শাহীন রাজা ‘পবিত্র কোরআনে অশ্লীল বাক্য, মন্দ কথা এবং গালিগালাজ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।’ অথচ রাজনীতির মঞ্চ থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সোশাল মিডিয়া সব জায়গায় একে অপরের বিরুদ্ধে অশ্লীল ভাষায় বাক্য ব্যয় করছে। বিশেষ করে ধর্মের কথা বলে রাজনীতি করছে তাদের মধ্যে এই প্রবণতা সব থেকে বেশি। বক্তৃতায়, শ্লোগানে এবং পোস্টার-ফেস্টুনে অশালীন সব বক্তব্য। অশ্লীল ভাষায় একে, অপরের বিরুদ্ধে বলার মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতি বিবস্ত্র হওয়ার পথে। এক দল আরেক দলের প্রতি শ্রদ্ধা বা সম্মান হারিয়ে প্রতিশোধ এবং জিঘাংসু হয়ে উঠছে। এক সময় পরমত সহিষ্ণুতা এমন এক পর্যায়ে পৌছাবে মতবিরোধ নিয়ে আলোচনার টেবিলে আর বসবে না। মারণাস্ত্র নিয়ে রাজপথে নেমে আসবে। কেননা গালিগালাজের পরের ধাপ হচ্ছে একে অপরকে শারীরিক আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করা।
কোরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আল্লাহ্ গোপনীয়তা পছন্দ করেন’। কিন্তু আজ এক জায়গায় পৌছেছি, একদম ব্যক্তিগত বিষয় জাতির সামনে নিয়ে আসছে। কিংবা অহেতুক তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আরেক দলের নেতার বিরুদ্ধে অশালীন আক্রমণ করছে। এ ধরনের বাক্য সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে বললেও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। এবং অপ্রীতিকর ঘটনা, ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
নতুন প্রজন্ম রাজনীতি বলতে গালিগালাজ ও আক্রমণাত্মক আচরণকে বোঝে। তারা ভুল শিক্ষা পায় এবং নৈতিক মূল্যবোধ হারায়। সুস্থ বিতর্ক বা যুক্তির জায়গা হারিয়ে ফেলে। নীতির রাজনীতি হারিয়ে যায়। দেশের উন্নয়ন বা সমস্যার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ বড় হয়ে দাড়ায়।
সোশাল মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় রাজনৈতিক গালিগালাজ সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধ্বংস করছে। এবং সমাজে হিংসাত্মক মনোভাবের পথে হাটবে। রাজনৈতিক নেতাদের মুখে অকথ্য ভাষা শুনলে কর্মীরাও উৎসাহিত হয়ে ওঠে। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়। রাজনৈতিক বিরোধ তখন ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নিতে শুরু করে। সামাজিক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। অনলাইন বা টিভির ভাষার লড়াই অনেক সময় রাজপথের সংঘর্ষে রূপ নেয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও রাগ দেখা দেয়। সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন প্রজন্ম রাজনীতি বলতে গালিগালাজ ও আক্রমণাত্মক আচরণকে বোঝে। তারা ভুল শিক্ষা পায় এবং নৈতিক মূল্যবোধ হারায়। সুস্থ বিতর্ক বা যুক্তির জায়গা হারিয়ে ফেলে। নীতির রাজনীতি হারিয়ে যায়। দেশের উন্নয়ন বা সমস্যার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ বড় হয়ে দাড়ায়। প্রার্থীরা তাদের কাজের হিসাব দেয়ার বদলে একে অপরকে ছোট করতে ব্যস্ত থাকেন। ফলে জনগণ আসল সমস্যাগুলোর সমাধান বঞ্চিত হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি টিভি চ্যানেলগুলোর টক শো এবং সোশাল মিডিয়ায় শুধুই বিদ্বেষ আর বিদ্বেষ দেখছি। টিভি চ্যানেলের টকশোতে, একদলের লোকেরা আরেক দলের চরিত্র হননের বক্তব্য ছাড়া আর কিছুই নেই! গঠনমূলক আলোচনা বা কথপোকথন নেই বললেই চলে। এই কথপোকথনের আগুন রাজপথের রাজনীতিতেও দেখা যায়। কথার মারণাস্ত্র সব সময়। এই অস্ত্র একদল, আরেক দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। এই অস্ত্রের প্রধান উপকরণ হচ্ছে, অশ্লীল শব্দের দুর্গন্ধ। ক্রমশই রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি দুর্গন্ধময় হয়ে উঠছে। শঙ্কিত আমরা, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মদের নিয়ে। আমরা তাদের জন্য কি এক সংস্কৃতি রেখে গেলাম। আজকে হয়-তো নয়। ১০-২০ বছর পরও হয়তো না। কিন্তু শতবর্ষ পর নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা এক ব্যর্থ সময় হিসেবে তিরস্কৃত হয়ে থাকব।
বিষয়টি নিয়ে স্নেহ ভাজন এক জন অনুজের কাছে জানতে চাইলাম। সে কোনো এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সংবাদ প্রধান। আমার কৌতূহল মেটাতে বলে, ‘ভাইজান মানুষ এগুলো দেখতে চায়। এতে অনুষ্ঠান বা টিভির ভিউ অনেক বেড়ে যায়। ভিউ বাড়লেই অর্থকড়ি আসে। ভিউ বাড়লে কর্তৃপক্ষও সন্তুষ্ট থাকে। কর্তৃপক্ষ পছন্দ করলে, আমাদের কি আর করার থাকে!’ অবাক হয়ে অনেকক্ষণ সতীর্থ অনুজের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিইবা করার আছে। প্রচার মাধ্যমের প্রধান কাজ হচ্ছে দেশ, জাতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিকে একটা নির্মল, সুন্দর জীবনের পথে নিয়ে যাওয়া। আর এখন ভিউ বাড়ার স্বার্থে, ব্যক্তিগত চরিত্র হননকে সমর্থন দিচ্ছে!
এই সব বিবেচনা করে সম্প্রতি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টকশোতে, গালিবাজ লোকদেরকেই আলোচক হিসেবে উপস্থিত করছে। যারা সুষ্ঠু আলোচনার পরিবর্তে বিদ্বেষ প্রকাশে পারদর্শী। আলোচনায় একে অপরের ভুল ত্রুটি মার্জিত ভাষায় তুলে ধরবে। এটাই গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। সমালোচনার ভাষা কঠিন হতে পারে। কিন্তু অশালীন আক্রমণ কেন। তা সংযত এবং মার্জিত ভাষায় বলা যায় না। প্রচার মাধ্যমে আলোচনা যেভাবে চলছে, তাতে দেখা যাবে এক সময় সমাজের সর্বস্তরের লোকদের কথোপকথন এমনটাই হয়ে উঠবে। কেননা পৃথিবীর সব দেশের সাধারণ লোকেরা প্রচার মাধ্যমের ভাষাকে অনুসরণ করে। আমাদের সমাজ কাঠামো অসিহষ্ণুতার আবর্তে আটকে যাবে। যা আমাদের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়।
সোশাল মিডিয়ার অবস্থা আরো ভয়ংকর। অস্তিত্বহীন কিছু লোক বিরোধী মতের লোকদের বাবা-মা, বোন, স্ত্রী এমনকি তাদের মেয়েদের নিয়েও যা তা বলে প্রচার করছে। রাজনৈতিক সমর্থকদের বাইরেও তাদের একটা পরিবার আছে। আছে সামাজিক সম্পর্ক। একটা রিলে অপপ্রচারের মধ্য দিয়ে লোকটিকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়া। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে আরেক পক্ষ পাশবিক আনন্দে উল্লাসিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত লোকটি যদি এর বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে সংঘর্ষ অনিবার্য। সোশাল মিডিয়ায় এক দলের গোপন সমর্থকরা যখন আরেক দলের নেতাদের বাবা-মার বিরুদ্ধে অশালীন আক্রমণ করেই চলছে। এই অশালীন আক্রমণকে আবার কিছু, কিছু রাজনৈতিক দলের নেতারা সমর্থন করছেন। এটা আরোও দুঃখজনক। এই সমর্থনের মধ্য দিয়ে সমাজ বা রাজনীতিতে একটা ম্যাসেজ দেয়া হয়। তোমরা যে কাজটি করেছ, তার প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। এতে নেতার আস্থাভাজন লাভে আরো অনেক সমর্থক একই কাজ করবে। পরবর্তীজন আরো নোংরা এবং অশালীন আক্রমণ করে বসবে। এর সর্বশেষ হচ্ছে, সংঘাত।
এমনও দেখা যাচ্ছে, যার কোনো নেই প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা। নেই সামাজিক অবস্থান। তারাও রাজনৈতিক কিংবা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত লোকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তাদের রয়েছে লক্ষ-কোটি সমর্থক। কিংবা নিজ রাজনৈতিক দলের আদর্শের প্রতি গভীর প্রেম। নেতার বিপক্ষে কথার প্রতিবাদ করতে সে কিন্তু নেতার হুকুমের অপেক্ষায় থাকবে না। স্ব-প্রণোদিত হয়ে মারমুখী হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং সব দলের নেতাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, এই সব অশালীন কর্মকাণ্ড থেকে আপনাদের দলীয় লোকদের নিবৃত্ত করেন। তা না হলে দেশ ও জাতি নৈরাজ্যের পথে চলতে শুরু করবে। এক সময় রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ থাকবে না। দেশে সুষ্ঠু রাজনীতির পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে নেমে যাবে। স্বাভাবিক রাজনীতির জায়গায় নৈরাজ্য এসে ভর করবে। তবে কোনো রাজনৈতিক দল যদি দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চায় সেটা আবার ভিন্ন বিষয়।
শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক।