অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম“প্রতিটি হৃদস্পন্দনের পেছনে একটি গল্প, প্রতিটি গল্পের পেছনে সময়ের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ।”
কেউ এই সংখ্যাটিকে দেখবেন শুধু ৩০০ হিসেবে।
কিন্তু আমি যখন এই সংখ্যাটির দিকে তাকাই, তখন আমি দেখি—৩০০টি মুখ, ৩০০টি পরিবার, ৩০০টি উৎকণ্ঠাভরা রাত, ৩০০টি অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা এবং ৩০০টি মানুষের জীবন ফিরে পাওয়ার আশা।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫—শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্নের যাত্রা। স্বপ্নটি খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু দায়িত্বটি ছিল অসাধারণ—হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত একজন মানুষ যেন শুধু সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে পৃথিবী থেকে বিদায় না নেন।
সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল সময়ের বিরুদ্ধে আমাদের নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ।
রাত ২টার ফোন।
ভোর ৪টার অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন।
ইফতারের ঠিক আগে হাসপাতালের উদ্দেশে ছুটে যাওয়া।
তারাবির নামাজের মাঝপথে জরুরি ফোন পেয়ে ক্যাথল্যাবে পৌঁছে যাওয়া।
সেহরির সময় রোগীর খবর পাওয়া।
ঈদের নামাজের আগেই হাসপাতালের পথে যাত্রা।
শীতের কুয়াশাভেজা ভোরে ফজরের আজানের আগেই টিম নিয়ে জীবন বাঁচানোর প্রস্তুতি।
পরিবারের সঙ্গে অসমাপ্ত রাতের খাবার।
আর সন্তানের নিষ্পাপ প্রশ্ন—
“আবার হাসপাতালে যাচ্ছ?”
এসব ধীরে ধীরে আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
কারণ কোনো কোনো মুহূর্তে একজন চিকিৎসকের পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি পরিচয়—
একজন মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব।
ক্যাথল্যাবের দরজা খুলেছে অসংখ্যবার। মনিটরের অবিরাম বিপ-বিপ শব্দ, অ্যাঞ্জিওগ্রামের পর্দায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি করোনারি ধমনী, উদ্বিগ্ন স্বজনদের অপেক্ষা—তারপর দক্ষ ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় সেই ধমনীর ভেতর আবার রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার মুহূর্ত।
সেই মুহূর্তে মনে হয়, মৃত্যুর অন্ধকার ভেদ করে জীবনের আলো আবার ফিরে আসছে।
প্রতিবার সফল ইন্টারভেনশনের পর যখন রোগীর রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়, বুকের ব্যথা কমে আসে, মনিটরে হৃদয়ের ছন্দ স্থিতিশীল হতে থাকে—তখন মনে হয়, আজও হয়তো একটি শিশু তার বাবাকে ফিরে পাবে; একজন মা তাঁর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন; একজন স্ত্রী তাঁর জীবনসঙ্গীকে আবার ঘরে নিয়ে যেতে পারবেন; কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মা তাঁদের সন্তানের মুখটি আরেকবার দেখতে পাবেন।
একজন চিকিৎসকের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?
অনেক রোগী এসেছেন জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে। কারও রক্তচাপ ছিল বিপজ্জনকভাবে কম, কারও হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত, কেউ ছিলেন কার্ডিওজেনিক শকে, কেউ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর ফিরে এসেছেন জীবনের কিনারা থেকে।
সেসব মুহূর্তে চিকিৎসক কখনো একা থাকেন না।
সেখানে কাজ করে একটি স্বপ্ন।
একটি নিবেদিত টিম।
একটি প্রতিষ্ঠানের আস্থা।
একটি পরিবারের প্রার্থনা।
আর সর্বোপরি মহান আল্লাহর অশেষ রহমত।
আজ, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ২টা ৩০ মিনিটে, পপুলার কার্ডিয়াক সেন্টার, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমাদের ৩০০তম প্রাইমারি পিসিআই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে আজ পর্যন্ত এই যাত্রাপথে আমরা শুধু ৩০০টি প্রাইমারি পিসিআই সম্পন্ন করিনি।
আমরা ৩০০টি পরিবারের কান্নার পাশে দাঁড়িয়েছি।
৩০০টি প্রার্থনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।
৩০০টি হৃদয়কে সময়ের সঙ্গে লড়াই করার সুযোগ দিয়েছি।
৩০০টি অসমাপ্ত স্বপ্নকে আবার এগিয়ে চলার সম্ভাবনা তৈরি করেছি।
এই ৩০০টি সফল প্রাইমারি পিসিআই আমাকে নতুন করে জীবনকে চিনতে শিখিয়েছে।
শিখিয়েছে—জীবন কতটা অনিশ্চিত।
শিখিয়েছে—প্রতিটি মিনিট কতটা অমূল্য।
শিখিয়েছে—দ্রুত সিদ্ধান্ত, দক্ষ হাত এবং একটি সমন্বিত টিম কখনো কখনো একটি পুরো পরিবারকে চিরদিনের কান্না থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।
অনেক সময় এমন রোগী এসেছে, যাঁকে দেখে মনে হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব সম্ভাবনাই যেন শেষ সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সফল ইন্টারভেনশনের পর যখন সেই মানুষটি নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছেন, হাসিমুখে বলেছেন—“ধন্যবাদ ডাক্তার”—তখন আবার উপলব্ধি করেছি—
আমরা শুধু চেষ্টা করি। জীবন ফিরিয়ে দেন একমাত্র আল্লাহ।
এই ৩০০টি সফল প্রাইমারি পিসিআই কোনো সংখ্যা নয়।
এটি ৩০০টি পরিবারের হাসি।
এটি ৩০০টি মায়ের দোয়া।
এটি ৩০০টি সন্তানের স্বস্তির নিঃশ্বাস।
এটি ৩০০টি অসমাপ্ত স্বপ্নের নতুন সূচনা।
এটি ৩০০টি মানুষের দ্বিতীয় জীবনের গল্প।
এই অর্জন কখনোই একজন মানুষের একার নয়।
এটি আমাদের ক্যাথল্যাব টিমের।
এটি সিসিইউ টিমের।
এটি জরুরি বিভাগের।
এটি নার্স, টেকনোলজিস্ট, কাস্টমার কেয়ার ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের।
এটি পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিটি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কর্মীর ভালোবাসা, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের ফল।
পপুলার পরিবারের কর্ণধার, সম্মানিত এমডি ও সিইও ডা. মুস্তাফিজুর রহমান স্যারের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মরহুম পরিচালক অধ্যাপক ডা. শরফুজ্জামান রুবেল স্যারকে। কৃতজ্ঞতা জানাই হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ইফতেখার ইবনে মান্নান, উপপরিচালক ডা. ইশতিয়াক সাজ্জাদুর রহমান, ডা. মো. আরিফ ইমরান রেজাসহ হাসপাতাল প্রশাসনের সকলকে।
আমার সকল সহকর্মী বিশেষ করে নিবেদিতপ্রান কনসালটেন্ট ও ইনচার্জ বৃন্দ এবং এসএমও , আরএমও , ক্যাথল্যাব ইনচার্জ, নার্স ইনচার্জ সহ সিসিইউ ও কার্ডিয়াক টিমের প্রতিটি সদস্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
আর সেই সব রোগী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যাঁরা তাঁদের জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন।
আমার স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতিও রইল গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। তাঁদের ত্যাগ, ধৈর্য ও সমর্থন ছাড়া এই পথচলা সম্ভব হতো না।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আমার হৃদয়ের গভীর থেকে অসীম কৃতজ্ঞতা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি, তাঁর অশেষ রহমত, অনুগ্রহ ও দয়া ছাড়া একটি হৃদস্পন্দনও ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
৩০০টি সফল প্রাইমারি পিসিআই কোনো সমাপ্তি নয়।
এটি একটি নতুন অঙ্গীকার।
যতদিন আল্লাহ আমাদের সামর্থ্য দেবেন, ততদিন সময়ের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চলবে।
যতদিন কোনো হৃদয় থেমে যাওয়ার আগে সাহায্যের আবেদন জানাবে, ততদিন আমরা ছুটে যাব।
যতদিন মানুষের বিশ্বাস থাকবে, ততদিন আমাদের দায়িত্বও থাকবে।
কারণ প্রতিটি হৃদস্পন্দন অমূল্য।
প্রতিটি জীবন মহান আল্লাহর অর্পিত একটি আমানত।
আলহামদুলিল্লাহ- ৩০০টি সফল প্রাইমারি পিসিআই—৩০০টি নতুন জীবন
@পপুলার কার্ডিয়াক সেন্টার- বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র ২৪/৭ প্রাইমারি পিসিআই এবং সকল প্রকার কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশন সেন্টার
@Primary PCI - The gold standard treatment for Acute STEMI
Every Minute Counts
Time is Muscle — Save Time, Save Life.
—অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি)
বিভাগীয় প্রধান—কার্ডিওলজি
পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল