এ আই নির্মিত প্রতীকী ছবি একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সুরক্ষার প্রধানতম স্তম্ভগুলোর অন্যতম হলো তার গণমাধ্যম ও জনমত গঠনকারী বুদ্ধিজীবী সমাজ। যেকোনো আত্মমর্যাদাশীল জাতির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সুরক্ষায় তাদের জাতীয় সংবাদমাধ্যম প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমাদের একটি তিক্ত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি পতিত, পলাতক ও স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে আমাদের দেশের একাংশের গণমাধ্যম, চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি এবং তথাকথিত ‘সুশীল সমাজ’ যে ধরনের নতজানু ও দাসত্বমূলক মনস্তত্ত্ব লালন করে এসেছে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব ও নৈতিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক হবে কিনা—সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির যে তীক্ষ্ণ ও বাস্তবভিত্তিক মন্তব্য করেছেন, তা মূলত আমাদের গণমাধ্যমের এই দীর্ঘদিনের আচ্ছন্ন মনস্তত্ত্বের ওপরেই এক বিরাট চপেটাঘাত। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, “ব্রেকফাস্ট খাইতে ইন্ডিয়া, লাঞ্চ করতে ইন্ডিয়া, ডিনার করতে ইন্ডিয়া—তাহলে নিজের খাবার কখন খাবেন?” তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতের বিষয়টি মাথা থেকে বের করে দিয়ে নিজেদের দেশের কথা ভাবতে হবে। সম্পর্কের ভিত্তি হবে সমতা ও জাতীয় স্বার্থ, ভারতের স্বার্থ বা বয়ান প্রতিষ্ঠা নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি বিগত ১৫ বছরের আজ্ঞাবহ মানসিকতায় বন্দি থাকা এক শ্রেণীর সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক নিখুঁত দর্পণ। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন—কেন আমাদের গণমাধ্যমের একটি অংশ নিজের দেশের জাতীয় স্বার্থের বদলে প্রতিবেশীর বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত?
বাংলাদেশের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিগত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী, অজাততান্ত্রিক ও লুটেরা শাসনের অন্যতম প্রধান খুঁটি ছিল প্রতিবেশীর ওপর অন্ধ নির্ভরতা। ক্ষমতার বৈধতা পেতে জনমতের তোয়াক্কা না করে একটি বিশেষ রাষ্ট্রের হাতে দেশের সার্বভৌম স্বার্থকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছিল এমন এক নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, সরকারের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকে সমর্থন দিতে গিয়ে দেশের গণমাধ্যমের একাংশ ও সুবিধাভোগী সুশীল সমাজ নিজেদের বিবেক বিক্রি করে দেয়। গণমাধ্যমের মূল কাজ ছিল সরকারের এই আত্মঘাতী এবং দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি বা নীতিগুলোর সমালোচনা করা। অথচ তারা পরিণত হয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রচার যন্ত্রে। চাটুকারিতার এমন এক পর্যায়ে তারা পৌঁছেছিল যে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলোকেও তারা ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।
২০২৪ সালের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও এবং দেশ এক নতুন পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রবেশ করলেও, সেই চিহ্নিত গণমাধ্যম ও ব্যক্তিদের চিন্তা-ভাবনায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্বৈরাচার পালালেও তাদের রেখে যাওয়া মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে এই গোষ্ঠীটি বের হতে পারছে না। নতুন বাংলাদেশে যেখানে সমতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে, সেখানে এখনও সাংবাদিকদের একটি অংশের মূল উদ্বেগ—কেন প্রতিবেশীর সাথে সব ফোরামে বৈঠক হচ্ছে না, কেন ভারতের সন্তুষ্টি অর্জন করা যাচ্ছে না! পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথাতেই এর প্রতিফলন ঘটে—সকাল, দুপুর, রাত—সব কিছুতেই যেন ওদের চোখ ভারতে আটকে আছে। নিজেদের স্বার্থ বা নিজেদের খাবার কখন খাওয়া হবে, সেই চিন্তা তাদের নেই।
বিশ্বের যেকোনো স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দিকে তাকালে দেখা যায়, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তারা কতটা কঠোর ও আপসহীন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, এমনকি খোদ ভারতের গণমাধ্যমের কথা যদি আমরা বিবেচনা করি—তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যতই মতাদর্শিক পার্থক্য থাকুক না কেন, বৈদেশিক নীতি ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তারা শতভাগ নিজ দেশের পক্ষেই অবস্থান নেয়। উদাহরণস্বরূপ সিএনএন, বিবিসি কিংবা নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো মাধ্যমগুলো বৈশ্বিক ইস্যুতে বস্তুনিষ্ঠতার কথা বললেও দিনশেষে নিজেদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্লেষণ দাঁড় করায়।
একইসাথে ভারতের গণমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে এটি আরও স্পষ্ট হয়; এনডিটিভি বা ইন্ডিয়া টুডের মতো প্রধান মাধ্যমগুলো ভারতের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বয়ানকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে একযোগে কাজ করে। ভারতের গণমাধ্যম কখনোই বাংলাদেশের কোনো দাবির পক্ষে নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে না, বরং তারা সবসময় ভারতের জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখায়।
অথচ আমাদের দেশের চিত্র ঠিক উল্টো। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি একাংশ যেন নিজ দেশের সরকারের চেয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় বেশি তৎপর। ভারতের গণমাধ্যম বা সরকার যে বয়ান তৈরি করে, আমাদের দেশের কিছু মিডিয়া অন্ধভাবে তা দেশে গিলে ফেলে এবং প্রচার করতে শুরু করে। বাংলাদেশ কোনো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিলে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে কথা বলতে গেলে, এই দেশীয় অনুগত গোষ্ঠীটি শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যেন ভারতের সাথে একটু দূরত্ব তৈরি হওয়া মানেই বাংলাদেশের জন্য মস্ত বড় ক্ষতি। নিজ দেশের সার্বভৌম অবস্থানকে আন্তর্জাতিক দরবারে তুলে ধরার পরিবর্তে তারা বিদেশি বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি ও পেশাদারিত্বকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে।
