ওসির অডিও ফাঁস : সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টে অপচেষ্টার নেপথ্যে কি?

আহসান হাবিব বরুন

মতামত

রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের পুলিশ বাহিনী। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই স্পর্শকাতর ও

2026-09-20T16:21:59+06:00
2026-09-20T16:21:59+06:00
রোববার ● ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
ওসির অডিও ফাঁস : সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টে অপচেষ্টার নেপথ্যে কি?
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২১ পিএম  
ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার হওয়া ওসি রাকিবুল হাসান।
রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের পুলিশ বাহিনী। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পেশাটিকে একশ্রেণির অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও স্বার্থান্বেষী মহল অর্থ উপার্জনের লাভজনক হাতিয়ারে পরিণত করেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি চাঞ্চল্যকর অডিও ফাঁস এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের প্রত্যাহারের ঘটনাটি পুলিশের নিয়োগ ও পদায়ন-বাণিজ্যের এক বিষাক্ত, ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী উপসর্গকে অত্যন্ত নগ্নভাবে জাতির সামনে উন্মোচিত করেছে।

ফাঁস হওয়া কথোপকথনে ডিএমপির একজন দায়িত্বশীল ওসির মুখে যে ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ, রাজনৈতিকভাবে চরম পক্ষপাতদুষ্ট এবং শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্য উঠে এসেছে, তা কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নৈতিক অবক্ষয় নয়; এটি আমাদের ভঙ্গুর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সংকেত। ওসির বক্তব্য থেকে এটি পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেই সরকারবিরোধী, চক্রান্তকারী ও পতিত স্বৈরাচারের দোসররা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বহাল তবিয়তে বসে থেকে কলকাঠি নাড়ছে।

আমি ইতিপূর্বেও বিভিন্ন নিবন্ধে এবং জাতীয় দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার কলামে বহুবার সতর্ক করে বলেছিলাম—পুলিশের নিয়োগ-বাণিজ্য এবং পদ বেচাকেনা যদি অবিলম্বে বন্ধ করা না যায়, তবে সরকারের ভাবমূর্তি যেকোনো মুহূর্তে এক মহাসঙ্কট ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। কারণ, অর্থ বা ঘুষের বিনিময়ে যারা গুরুত্বপূর্ণ থানায় বা পদে পদায়ন পায়, তারা কোনোদিন সরকারের ভাবমূর্তি, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ কিংবা সাধারণ জনগণের সেবার কথা চিন্তা করে না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে বদলির জন্য বিনিয়োগ করা কোটি কোটি টাকা সুদে-আসলে তুলে নেওয়া। ঘুষ দিয়ে পদ পাওয়া এসব কর্মকর্তা অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে মাসোহারা আদায় করতেই ব্যস্ত থাকে। তাদের মাথায় জনসেবা বা পেশাদারিত্ব নয়, থাকে শুধুই ‘আখের গোছানো’র বাণিজ্যিক সমীকরণ।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির ফাঁস হওয়া অডিওতে দেখা যায়, একজন ওসির পদায়নের পেছনে নাকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালকের মতো ব্যক্তিরাও সিন্ডিকেট তৈরি করে কোটি টাকা বাণিজ্য করছে! সেখানে বলা হয়েছে, কোনো এক কর্মকর্তাকে একটি বিশেষ কাজের সুযোগ করে দিয়ে এক কোটি টাকা নেওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যন্ত তাদের রয়েছে। এমনকি শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক চক্রান্ত, ক্ষমতার পালাবদল এবং পতিত স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে যে ধরনের আত্মবিশ্বাসী মনোভাব ওই ওসির গলায় প্রকাশিত হয়েছে, তা প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককে শঙ্কিত করার মতো। একজন ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার কথা বললে তিনি সেখানে প্ররোচনা দিয়ে বলছেন, “এই মাসেই চলে আসা উচিত, এই দুর্বল পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।”

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং আপত্তিকর বিষয়টি হলো—ওসি রাকিবুল হাসান যেসব কথাবার্তা বলেছেন, তাতে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে নির্লজ্জ ও নগ্ন অবস্থান নিয়ে চরম মিথ্যাচার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে নাকি ওসি বদলিতে কোনো টাকা লাগেনি! কিন্তু চরম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো—আওয়ামী লীগ আমলে প্রধান প্রধান মেট্রোপলিটন পুলিশে থানা ভেদে একজন ওসির পদায়নের জন্য ১ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতো। মোটকথা, কোটি টাকার নিচে কোনো ওসির পদায়ন হতোই না। এটিই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্য। অথচ ওসি রাকিবুল হাসান নির্লজ্জের মতো দাবি করেছেন, কোনো টাকাই নাকি লাগত না! এই একটি অসত্য তথ্যই প্রমাণ করে যে, তিনি মূলত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে ফ্যাসিবাদের বয়ান উৎপাদনের লক্ষ্যেই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই অডিও ফাঁস বা প্রচার করেছেন।

আমার বিশ্বাস, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই অডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। যেহেতু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বর্তমানে মাঠে বা রাজপথে নামতে পারছে না এবং ভারত থেকে শেখ হাসিনার নিকট ভবিষ্যতে দেশে ফিরে আসার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই, তাই মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা ও মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হিসেবেই হয়তো এই অডিওটি ছড়ানো হয়েছে। অডিওতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সময়ে নাকি বদলিতে টাকা লাগেনি; তার চেয়েও হাস্যকর এবং ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে—বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর গুম-খুনের দায়ে অভিযুক্ত এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের দায়ে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের পক্ষে নির্লজ্জের মতো সাফাই গেয়েছেন এই ষড়যন্ত্রকারী ওসি!

কিন্তু এই অডিওর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও স্পর্শকাতর দিকটি হলো সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক অপচেষ্টা। “রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল, এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না”—এমন বিষাক্ত উক্তি ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত চালানো হয়েছে।

তবে অন্যদিক থেকে বিবেচনা করলে, ওসি রাকিবুলের এসব কথাবার্তাকে এক ধরনের ‘পাগলের প্রলাপ’ বললেও ভুল হবে না। কারণ, শেখ হাসিনা তাঁর সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে নিজেই আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে ঘোর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, তিনি দেশে ফিরলে বহু মানুষের প্রাণহানি হতে পারে এবং তিনি কারও জীবনের জন্য হুমকি হতে চান না। সুতরাং, শেখ হাসিনা নিজের বক্তব্যের মাধ্যমেই এটি পানির মতো পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, তিনি আর দেশে ফিরছেন না। একজন সচেতন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি চোখ বুজে নিশ্চিত করে বলতে পারি—শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এসব কথাবার্তা শুধুই ফাঁকা বুলি ও রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি।

আমি আগেও বহুবার বলেছি যে, জুলাই অভ্যুত্থানে নির্বিচারে নারী-শিশু এবং ছাত্র-জনতাকে হত্যার পাশাপাশি ২০-২৫ হাজার মানুষকে পঙ্গু করে দিয়েছে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সুতরাং, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নতুন পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব ছাড়া আওয়ামী লীগের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনা কখনোই দেশে ফিরবেন না, কারণ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আর কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার পক্ষে নেই। এটি শেখ হাসিনার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। সম্প্রতি আমরা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক রূপান্তর দেখতে পাচ্ছি; যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছেন এবং তারেক রহমানের দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

এমন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ওসি রাকিবুল হাসানের মতো কিছু লোক সম্ভবত এখনো জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছেন। তারা একটি কল্পিত মায়াজালে বন্দী হয়ে আছেন। কারণ, শেখ হাসিনার জমানায় পুলিশ যে পরিমাণ অবারিত ও অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছে, দুহাতে দুর্নীতির টাকা কামিয়েছে—তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো সম্ভব কি না, সে বিষয়ে প্রবল সন্দেহ রয়েছে।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, ফ্যাসিবাদের আমলে পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রকাশ্যেই উচ্চবাচ্য করে বলেছিলেন, “মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ!” অর্থাৎ শেখ হাসিনা পুলিশকে যা ইচ্ছা তা-ই করার এক অপরিসীম লাইসেন্স বা অপক্ষমতা দিয়েছিলেন। তারা নিজেদের রাজার আসনে বসিয়েছিল; যাকে খুশি ধরে নিয়ে গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করত, কিংবা রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর জঘন্য নির্যাতন চালাত। আওয়ামী লীগ আমলের প্রত্যেক ওসি, এসপি এবং ডিএমপি/মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারদের সম্পদের হিসাব অবিলম্বে জাতির সামনে প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। দুদকের প্রধান কর্তব্য ও জাতীয় দায়িত্ব হওয়া উচিত ফ্যাসিবাদের আমলের পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান চালানো এবং তাদের অবৈধ ও জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ খুঁজে বের করে বাজেয়াপ্ত করা।

তার পুরো বক্তব্যটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এটিই স্পষ্ট হয় যে, এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি কথোপকথন ও গভীর চক্রান্তের অংশ। পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা যেভাবে পুলিশের ভেতর ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে এবং স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এই ওসির বক্তব্য তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

তবে এখানে আমি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, এই ওসির মতো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং সিভিল ও সামরিক কর্মকর্তা এখনো প্রশাসনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন। এটি কোনো মনগড়া কথা নয়; এদের অতীতের ট্র্যাক রেকর্ড ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, তারা স্বৈরাচারের কতটা বিশ্বস্ত দোসর ছিল। অথচ বর্তমান সরকার কেন চোখ বুজে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, তা এক বিশাল রহস্য!

যেখানে পুলিশ বাহিনীতে অপেক্ষাকৃত সৎ, যোগ্য ও পেশাদার কর্মকর্তাদের নানা অজুহাতে ছাঁটাই বা চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে, সেখানে এই ধরনের ফ্যাসিবাদের সরাসরি দোসররা কীভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে? যারা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, রাষ্ট্রের সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর তথ্য মুহূর্তের মধ্যে পাচার করে দিচ্ছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কথিত সাংবাদিক, ইউটিউবার এবং আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের কাছে—সেসব কর্মকর্তাকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এটি সরকারের জন্য যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এর আগেও আমি একাধিকবার নিবন্ধে এসব বিষয়ে সতর্ক করেছি, কিন্তু সরকার প্রশাসনিক সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযানে খুব একটা মনোযোগী বলে মনে হচ্ছে না। এখানে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, সরকারের ভেতরের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট টাকার বিনিময়ে সবকিছুকে ‘কুছ পরোয়া নেহি’ মনোভাব নিয়ে চেপে যাচ্ছে। ওসির পদায়নে ঘুষ লেনদেনের এই পুরো ব্যবস্থার পেছনের চালিকাশক্তি হলো সেই সিন্ডিকেট, আর রাকিবুল হাসানের ঘটনাটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অর্থাৎ, এই রাকিবুল হাসানদের যদি টাকার বিনিময়ে পদায়ন করা না হতো, তবে সেখানে একজন সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তা আসতে পারতেন—যিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের ও পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করতেন। কিন্তু টাকার বিনিময়ে সেখানে বসানো হয়েছে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সহচর ও ফ্যাসিবাদের দোসরকে।

রাকিবুল হাসান পুলিশের বেপরোয়া নিয়োগ ও পদায়ন-বাণিজ্যের এক ছোট্ট এবং প্রাথমিক উপসর্গ মাত্র। এরকম অনেক রাকিবুল হাসান এবং তার চেয়েও বহুগুণে গুরুত্বপূর্ণ পদে ও স্পর্শকাতর জায়গায় আরও বড় বড় ‘রাকিবুল হাসান’রা বসে আছে। সরকার যদি এখনই এই প্রশাসনিক ঝুঁকি ও ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার খেসারত সুদে-আসলে এবং চরম মূল্যে পরিশোধ করতে হবে—এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

ওসি পদটি প্রশাসনিক কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সাধারণ পদ হতে পারে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে একটি এলাকার আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর ও স্পর্শকাতর জায়গা। যেখানে একজন ওসি নিজেই বলছেন যে, প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ভেতর চক্রান্তকারীরা বসে আছে এবং তারা যেকোনো সময় পরিস্থিতি উল্টে দিতে পারে, সেখানে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। পুলিশে এই আর্থিক লেনদেন ও পদায়ন সিন্ডিকেটের কারণেই আজ দেশে কাঙ্ক্ষিত মানের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসছে না। সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে বিচার পাচ্ছে না, অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং প্রশাসন ভেতরের শত্রুদের চক্রান্তে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

সুতরাং, প্রশাসনে লুকিয়ে থাকা পতিত স্বৈরাচারের এসব দোসর ও সুবিধাভোগী চক্রকে এখনই চিহ্নিত করা অত্যাবশ্যক। সরকারের টিকে থাকা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য শুধু প্রকাশ্য শত্রুদের ওপর নজর রাখলেই চলবে না; বরং প্রশাসনের ভেতরের এসব সন্দেহভাজন কর্মকর্তার ডিজিটাল ট্র্যাকিং, মোবাইল যোগাযোগ ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটির ওপর কঠোর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। যারা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকিতে ফেলে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার যেকোনো অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে হলে কালক্ষেপণ না করে পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনে এক ব্যাপকভিত্তিক প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন থেকে আর্থিক লেনদেনের দুর্গন্ধময় সিন্ডিকেটকে চিরতরে উপড়ে ফেলে যোগ্য, সৎ, নীতিবান ও পেশাদার কর্মকর্তাদের উপযুক্ত স্থানে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। অন্যথায়, এই নিয়োগ-বাণিজ্যের বিষাক্ত উপসর্গ পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তার মূল স্তম্ভগুলোকে ভেতর থেকে পচিয়ে ধসের দিকে ঠেলে দেবে। শুধু পুলিশ বাহিনীই নয়, রাষ্ট্রের সর্বস্তর থেকে স্বৈরাচারের দোসর ও দুর্নীতিবাজদের বিতাড়িত করে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র ও জাতির সার্বিক নিরাপত্তার জন্য এই প্রশাসনিক সংস্কারই এখন একমাত্র পথ।

লেখক পরিচিতি : 

আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 

  বিষয়:   ওসি  মতামত  অডিও ফাঁস 


মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত