ভারতের বিদ্যুৎ কূটনীতিতে বাংলাদেশের নতুন হিসাব : অসম সুবিধা থেকে ন্যায্য অংশীদারিত্ব

ড. মোঃ মিজানুর রহমান

মতামত

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; এটি ভূগোল, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের পারস্পরিক

2026-09-14T18:59:58+06:00
2026-09-14T18:59:58+06:00
বৃহস্পতিবার ● ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
ভারতের বিদ্যুৎ কূটনীতিতে বাংলাদেশের নতুন হিসাব : অসম সুবিধা থেকে ন্যায্য অংশীদারিত্ব
ড. মোঃ মিজানুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৯ পিএম  
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; এটি ভূগোল, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের পারস্পরিক নির্ভরতার একটি জটিল কাঠামো। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে এবং এর ফলে উভয় দেশই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ পেয়েছে, ভারতের বাজারে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে, যোগাযোগ ও বাণিজ্যের কিছু নতুন পথ উন্মুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বন্দর, সড়ক, রেলপথ, নদীপথ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যবহারের মাধ্যমে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মূল ভূখণ্ডের মধ্যে যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সহজ করার সুযোগ পেয়েছে।

সমস্যা সহযোগিতায় নয়; সমস্যা হচ্ছে সহযোগিতার অর্থনৈতিক মূল্য ও পারস্পরিক সুবিধার যথাযথ হিসাব কতটা করা হয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড, অবকাঠামো কিংবা কৌশলগত অবস্থান অন্য রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলে তার একটি অর্থনৈতিক মূল্য থাকে। সেই মূল্যকে রাজনৈতিক সৌজন্য, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব কিংবা প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের আড়ালে অদৃশ্য করে ফেলা দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের জন্যই ভালো নয়। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই ভারতকে কতটা সুবিধা দেওয়া হবে—এটি নয়; বরং ভারতকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ তার ন্যায্য সুবিধা কতটা নিশ্চিত করতে পারবে।

বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সম্ভাব্য নতুন কাঠামো এই প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই বিদ্যুৎ দেশের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বাস্তবতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যন্ত সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের মাধ্যমে, যা কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ হয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সম্ভাবনা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কাটিহার–পার্বতীপুর–বোরনগর ৭৬৫ কিলোভোল্ট সঞ্চালন সংযোগের পরিকল্পনা সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই অংশ।

এখানে বাংলাদেশের পার্বতীপুরের গুরুত্ব শুধু একটি সঞ্চালন কেন্দ্র হিসেবে নয়। এটি ভবিষ্যতে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল ভারতীয় বিদ্যুৎ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বাংলাদেশ বড় একটি সম্ভাবনা হারাবে। বরং এই অবকাঠামোকে যদি বহুদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ভিত্তিতে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভূগোল একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। ভারত নিজস্ব ভূখণ্ডের মধ্য দিয়েও বিকল্প সঞ্চালন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোন পথে কত ব্যয়, কত সময়, কত জমি, কত পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং কত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুবিধা যদি ভারতকে এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় দেয়, তাহলে সেই সাশ্রয়ের একটি ন্যায্য অংশ বাংলাদেশের পাওয়াই স্বাভাবিক।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পুরোনো কূটনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তন প্রয়োজন। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী সহযোগিতাকে রাজনৈতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে; এখন প্রয়োজন অর্থনৈতিক মূল্যায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। ট্রানজিটের ক্ষেত্রে শুধু রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলো কি না, সেটি যথেষ্ট নয়; প্রশ্ন হলো এর ফলে বাংলাদেশ কী আয় করল, কী অবকাঠামো পেল এবং দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল সৃষ্টি হলো। বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ পাওয়া গেল কি না, তা নয়; মূল্য, চুক্তির মেয়াদ, সঞ্চালন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং সরবরাহের নিশ্চয়তাও বিবেচনায় নিতে হবে।

এই অর্থনৈতিক হিসাবের অভাবই অনেক সময় ‘অসম সুবিধা’র ধারণা তৈরি করে। তবে বাংলাদেশ-ভারতের প্রতিটি চুক্তিকে অসম বলা যেমন সঠিক নয়, তেমনি প্রতিটি সহযোগিতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমান সুবিধার বলে ধরে নেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। একটি চুক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে দেখতে হবে উভয় পক্ষ কী দিয়েছে এবং কী পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদ ও বড় উন্নয়ন-চাহিদার দেশে ভূমি, পানি, বন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎ ও ভৌগোলিক অবস্থানের অর্থনৈতিক মূল্য যথাযথভাবে নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে এই মূল্যায়ন আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার। বিদেশি সঞ্চালন অবকাঠামো বাংলাদেশের জমি ব্যবহার করলে জমির সরাসরি মূল্য ছাড়াও কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি, পরিবেশগত প্রভাব, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগণের ওপর প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবহারের সুযোগমূল্য বিবেচনা করতে হবে। কোনো প্রকল্পের কারণে ভারত যদি নিজস্ব বিকল্প পথের তুলনায় সময় ও অর্থ সাশ্রয় করে, তাহলে সেই সুবিধারও একটি অংশ আলোচনায় আসা উচিত। শুধু জমির ক্ষতিপূরণ দিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধার পূর্ণ মূল্য পরিশোধ হয়েছে—এমন ধারণা যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পানি ও পরিবেশগত নিরাপত্তা। ব্রহ্মপুত্রসহ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো বাংলাদেশের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্প যদি উজানের পানি ব্যবস্থাপনা, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে তার সম্ভাব্য প্রভাব বাংলাদেশকে আগেই মূল্যায়ন করতে হবে। বিদ্যুৎ সহযোগিতা যেন ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থের অংশ।

এখানে একটি বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করার মাধ্যমে। নেপাল ইতোমধ্যে ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করেছে। এর তাৎপর্য অনেক গভীর। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে ভারতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা শুধু ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বিদ্যুৎ লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। ভুটানের জলবিদ্যুৎও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় উৎস হতে পারে।

বাংলাদেশের উচিত তাই ভারতীয় ভূখণ্ডকে শুধু একটি বাধা হিসেবে দেখা নয়, আবার ভারতের ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীলও না হওয়া। বরং ভারতকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের অপরিহার্য সঞ্চালন অংশীদার হিসেবে কাজে লাগিয়ে নেপাল ও ভুটানের বিদ্যুৎ বাংলাদেশের বাজারে আনার পথ তৈরি করা। এতে ভারত তার সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পাবে, নেপাল ও ভুটান তাদের জলবিদ্যুতের বাজার পাবে এবং বাংলাদেশ পাবে তুলনামূলকভাবে বহুমুখী বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ। এ ধরনের ব্যবস্থা তিন দেশের বা চার দেশের স্বার্থকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারে।

তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। নেপাল বা ভুটানের জলবিদ্যুৎ মানেই সস্তা বিদ্যুৎ—এমন সরল ধারণা গ্রহণ করা উচিত নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল্য, সঞ্চালন ব্যয়, ভারতের সঞ্চালন মাশুল, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, চুক্তির মেয়াদ, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ মূল্য সমন্বয়—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত যদি বাংলাদেশের প্রত্যাশিত কাঠামো গ্রহণ না করে, তবুও বাংলাদেশের উচিত সংঘাতের পথে না গিয়ে বিকল্প অর্থনৈতিক হিসাব সামনে রাখা। ভারতের নিজস্ব ভূখণ্ডে বিকল্প সঞ্চালনব্যবস্থা তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেই বিকল্প ব্যবস্থার ব্যয় ও সময় যদি বেশি হয়, তাহলে বাংলাদেশ তার ভূখণ্ড ব্যবহারের বিনিময়ে ন্যায্য সুবিধা দাবি করার শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। এই দর-কষাকষির শক্তি ব্যবহার করতে হবে তথ্য, প্রকল্প ব্যয়, বিকল্প পথের মূল্য এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। আবেগ দিয়ে নয়, হিসাব দিয়ে কূটনীতি পরিচালনা করাই হবে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

একই কারণে কোনো প্রকল্প বাতিল করাই বাংলাদেশের সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ কী পাবে এবং বাস্তবায়িত না হলে কী হারাবে—দুই দিকের হিসাবই করতে হবে। প্রকল্প বাতিল হলে ভারত বিকল্প পথে বিনিয়োগ করবে; বাংলাদেশ সম্ভাব্য মাশুল, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সুযোগ হারাতে পারে। আবার প্রকল্পের শর্ত বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী হলে তা মেনে নেওয়াও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। সুতরাং সঠিক পথ হলো প্রকল্পকে এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা, যেখানে উভয় পক্ষের লাভ স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য হয়।

এখানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কূটনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। এতদিন আলোচনার বড় অংশ ছিল কীভাবে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো যায়। এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে কম ঝুঁকিতে, প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে, বহুমুখী উৎস থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে শুধু বিদ্যুতের ক্রেতা নয়, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার হতে হবে।

এই পরিবর্তন কোনোভাবেই ভারতবিরোধী নীতি নয়। বরং প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো পারস্পরিক স্বার্থ। ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়; একইভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নও ভারতের জন্য হুমকি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু সহযোগিতা তখনই টেকসই হয়, যখন উভয় পক্ষ মনে করে তারা ন্যায্যভাবে লাভবান হচ্ছে। এক পক্ষের কৌশলগত সুবিধাকে অন্য পক্ষের স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করলে সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য থাকে না।

বাংলাদেশের সামনে এখন সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য, নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ, ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের বিশাল বিদ্যুৎ বাজার—এসবকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন জ্বালানি সহযোগিতার মডেল তৈরি হতে পারে। এতে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সহজ করতে পারবে, নেপাল ও ভুটান তাদের বিদ্যুতের বাজার সম্প্রসারণ করতে পারবে এবং বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের নীতিগত করণীয়ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। প্রথমত, ভারত বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত চুক্তির আগে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা দরকার। একটি প্রকল্পে বাংলাদেশের জমি, পরিবেশ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার ওপর কী মূল্য আরোপিত হচ্ছে এবং তার বিপরীতে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে—তার স্বচ্ছ হিসাব থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভূখণ্ড ব্যবহারের জন্য শুধু এককালীন ক্ষতিপূরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও সুযোগমূল্য বিবেচনায় ন্যায্য মাশুলের কাঠামো তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে ভারতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ নিয়মিত ও প্রতিযোগিতামূলক হয়। চতুর্থত, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে পানি, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষায় বাধ্যতামূলক প্রভাব মূল্যায়ন এবং কার্যকর ক্ষতিপূরণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সমন্বয়ে একটি বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশকে একটি স্থায়ী ও পেশাদার আন্তঃমন্ত্রণালয়ভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বিদ্যুৎ, পররাষ্ট্র, অর্থ, বাণিজ্য, পানি ও পরিবেশ—সব সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করবেন। প্রতিটি বড় আন্তঃদেশীয় প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি, বিকল্প পথ এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির তুলনামূলক হিসাব প্রস্তুত করা উচিত। এতে সরকার পরিবর্তন হলেও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

অতএব বাংলাদেশের নতুন হিসাবটি হওয়া উচিত খুব পরিষ্কার। প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করা হবে, কিন্তু বিনিময়হীনভাবে নয়; বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে, কিন্তু তার যথাযথ অর্থনৈতিক মূল্য নিশ্চিত করে; আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যে অংশ নেওয়া হবে, কিন্তু স্বচ্ছ মূল্য ও ঝুঁকি বণ্টনের ভিত্তিতে; ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে রাখা হবে, কিন্তু একক নির্ভরতার জায়গায় নয়।

বাংলাদেশের ভূগোল কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। সেই সম্পদের মূল্য যদি বাংলাদেশ নিজেই বুঝতে না পারে, অন্য কেউ এসে তার পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করে দেবে না। ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সাফল্য তাই নির্ভর করবে কত দ্রুত বাংলাদেশ ‘সুবিধা দেওয়ার’ মানসিকতা থেকে ‘পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করার’ কূটনীতিতে যেতে পারে তার ওপর। ভবিষ্যতের সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুত্বপূর্ণ, বাস্তববাদী এবং স্বার্থভিত্তিক—যেখানে ভারতের উন্নয়ন যেমন এগিয়ে যাবে, তেমনি বাংলাদেশের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে। তখনই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি প্রকল্প কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প না থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ন্যায্য ও পারস্পরিক নির্ভরতার নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখকঃ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
 

মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত