আমীরুল ইসলামপ্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক ,ছড়াকার ,সাংবাদিক টিভি অনুষ্ঠান নির্মাতা ,কিংবা নির্মাতাদের নির্মাতা আমীরুল ইসলাম আর নেই—কথাটা লিখতে বসেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। চ্যানেল আইতে তাঁর রুম ছিল আমার রুমের ঠিক সামনে। এতদিন অফিসে এসে ওই রুমটার দিকে তাকালে মনে হতো, মানুষটা আছেন। কোনো না কোনো শব্দ আসছে, কাউকে ডাকছেন, কারও সঙ্গে কথা বলছেন, হেসে উঠছেন, হয়তো কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত আছেন। এখন রুমটা আছে, দরজাটা আছে, চেয়ার-টেবিল আছে, কিন্তু মানুষটা নেই। এই শূন্যতাটা খুব অদ্ভুত।
অনেক দিন ধরেই আমীরুল ভাই অসুস্থ ছিলেন। একের পর এক শারীরিক সমস্যা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। কিডনির জটিলতা ছিল, চিকিৎসা চলেছে, ডায়ালাইসিস নিতে হয়েছে। পরে চোখের দেখাও প্রায় চলে গেল। একজন লেখকের জন্য, একজন পাঠকের জন্য, একজন অনুষ্ঠানকর্মীর জন্য চোখের আলো হারিয়ে ফেলা কত বড় আঘাত, সেটা বলে বোঝানোর দরকার নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—অসুস্থতা তাঁকে ধীর করেছে, থামাতে পারেনি।
আমীরুল ইসলাম ছিলেন এমনই একজন মানুষ।
তাঁর নিজের লেখা একটা কথা আজ খুব মনে পড়ছে। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিজের ফেসবুক পাতায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, পরিচিতজনেরা শুনে ‘উহু আহা’ করেন, তিনি বুঝতে পারেন ওরা হয়তো ভাবে, ‘ব্যাটা মরে না কেন?’ তারপর লিখেছিলেন, ‘আমি মরতে মরতে বেঁচে উঠি।’ আবার কিছুদিন দেশ-জাতি-জনগণকে জ্বালাতন করেন। অসুস্থতা, হাসপাতাল, এমনকি মৃত্যুর সম্ভাবনাকেও তিনি এমন রসিকতার মধ্যে নিয়ে আসতে পারতেন। তাঁর এই লেখাটা এখন পড়লে বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভার হয়ে আসে।
কারণ এই কথার মধ্যেই যেন তাঁর পুরো মানুষটাকে পাওয়া যায়।
তিনি অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু অসুস্থ মানুষ হয়ে থাকতে চাননি। চোখে দেখতে পারতেন না, কিন্তু নিজের চারপাশের পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। শরীর বারবার তাঁকে থামাতে চেয়েছে, তিনি বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর প্রাণোচ্ছ্বাস ছিল অদ্ভুত শক্তিশালী। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেই প্রাণোচ্ছ্বাস নিয়েই বেঁচে ছিলেন।
আমীরুল ইসলাম এর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তাই শুধু কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক ছিল না। তিনি আমার অগ্রজ। সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে তিনি আমার অনেক আগে থেকে পথ চলেছেন। আবার একই সঙ্গে তিনি ছিলেন আমার সহকর্মী।
কিংবা আমি ছিলাম তার প্রতিদিনের কর্মজীবনে পাশাপাশি থাকা মানুষ।
ফলে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরে যে আমীরুল ইসলামকে আমি দেখেছি, সেই মানুষটিই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে।
তিনি ছিলেন অসম্ভব প্রাণবন্ত।
কিছু মানুষ আছেন, তাঁরা কোনো জায়গায় ঢুকলেই জায়গাটা বদলে যায়। আমীরুল ইসলাম ছিলেন সেই ধরনের মানুষ। তাঁর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বললেও বোঝা যেত, মানুষটি কেবল একটি বিষয়ে আটকে নেই। সাহিত্য থেকে ইতিহাস, ইতিহাস থেকে মানুষ, মানুষ থেকে রাজনীতি, রাজনীতি থেকে আবার কোনো ছড়া—আলোচনা কোথায় গিয়ে থামবে, তার ঠিক ছিল না। তাঁর রসবোধ ছিল তীক্ষ্ণ। আড্ডা ছিল তাঁর স্বভাব। মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া ছিল তাঁর সহজাত ক্ষমতা।
প্রকাশিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণে তাঁর এই দিকটাই সবচেয়ে বেশি ফিরে এসেছে। কেউ তাঁকে বলেছেন আড্ডাবাজ, কেউ জীবনরসিক, কেউ ভোজনপ্রিয়, কেউ বলেছেন মানুষের প্রতি অদ্ভুত টান ছিল তাঁর। ধ্রুব এষ লিখেছেন, আমীরুল ইসলাম ছিলেন ‘বিশ্বভরা-প্রাণ’ মানুষ; তাঁর চলে যাওয়াকে মনে হয়েছে তুমুল হইহল্লা আর হাসির হররা থেমে যাওয়া। এমন স্মৃতি খুব সহজে তৈরি হয় না।
আরেকটি জায়গায় আমীরুল ইসলাম কে বুঝতে হলে আমাদের শিশু-কিশোরদের জগতে ফিরে যেতে হয়।
কচিকাঁচার আসর, খেলাঘর, চাঁদের হাট—বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে সমৃদ্ধ ধারাটি বহু দশক ধরে তৈরি হয়েছে, আমীরুল ইসলাম ছিলেন সেই বৃহৎ পরিসরেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তাঁর নিজের প্রজন্মের অনেক লেখক-ছড়াকারই এই সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে উঠে এসেছেন। তিনি শিশুদের জন্য শুধু লিখে থেমে থাকেননি; তাদের সাহিত্য, পাঠাভ্যাস, কল্পনা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোর-তরুণদের মাসিক ‘আসন্ন’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা ছিল। প্রায় ১০ বছর তিনি এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার কিশোরদের পাতা সম্পাদনা করেছেন পাঁচ বছর। অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা এবং তাঁদের পাঠের জগৎ তৈরি—দুটো কাজই তিনি সমান গুরুত্ব দিয়ে করেছেন।
এই জায়গাটাই আমীরুল ইসলাম কে আলাদা করে।
তিনি শিশুদের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতেন না। শিশুদের পাশে বসে কথা বলতেন। তাঁর ছড়ায় তাই সহজ আনন্দের সঙ্গে কৌতূহল আছে, দুষ্টুমি আছে, আবার চারপাশের পৃথিবীকে দেখার চোখও আছে। বিজ্ঞান, গণিত, ভ্রমণ, জীবনী, ইতিহাস, খেলাধুলা—কত বিচিত্র বিষয়ে তিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন! তাঁর লেখার জগৎ ছিল একেবারেই বহুমাত্রিক। প্রকাশিত লেখাগুলোতে তাঁর বইয়ের সংখ্যা তিন শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘খামখেয়ালি’ ছিল তাঁর প্রথম বই। সেই বইয়ের জন্যই অল্প বয়সে তিনি অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান এবং লেখকগণ পরে একই পুরস্কার আরও কয়েকবার অর্জন করেন। ২০০৬ সালে শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। বাংলা একাডেমির তালিকাতেও তাঁর সেই স্বীকৃতি নথিভুক্ত আছে। ([Adorn Books][3])
কিন্তু আমীরুল ইসলাম কে পুরস্কারের তালিকা দিয়ে বোঝা যাবে না।
কারণ তিনি ছিলেন অগ্রজ। আর অগ্রজ হিসেবে তাঁর একটা আলাদা উদারতা ছিল। অনেক তরুণ লেখকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। নতুন কেউ লিখছে—সে খবর তাঁর কাছে পৌঁছালে তিনি আগ্রহী হতেন। উৎসাহ দিতেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করা কিংবা তাঁর সংস্পর্শে আসা অনেকেই পরে স্মৃতিচারণে সেই কথাই বলেছেন—আমীরুল ভাই মানুষকে কাছে টানতেন। তিনি নিজের চারপাশে দেয়াল তুলতেন না।
চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। অনুষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বে থেকে তিনি শুধু প্রশাসনিক কাজ করেননি; অনুষ্ঠান ভাবনা, নির্মাণ, সাংস্কৃতিক আয়োজন—সবকিছুর সঙ্গেই তাঁর একটা সৃজনশীল সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে তাঁকে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমি তাঁর সেই দিকটা খুব কাছ থেকে দেখেছি।
কাজের সময় তিনি কাজ নিয়ে সিরিয়াস ছিলেন। কিন্তু মানুষকে কখনো কাজের ফাইলে আটকে রাখেননি। অফিসের বাইরে সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানুষ, বই—সবই তাঁর আলাপের বিষয়। তাঁর রুমে কে ঢুকছে, কে বের হচ্ছে, সেটা দিয়ে বোঝা যেত তাঁর পরিসর কত বড়। একজন লেখক যেমন আসছেন, তেমনি একজন তরুণ সাংবাদিক; একজন শিল্পী যেমন, তেমনি কোনো অনুষ্ঠানের কর্মী।
তাঁর ভেতরে একটা সহজ মানবিকতা ছিল।
আমীরুল ভাইয়ের আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি নিজেই ছিলেন একজন পাঠক। পুরনো বই সংগ্রহ করতেন, ছবি সংগ্রহ করতেন, দাবা খেলতেন, রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন, পৃথিবীর নানা শহর ঘুরে দেখতেন। এসব শখের কথা তাঁর লেখক-পরিচয়কে আরও বড় করে। তিনি কেবল লিখতেন না, জীবনটাকেও নানা দিক থেকে দেখতেন। প্রকাশকের লেখায় তাঁকে কৌতুকপ্রিয়, আড্ডাবাজ, জীবনরসিক ও ভ্রমণপ্রিয় মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই কারণেই বোধহয় অসুস্থতাও তাঁকে পুরোপুরি পরাজিত করতে পারেনি।
আমি অনেক দিন তাঁকে দেখেছি শরীর খারাপ নিয়ে। তারপরও তাঁর মধ্যে একটা অদম্য ব্যস্ততা ছিল। চোখের দেখাও যখন কমে গেল, তখনও মনে হয়নি তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। বরং মনে হতো, তাঁর ভেতরের মানুষটা শরীরের সঙ্গে একেবারেই একমত নয়।
শরীর বলছে, বিশ্রাম নাও।
তিনি বলছেন, না, এখনও অনেক কিছু বাকি।
এই ‘অনেক কিছু বাকি’ বোধটাই হয়তো তাঁকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে।
আমীরুল ভাইয়ের লেখা পড়লে আর তাঁর সঙ্গে থাকা সময়গুলো মনে করলে একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার হয়ে যায়—তিনি মূলত জীবনমুখী মানুষ ছিলেন। মৃত্যুকে ভয় পেতেন কি না জানি না, কিন্তু মৃত্যুর কথা তাঁকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি। হাসপাতালের বিছানাতেও তিনি নিজের সঙ্গে মজা করতে পেরেছেন। এই রসিকতা আসলে কষ্টকে লুকানোর কৌশল নয়; বরং জীবনকে আঁকড়ে থাকার একটা নিজস্ব পদ্ধতি।
তিনি নেই।
কোনো একসময় মনে হয়, দরজা খুলে আবার ডাকবেন। কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলবেন। হয়তো বলবেন, এই কাজটা এভাবে করো, ওই মানুষটার সঙ্গে কথা বলো। কিংবা একেবারেই অন্য কোনো প্রসঙ্গ তুলে বসবেন। তারপর হেসে উঠবেন।
এখন বুঝতে পারছি, একজন মানুষ প্রতিদিনের জীবনের কতটা জায়গা দখল করে থাকতে পারেন—তাঁর অনুপস্থিতি না এলে সেটা বোঝা যায় না।
আমীরুল ইসলাম চলে গেছেন ১০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে। চার দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর। ৬২ বছরের জীবন শেষ হয়েছে, কিন্তু তাঁর কাজ শেষ হয়নি। তাঁর লেখা থাকবে। তাঁর বই থাকবে। শিশুদের মুখে তাঁর ছড়ার শব্দ থাকবে। তরুণ লেখকদের স্মৃতিতে তাঁর উৎসাহ থাকবে। চ্যানেল আইয়ের বহু বছরের সাংস্কৃতিক যাত্রার সঙ্গে তাঁর নাম থেকে যাবে।
আর আমার কাছে তিনি থাকবেন আরও ব্যক্তিগতভাবে।
এখনও মনে হচ্ছে ...
চ্যানেল আইয়ের তার রুমটার দিকে তাকালে আমি একজন সহকর্মীকে দেখব, একজন অগ্রজকে দেখব, একজন লেখককে দেখব। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দেখব একজন প্রাণবন্ত মানুষকে—যিনি অসুস্থতাকে পাত্তা দেননি, চোখের অন্ধকারকে ভয় পাননি, শরীরের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেননি।
আমীরুল ভাইকে শেষ পর্যন্ত থামানো গেল না।
শরীর পারেনি।
অসুস্থতা পারেনি।
চোখের অন্ধকার পারেনি।
তিনি শেষ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন তাঁর নিজের মতো করে—হাসতে হাসতে, কথা বলতে বলতে, লিখতে লিখতে, মানুষকে ভালোবেসে।
মৃত্যু এসে তাঁকে থামিয়েছে।
কিন্তু আমাদের স্মৃতিতে আমীরুল ভাইকে থামানোর কোনো উপায় নেই।
লেখক-
রাজু আলীম
মহাব্যবস্থাপক, অনুষ্ঠান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম, চ্যানেল আই