ছবি- যাযাদি বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া এই তিন সংকট শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎই ধ্বংস করে না, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর। শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি, সামাজিক অসচেতনতা ও দারিদ্র্যের কারণে এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে অসংখ্য শিশু। এই বাস্তবতায় বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও ঝরে পড়ার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল, অনুসন্ধানী ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজারের ইউনি রিসোর্ট হোটেলের সম্মেলন কক্ষে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ামুক্ত কক্সবাজার জেলা গঠনে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, ‘আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ’ এটি শুধু স্লোগান নয় একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বাস্তব সত্য। অথচ বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষাঝরে পড়ার মতো সামাজিক ব্যাধি শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব সমস্যা প্রতিরোধে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কক্সবাজার এরিয়া কো-অর্ডিনেশন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার রোনাল্ড প্রবীর চিসিম বলেন, ২০১৯ সাল থেকে শিশু অধিকার সুরক্ষা, বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া বন্ধে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, যুব ও শিশু-কিশোর-কিশোরী, স্থানীয় সংগঠন, সিবিও এবং সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্মশালায় সরকারের বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া-সংক্রান্ত বর্তমান ও পূর্ববর্তী পরিস্থিতি এবং এসব সমস্যা প্রতিরোধে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কার্যক্রম তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চাইল্ড সেইফটি নেট প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার সাগর ডি’কস্তা।
তিনি বলেন, শিশুদের অধিকার রক্ষায় শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
‘নারী ও শিশু বিষয়ক সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও বিবেচ্য বিষয়সমূহ’ শীর্ষক সেশন পরিচালনা করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ন্যাশনাল অফিসের ইন্টারনাল ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ম্যানেজার দেবাশীষ রঞ্জন সরকার।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে শিশুদের পরিচয়, ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য ও মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শিশুদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার কোনো বিকল্প নেই। একটি অসতর্ক প্রতিবেদন শিশুর জীবনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই শিশু অধিকারবিষয়ক সাংবাদিকতায় মানবিকতা, নৈতিকতা ও তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হবে।
‘সাংবাদিকতায় অনুসন্ধানমূলক দক্ষতা, কৌশল ও প্রাপ্ত ফলাফল কীভাবে উন্নত করা যায়’ শীর্ষক দিকনির্দেশনামূলক সেশন পরিচালনা করেন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম।
তিনি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, সাংবাদিকতার মূল শক্তি হচ্ছে অনুসন্ধান। শুধু ঘটনার তথ্য প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; ঘটনার নেপথ্যের কারণ, দায়, ভুক্তভোগীর বাস্তবতা এবং সমস্যার সমাধানের পথও খুঁজে বের করতে হবে। শিশু অধিকার নিয়ে সাংবাদিকদের আরও গভীরে গিয়ে তথ্য-উপাত্তনির্ভর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার আহ্বান জানান তিনি।
পরে উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মহসিন উল হাকিম। কর্মশালায় অংশ নেওয়া গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া প্রতিরোধে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সার্বিক সমন্বয় ও মডারেশন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উপজেলা কো-অর্ডিনেটর ছোটন বড়ুয়া এবং কমিউনিকেশনস স্পেশালিস্ট বিপ্লবী রানী দে রায়।
কর্মশালায় সাংবাকিদের জানানো হয়, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দরিদ্র পরিবারকে সুদমুক্ত ঋণ, আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ ও নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে মেয়ে শিশুদের মাসিক বৃত্তি, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে স্কুলভিত্তিক মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ এবং জীবনদক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।