ছবি-যাযাদি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেছেন, ব্যবসায়ী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গ্যাসের চাপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস দেওয়ার পর এর সুফল পাওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে গ্যাসের চাপ বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বুধবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘করবী’ হলে আয়োজিত বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ এখন বিশ্বের একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতিও ইতিবাচক ধারায় যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমেছে এবং বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম কম বলেও জানান তিনি। সরকারের বিভিন্ন অর্জন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কক্সবাজারে ব্লু ইকোনমি নিয়ে গবেষণার জন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, মঙ্গলবার থেকেই গ্যাসের দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতেও এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাদবাগান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইনও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, রাষ্ট্রপরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। তারেক রহমানের দূরদর্শী, গতিশীল ও জনবান্ধব নেতৃত্বে অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে দেশ। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংস সংস্থা মুডিস-এর রেটিংয়ে বাংলাদেশেকে নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল অবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদা, বৈদেশিক বিনিয়োগ, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য এবং সর্বোপরি নারী ও যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপক অগ্রযাত্রা সাধিত হবে।
তিনি বলেন, এক মাস ধরে সরকারের যে বহুমুখী, কল্যাণমুখী কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে, তা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার সাফল্য নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ, মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ। প্রথাগত শাসনপদ্ধতির বেড়াজাল ভেঙে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া, আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দায়বদ্ধতা ও পরিকল্পনার পরিচয় দিয়েছেন, তা আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত হচ্ছে। তরুণ সমাজের ক্ষমতায়ন থেকে শুরু করে কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, যুগোপযোগী যোগাযোগ অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকার যে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে, তা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি শক্তিশালী ও কার্যকর পথযাত্রা।
তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি দেশের ২১টি প্রধান ব্যবসা ও শিল্প সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমের একাংশের সাথে মতবিনিময় করেছেন এবং সেখানে তিনি গ্যাস সরবরাহের সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, কাজেও তা দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করেন, তার কার্যকর নির্দেশনায় আজ আবারও প্রমাণিত। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার থেকেই গ্যাসের দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতেও এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে মূল্যস্ফীতিতে ইতিবাচক স্বস্তি ফিরেছে। বিবিএসের হিসাবে, খাদ্যপণ্যের দাম কমায় আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে গত বছরের চেয়ে এ বছর অনেক কম। মূল্যস্ফীতি কমার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে খাদ্যপণ্যের দাম। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের জোগান গতবছরের তুলনায় ভালো। আর বিশেষভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এবং আশেপাশের যেকোনও দেশের তুলনায় ডিজেল তেলের দাম বাংলাদেশে কম। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, যেন জনগণের ওপর চাপ না পড়ে।
তিনি আরও জানান, গত এক মাসে নির্বাচিত সরকার জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারে বহু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের এসব কল্যাণকর উদ্যোগ ও কার্যক্রমকে সাতটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর মধ্যে তারুণ্যের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবন, গণমানুষের সার্বিক কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়ন, নারীর অগ্রযাত্রা, সর্বজনীন কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীল শিল্পায়ন, আধুনিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো ও ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, জনকূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক।
তিনি বলেন, দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতায় ৫০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিলের মাধ্যমে দেশব্যাপী ‘উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি উদ্যোগ’ চালু, যার অধীনে প্রতি বছর ৫ হাজার সম্ভাবনাময় তরুণকে প্রারম্ভিক মূলধন সহায়তা প্রদান করা হবে। জামানত ছাড়াই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল চ্যানেলে সুদমুক্ত ‘ই লোন’ সুবিধা চালু, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত তরুণদের জন্য দেশব্যাপী অনলাইন স্টার্ট আপ তহবিলের উন্মুক্ত সুযোগ,তরুণ উদ্ভাবকদের বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে জাতীয় ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার’ আয়োজন।
সাইবার সুরক্ষায় দেশে ‘সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম’ এবং ‘জাতীয় আইসিটি ও সাইবার সিকিউরিটি রেটিং সিস্টেম’ কার্যক্রম শুরু। স্থানীয় কারখানায় সাশ্রয়ী আধুনিক স্মার্টফোন উৎপাদনে বিশেষ নীতিগত প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ। ৫ কোটি মানুষকে এই সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্যে কৃষিশ্রমিক, কৃষক ও রিকশাচালকসহ একদম প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ মানুষের জন্য স্মার্টফোনের কার্যকর মূল্য ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার প্রাথমিক লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে তরুণদের কর্মসংস্থান উপযোগী করতে ষষ্ঠ শ্রেণু থেকে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রমে নতুন দুটি করে মোট চারটি নতুন বই অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন। প্রায় ৪৫ লাখ মানুষকে বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা দিতে দেশব্যাপী আধুনিক ‘আলফা’ প্রকল্প গ্রহণ। কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, আন্তর্জাতিক সার্ভিস সেন্টার উদ্বোধন ও ৩টি প্ল্যাটফর্ম চালু। কক্সবাজারে সমুদ্রসম্পদ ও ব্লু ইকোনমি গবেষণায় বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। উচ্চশিক্ষার সুযোগে প্রতি বছর ৫০৯ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে শতভাগ সৌদি সরকারি শিক্ষাবৃত্তি প্রদান দ্বার উন্মোচন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার এসএসসি পরীক্ষার শীর্ষ মেধাবীদের স্বীকৃতি ও উপহার বিভিন্ন পর্যায়ের কৃতী ছাত্রীদের মেধার ভিত্তিতে সাইকেল প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত। কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিতে ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদে বিনামূল্যে সুষম দুপুরের খাবারের রূপরেখা প্রণয়ন। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে ঘোষিত ‘১৫ অনুশাসন’ বাস্তবায়ন এবং বছরব্যাপী খেলাধুলা ও সহশিক্ষা পরিচালনায় নির্দেশনা জারি। দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে। দেশের অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত সরকারি জলাশয় সংস্কার করে তরুণদের মধ্যে বরাদ্দের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ। অচল ৮ হাজার কোটি টাকার প্রযুক্তি পার্ক কার্যকর করতে শিল্প ও বাণিজ্যের সমন্বয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু।
উপস্থিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী,সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন— প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজন মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব আশরোফা ইমদাদ, নাজমুল হক খান ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার পামির এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ এন এম মনোয়ারুল কাদির (বিটু) প্রমুখ।️