনী শক্তিতে সমৃদ্ধ একটি সোনালি ভবিষ্যৎ নির্মাণ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
 
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 
 

মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত