প্রতীকী ছবি চক্রাকার বা সার্কুলারিটিই হলো প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম, যাকে বলা হয় থিওরি অফ রিদম (Theory of Rhythm)। বীজ থেকে অঙ্কুর, সেই অঙ্কুর থেকে আলো-পানি-বাতাসের মাঝে ধীরে ধীরে একটি বিশাল বৃক্ষে রূপান্তর হওয়া, ফুল-ফল এবং পরিশেষে জীবনচক্রের সমাপ্তি; এরপর আবার নতুন বীজের জন্ম। এই একই চিত্র দেখা যায় পরমাণুর অভ্যন্তরে, দিন ও রাতের আবর্তনে, ঋতুর পরিবর্তনে এবং জীবন ও মৃত্যুর চক্রে। সামাজিক জীবনে গরিব মানুষেরা কঠোর পরিশ্রম করে ধীরে ধীরে ধনী হয়, আবার ধনীর সন্তান অলস হয়ে একসময় সব অর্থ-সম্পদ হারিয়ে ফেলে; এও একই চক্র। এটাই থিওরি অফ রিদম।
তবে থিওরি অফ পোলারিটি (Theory of Polarity) বলছে, জগতে সব কিছুরই দুটি দিক আছে; যা কিছুর সৃষ্টি আছে, তার শেষও রয়েছে। মহাবিশ্বের গঠন তত্ত্বে থিওরি অফ ওয়াননেস (Theory of Oneness) থেকে আমরা জানি, এই বিশ্বজগতের সবকিছু একই বৃহৎ পরিকল্পনার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ; সব কিছুই একটা বৃহৎ সিস্টেম বা গেইমের মাঝে বয়ে চলেছে; প্রকৃতির প্রবাহ, শক্তির বিচ্ছুরণ, চেতনার জগত, জড় বস্তু কিংবা জীবের জীবন চক্র সবই সেই সিস্টেমের ক্ষুদ্র ক্ষদ্র অংশ। কিন্তু জগতের এই সার্বজনীন সত্যটিকে যখন আমরা মানবসভ্যতার জন্ম, বিকাশ এবং সম্ভাব্য পরিণতির মডেল হিসেবে দেখি, তখন এক গভীর সংযোগ লক্ষ্য করা যায়।
আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯১৮ সালের দিকে জার্মান দার্শনিক অসভাল্ড স্পেংলার তাঁর লেখা বিখ্যাত বই ‘দ্য ডিক্লাইন অফ দ্য ওয়েস্ট’ গ্রন্থে বিশদভাবে লিখেছিলেন যে, মানবসভ্যতা মানুষের জীবনের মতোই চক্রাকারে আবর্তন করে; সভ্যতার জন্ম হয়, সভ্যতা বেড়ে ওঠে, সভ্যতা বুড়ো হয় এবং একসময় সভ্যতা মারা যায়। সভ্যতা আসলে সৃষ্টি হয় গ্রামীণ পরিবেশ থেকে যার মূলে থাকে মানুষদের পারস্পারিক বিশ্বাতবোধ থেকে সৃষ্টি হওয়া একতা; তারপর উন্নয়নের মধ্য দিয়ে সেটি শহরে পরিণত হয়; এরপর আরও উন্নত হয়ে সেটি সিটি এবং আরও বড় হয়ে সেটি মেগাসিটিতে রূপ নেয়। কিন্তু তারপর যেটি হয়, তা হল সভ্যতা আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ে। তিনি লিখেছেন, সভ্যতা যখন শুধু বড় বড় শহর, ইমারত আর বিলাসবহুল জিনিসপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখনই আসলে তার পতনের সময়। কিন্তু সেটি কীভাবে ঘটে, সেই বিশ্লেষণ নিয়ে এই নিবন্ধে আমরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সিস্টেম ডাইনামিকস মডেলের সাহায্যে আধুনিক সভ্যতার বর্তমান অবস্থান এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি বুঝতে চেষ্টা করব।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষক ডনেলা মিডোস এবং তাঁর সহযোগীরা ১৯৭২ সালে The Limits to Growth গবেষণায় বিশ্ব ব্যবস্থার একটি কম্পিউটার মডেল উপস্থাপন করেছিলেন। এই মডেলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, খাদ্য উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার কীভাবে একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। মডেলটি দেখিয়েছিল, যেকোনো জৈবিক ও সামাজিক সিস্টেমের একটি নির্দিষ্ট বিকাশ চক্র থাকে। সভ্যতার শৈশবে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকার কৌশল শেখে। এরপর আসে দ্রুত বিকাশের যুগ, যাকে উদ্ভিদের সাথে তুলনা করে বলা যায় যে, এটি পূর্ণ যৌবন বা শাখা-প্রশাখা বিস্তারের পর্যায়। এই মডেল অনুযায়ী তারা বলেছিলেন, আধুনিক শিল্পবিপ্লব এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার মাধ্যমে মানবসভ্যতা বর্তমানে ঠিক এমন পর্যায়েই অবস্থান করছে, যাকে ‘পিক ম্যাচিউরিটি’ বা সর্বোচ্চ পরিপক্কতার যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
আবার ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৫০-এর পরবর্তী সময়কালকে বলা হয় ‘গ্রেট অ্যাকসিলারেশন’-এর যুগ; কারণ এই সময়েই মানুষ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বৈশ্বিক যোগাযোগ, শক্তি উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক অভূতপূর্ব শিখরে পৌঁছেছিল। উদ্ভিদবিজ্ঞানের নিয়ম থেকে দেখা যায়, একটি গাছ যখন তার পূর্ণ বয়সে পৌঁছায়, তখন তার পুষ্টির চাহিদা হয় সর্বোচ্চ, এবং পরিবেশগত চাপ ও বার্ধক্যের লক্ষণগুলোও প্রকাশ পেতে শুরু করে। একইভাবে, আধুনিক সভ্যতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ জয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির চরম অবস্থানে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে এখন তীব্র মাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নিঃশেষকরণের মতো গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
The Limits to Growth গবেষণার ‘World3’ মডেলে এবং পরবর্তীতে ডাচ অর্থনীতিবিদ ও স্থায়িত্ব গবেষক গায়া হ্যারিংটন বাস্তব বিশ্বের একটি বড় তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছিলেন। হ্যারিংটন এর গবেষণায় দেখা যায় যে, মানব সমাজের বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং সেই World3 মডেলটির অনুমান করা পরিস্থিতির যথেষ্ট মিল রয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হলো, কোনো সিস্টেম যখন তার সীমাকে অতিক্রম করে, তখন পতন কিংবা রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী। অবশ্য সভ্যতার এই অন্তিম অবস্থা নিয়ে গবেষকদের মাঝে দুটি তত্ত্ব রয়েছে: প্রথমত, প্রকৃতির নিয়মে সেটি চক্র শেষ করে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়; দ্বিতীয়ত, থিওরি অফ রিদম অনুযায়ী সেটি আবার প্রথম থেকে শুরু করে।
তবে সভ্যতার সেরা দাবি করা আজকের এই মানুষ আসলেই আমরা সভ্যতার ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছি, তা বুঝতে হলে দেখতে হবে এর পতনের চিহ্নগুলোকে। আজ আমরা এমন এক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাঝে বসবাস করছি, যেখানে প্রতিদিন মানুষের সঙ্গে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্কগুলো দুর্বল হচ্ছে। প্রাকৃতিক বা গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাস, আস্থা ও পারস্পরিক সাহায্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শহর কেন্দ্রিক জীবনে আসলে বিশ্বাসের খুব একটা প্রয়োজন হয় না, কারণ শহুরে ব্যবস্থায় টাকা দিয়ে আপনি প্রায় সব ধরণের সার্ভিসই কিনতে পারেন। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার জন্য মানুষকে একে অপরের উপর নির্ভর করতেই হয়, তাই সেখানে বিশ্বাস ও আস্থার চর্চা স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে টিকে থাকে। কিন্তু আজ যেহেতু জগতের প্রায় সব রাষ্ট্রের প্রায় সব জনগোষ্ঠীই শহর জীবনের সার্ভিস পাওয়াতে অভ্যস্ত তাই এখন বিশ্বাস করা বা বিশ্বাস রক্ষা করার অভ্যাসকে কেউ আর গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুভব করছেন না। আজকের যুগে কাউকে বিশ্বাস করাকে বোকামি বলেই ভাবা হচ্ছে। অথচ মানবসভ্যতার মূল শক্তিই ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস বা রেসিপ্রসিটি; এই শক্তিতেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আমরা দেখছি আজকের এই সভ্যতা এখন এমন এক অবস্থায় যেন শস্যগাছ বীজ ধরার পর যেমন দ্রুত খড়কুটো হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়, ঠিক তেমনি মানুষেরাও আজ পারস্পরিক বিশ্বাস আর আস্থার প্রয়োজন পেরিয়ে এখন একাকী হওয়ার যুগে প্রবেশ করেছে।
এমনিতেই বিশ্বব্যাপী বেকারত্ব বাড়ছে বিগত কয়েক দশক ধরে। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাণিজ্যে রূপান্তরিত করায় পৃথিবীব্যাপী নানা রঙয়ের সার্টিফিকেটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু মানুষের প্রকৃত দক্ষতা বাড়ছে খুব কমই। এর সাথে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের অতিমাত্রা, যা কোটি কোটি শ্রমিককে বেকার করে দিয়ে চলেছে। এর স্পষ্ট ফলাফল হচ্ছে সহসায় গুটিকয়েক ধনী ব্যক্তির কাছে জগতের সব সম্পদ পুঞ্জীভূত হবে, আর বিলিয়ন বিলিয়ন ক্ষুধার্ত মানুষগুলো হয়তো পথে নামবে। হয়তো সেই আন্দোলন দমনে দেশে দেশে এআই চালিত রোবট ব্যবহার করা হবে, যার কাছে মুছে যাবে ন্যায়-অন্যায়, মমতা মানবিকতা ও বিশ্বাসের সব সীমা।
আবার জনসংখ্যার দিকটি বিবেচনা করলেও সভ্যতার পতনের চিহ্নটি বেশ স্পষ্ট। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, ইসরাইল ও আফ্রিকার কিছু দেশ ব্যতীত পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই জনসংখ্যা দ্রুত গতিতে কমতে শুরু করেছে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আজকের তরুণদের মাঝে পিতামাতা হওয়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ইতালি, গ্রিস ও রাশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোতে জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। এর অর্থ কী? মানুষ জগতের শ্রেষ্ঠ প্রাণী, আর আজ সেই শ্রেষ্ঠ প্রাণীটিই পৃথিবী থেকে কমে যাচ্ছে। ঠিক যেমন একটি সুঠাম দেহ তার পূর্ণ যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে উপনিত হওয়ার সময় শরীর পেশির কোষগুলো কমতে থাকে, পৃথিবীও তেমনি তার সেরা প্রাণীদের হারাচ্ছে।
তবে আধুনিক মানবসভ্যতার অর্থনীতির দিকে তাকালে আরও এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। সভ্যতার শুরুতে কঠোর পরিশ্রম করে মানুষ ফসল ফলাত, পণ্য উৎপাদন করত এবং এভাবেই সম্পদ অর্জন করত। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা এখন এমন এক অর্থব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে, যেখানে শেয়ারবাজার, জুয়া ও সুদের কারবার থেকে সহজ মুনাফা অর্জন করা সবচেয়ে সফল পেশা। এর অর্থ হলো, মানুষেরা উৎপাদনমুখী কাজ ছেড়ে ‘ইজি মানি’ বা সহজ উপার্জনের পেছনে ছুটছে। আজ বিশ্বের প্রায় ২৬০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ রয়েছে ব্যাংক আর শেয়ারবাজারে, অথচ মানুষের শ্রমের তৈরি মোট সম্পদ ১০০ থেকে ১২৫ ট্রিলিয়নের কাছাকাছি। ওয়াল স্ট্রিটের সদস্যরাই আজকের জগতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, তাই স্বাভাবিকভাবেই আজকের তরুণ ও শিশুরা তাদেরই অনুকরণ করতে চাইছে। এভাবেই ধীরে ধীরে আধুনিক মানুষ শারীরিক ও মানসিক ভাবে পরিশ্রম করার সামর্থ্য হারাচ্ছে; বিশ্ব অর্থনীতিতে বাস্তব উৎপাদন কমছে এবং ভার্চুয়াল অর্থের বুদ্বুদ আরও বড় হচ্ছে। কিন্তু বুদ্বুদ তো বুদ্বুদই, তাই সহসায় সেটি ফাটবে এবং নিশ্চিতভাবেই বিশ্ব অর্থনীতি হঠাত চুপসে যেতে বাধ্য হবে।
সময়কাল
মানব-সৃষ্ট বাস্তব সম্পদ (Produced Capital)
শেয়ার বাজার ও ব্যাংক (Financial Capital)
ফিন্যান্সিয়াল বনাম বাস্তব সম্পদের অনুপাত
১৯৮০
প্রায় ১৫ থেকে ২০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
প্রায় ১০ থেকে ১৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
১ : ০.৮ থেকে ১ : ১ (বাস্তব সম্পদ বেশি)
১৯৯০
প্রায় ২৫–৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
প্রায় ২৫–৩৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
১ : ১.১ (সমতার কাছাকাছি)
২০০০
প্রায় ৫০–৬০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
প্রায় ৬০–৮০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
১ : ১.৩ (ফাইন্যান্সিয়াল খাতের উত্থান)
২০১০
প্রায় ৮০–৯৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
প্রায় ১১০–১৩১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
১ : ১.৪৫ (ব্যবধান বৃদ্ধি)
২০২০
প্রায় ১০০–১২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
প্রায় ২৬০+ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার
১ : ২.২ (বিশাল ব্যবধান ও ভার্চুয়াল আর্থিক স্ফীতি)
তথ্যসুত্রঃ দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর The Changing Wealth of Nations প্রতিবেদনমালা
আর্থিক ব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ দিনে দিনে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। কিছু কিছু পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের অন্যায্য নীতি এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্বের জেরে ইউক্রেন, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইসরায়েল, সৌদি আরব, জর্ডান, রাশিয়া ও আমেরিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জডিয়ে পড়েছে। যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে আরও প্রায় ডজনখানেক দেশ। তাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া যেন কেবল ডিক্লারেশনের ব্যাপার। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যে প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো হবে না, সেটা সকলেই জানে; এটি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরম ও ধ্বংসাত্মক। তাৎক্ষণিকভাবে অধিকাংশ মেগা স্থাপনা ও মেগা সিটি ধ্বংস হয়ে যাবে, মুছে যাবে বহু জীববৈচিত্র্য এবং পৃথিবী হয়ত তার আদিম অবস্থায় ফিরে যাবে, যেখানে শত শত বছর ধরে ভয়ঙ্কর সব তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে থাকবে।
তাহলে, আমাদের সভ্যতা আসলে কোন ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলেছে?
এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে আমেরিকান বিজ্ঞানী জন ক্যালহুন ১৯৬৮ সালে ইঁদুরদের নিয়ে একটি অভিনব গবেষণা শুরু করেছিলেন। তিনি ইঁদুরদের জন্য একটি ‘স্বর্গরাজ্য’ বানিয়েছিলেন, যেখানে কোনো শিকারি বেড়ালের ভয় ছিল না, রোগের বালাই ছিল না এবং খাবার ও পানির কোনো কমতি ছিল না। পরীক্ষার শুরুতে সেখানে কেবল চার জোড়া সুস্থ ইঁদুর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। শুরুটা দারুণ ছিল; ইঁদুরগুলোর সংখ্যা তরতর করে বেড়ে প্রায় চারশোতে পৌঁছাল। কিন্তু এরপর সেই স্বর্গের ভেতর অদ্ভুত এক পরিবর্তন শুরু হলো। জায়গার কোনো অভাব না থাকলেও ইঁদুরগুলো সব সময় গাদাগাদি করে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ভিড় জমাতে লাগল। আর সেখান থেকেই শুরু হলো তাদের সামাজিক ব্যবস্থার পতন, যাকে ক্যালহুন নাম দিয়েছিলেন ‘বিহেভিয়ারাল সিংক’। এর ফলে ধীরে ধীরে পুরুষ ইঁদুরগুলো তাদের স্বাভাবিক নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলল। জন্ম নিল ‘দ্য বিউটিফুল ওয়ানস’ নামের একদল ইঁদুর, যারা লড়াই বা প্রজনন থেকে নিজেদের পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়ে শুধু নিজেদের শরীর পরিষ্কার করত ও খেত। তাদের শরীরে কোনো মারামারির ক্ষত না থাকলেও তাদের ভেতরের প্রাণশক্তি মরে গিয়েছিল। অন্যদিকে, বাকিরা হয়ে উঠল মাত্রাতিরিক্ত আক্রমণাত্মক। সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা গেল স্ত্রী ইঁদুরগুলোর মাঝে, যারা মাতৃত্বের মায়া সম্পূর্ণ ভুলে গেল এবং নিজেদের শাবকদের যত্ন নেওয়ার বদলে তাদের মেরে ফেলত বা ফেলে পালিয়ে যেত। এভাবেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সেই ইঁদুর সমাজ ধ্বংস হয়েছিল।
ক্যালহুন তাঁর জীবনের প্রায় ২০ বছর এই একই গবেষণা করেছিলেন এবং ইঁদুরগুলোর জন্য নানা রকম সেটআপ ব্যবহার করে গবেষণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিবারেই ইঁদুরগুলোর একই পরিণতি হয়েছিল। ক্যালহুন বিষয়টি গভীরভাবে বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন যে কেন তেমনটি বারবার ঘটছিল। শেষে তিনি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন; তিনি বললেন, ইঁদুররা আসলে আলফা মেল (Alpha Male) হওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছিল। খাবার, পানি, ঘর সবকিছুই তাদের ছিল, কিন্তু তারা চাইছিল শারীরিক সক্ষমতায় সেরা হওয়ার মর্যাদা। কিন্তু সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতা তো জিরো-সাম গেম (Zero-sum game), আর যেহেতু সেই ইঁদুরদের জন্য অন্য কোথাও গিয়ে সেরা হওয়ার মর্যাদা সৃষ্টির সুযোগ ছিল না, তাই তারা নিজেদের মধ্যেই আমৃত্যু যুদ্ধ করছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের এই মানবসভ্যতা ঠিক কোন আত্মবিনাশী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে? ধরুন, এই সভ্যতার সকল গরিব জনগোষ্ঠী একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল, টিকে থাকল কেবল ধনীর সন্তানেরা। তাহলেও কি শান্তি আসবে? না, সেটিও হবে না। ধনীর সন্তানেরা নিজেদের মধ্যেই সেরা হওয়ার মর্যাদা অর্জনের জন্য লড়াই শুরু করবে। সেই লড়াইটিও হবে জিরো-সাম গেম, এবং তারা লড়াই করবে তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?
দেখুন, জগতজুড়ে যত যুদ্ধ, যত প্রতিযোগিতা, যত অন্যায়, যত রক্তপাত, যত প্রতারণা, যত হিংসা—সব অপরাধের মূলে রয়েছে একটা সংকট, যার নাম মর্যাদার সংকট। মর্যাদাকে সংকট বলছি কেন? এর মূল কারণ মর্যাদার বস্তুবাদী ডেফিনেশন। আমাদের এই সভ্যতা যখন অর্থ, জমি, মূল্যবান ধাতু, সম্পদ, ক্ষমতা, পদবী এবং ব্যাংক ব্যালেন্সকে মর্যাদা বলে ডিফাইন করেছে, তখন সেই বস্তু, ক্ষমতা বা সম্পদের নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠেছে প্রতিটি মানুষের প্রাথমিক মোটিভেশন। সম্পদ সীমিত, কিন্তু চাহিদা অসীম; তাই অলঙ্ঘনীয়ভাবে যুদ্ধ আর হানাহানি হয়ে উঠেছে সব প্রতিযোগিতার একমাত্র ফলাফল।
এবার ভাবুন, যেহেতু মানুষেরা সকলেই মর্যাদা অর্জনের জন্য অনেক বেশি মোটিভেটেড থাকে তাই যদি এই মানব সভ্যতা বস্তুবাদের বাইরে গিয়ে মর্যাদা আর সম্মানকে বিশুদ্ধ সততা, দায়িত্বশীলতা আর সহমর্মী আচরণের যোগফল হিসেবে ডিফাইন করত, তবে আধুনিক সভ্যতার সকলেই প্রতিযোগিতা করত যে, কে কার চেয়ে বেশি সততার অধিকারী হবে; তারা প্রতিযোগিতা করত এই জন্য যে, কে হবে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ববান মানুষ এবং কে হবে সর্বাধিক সহমর্মী। মানুষেরা তখন নিজে ভোগ করার চেয়ে অন্যকে সাহায্য করতে পারলেই নিজেকে সবচেয়ে সুখি অনুভব করত। মানুষেরা সবচেয়ে মজবুত রেসিপ্রকাল সামাজিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করত। এবার ভাবুন, এমন হলে আজকের সভ্যতার চেহারা ঠিক কেমন হতো! হ্যাঁ, একথা সত্য যে হয়তো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনে আজকের মত এতখানি অগ্রগতি হতো না, কিন্তু সেই সভ্যতা হতো যুদ্ধমুক্ত, শঠতামুক্ত, সহমর্মী ও ভালোবাসাপূর্ণ প্রশান্তির এক জনপদ।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)