সম্প্রতি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হাফিজ উদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যে প্রতিবেশীর সাথে আমাদের অসম সম্পর্কের ও জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা গণমাধ্যমের দাসত্বমূলক ভূমিকা বুঝতে আরও বেশি সহায়তা করে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন—‘বাংলাদেশ ভালো থাকুক, সেটা প্রতিবেশী রাষ্ট্র চায় না। তারা আমাদেরকে একটা করদ রাজ্য বানাবার চেষ্টা করছে।’ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬-১৭ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ বর্জন করে প্রতিবেশীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। এমন অনেকগুলো অসম চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, যা সরাসরি দেশের জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ভারতীয় জাহাজ এলে অন্যান্য জাহাজ, এমনকি বাংলাদেশের নিজস্ব জাহাজগুলোকেও বন্দর খালি করে দিতে হতো। আগে প্রতিবেশী দেশের জাহাজ আনলোড হবে, তারপর এখানকার আমদানিকারকেরা পণ্য খালাসের সুযোগ পাবে—একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত মারাত্মক বৈষম্য তৈরি করেছে।
একইভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদের ভূমির ওপর দিয়ে বিপুল পরিমাণ মালামাল পরিবহন করছে, অথচ সারা বিশ্বব্যাপী যেখানে আন্তর্জাতিক শুল্ক নীতি মেনে পণ্য পরিবহন করতে হয়, সেখানে তাদের বিনাশুল্কে বা নামমাত্র শুল্কে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমাদের দেশীয় ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং রাষ্ট্র বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতিদিন সাধারণ নিরীহ নাগরিকদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, অথচ একই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত থাকলেও সেখানে কিন্তু প্রতিদিন এভাবে গুলি চালানো বা সাধারণ মানুষ হত্যা করা হয় না।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই ধরনের অতিসংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আমাদের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ কার্যত সম্পূর্ণ নীরব থেকেছে। কারণ তারা সবসময় প্রতিবেশীর এজেন্ডা রক্ষা ও তাদের স্বার্থ হাসিল নিয়ে ব্যস্ত ছিল। নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি ধ্বংসের এই চিত্রগুলো তুলে ধরার মতো সময় বা সদিচ্ছা তাদের ছিল না। একটা আত্মমর্যাদাশীল জাতির জন্য এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছুই হতে পারে না। গণমাধ্যমের প্রধান ও মৌলিক দায়িত্ব হলো জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু আমাদের কিছু মিডিয়া ঠিক এর উল্টোটা করে সরাসরি জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই ধরনের অপসাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রবিরোধী মিডিয়াগুলোর বিষয়ে সরকারের এখনই নতুন করে চিন্তাভাবনা করা ও কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—প্রথমত, সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের সমালোচনা; এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত বাস্তবসম্মত যুক্তি দিয়ে বলেছেন, “ভারতের বিষয়টি মাথা থেকে বের করতে হবে। ভারত বাংলাদেশের আরেকটি প্রতিবেশী দেশ, যার সঙ্গে বাংলাদেশ ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চায়। তবে সবসময় শুধু ভারতের কথা ভাবলে চলবে না, নিজেদের দেশের কথাও ভাবতে হবে।” তিনি অত্যন্ত সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছেন যে, বহুপাক্ষিক ফোরাম হলো আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিশাল মঞ্চ। সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের প্রধানের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অসংখ্য দেশের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া। প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকের জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকা কোনো আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না।
এর আগের বক্তব্যেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন, গত ১৫ বছরের অস্বস্তিকর ও একপেশে সম্পর্কের বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ এখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন করে সাজাতে চায়, এবং এই পুনর্গঠন হতে হবে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সফরের মাধ্যমে, অন্য কোনো আন্তর্জাতিক মেলা বা সম্মেলনের সুযোগ নিয়ে নয়। অত্যন্ত যৌক্তিক এই কূটনৈতিক অবস্থানকে বোঝার মতো মানসিকতাও যেন আমাদের কিছু গণমাধ্যমের নেই। তারা প্রথাগত আচ্ছন্নতার মধ্যে আটকে থেকে ভারতের উপস্থিতিকেই কূটনৈতিক সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি মনে করে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করা। কিন্তু বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে এই বস্তুনিষ্ঠতা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় ও বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো রাষ্ট্র যদি তার প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক চায়, তবে তার ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতা। কিন্তু যখন কোনো দেশের গণমাধ্যম নিজ দেশের পানি সংকট, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সার্বভৌমত্ব সম্পর্কিত মৌলিক সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে কেবল প্রতিবেশী দেশের মন জুগিয়ে চলার পরামর্শ দেয়, তখন সেই সাংবাদিকতার মৌলিক পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
পরিবর্তিত বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে এই আত্মঘাতী পথ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সরকার বা আন্তর্জাতিক শক্তির সন্তুষ্টি নয়, দেশের সাধারণ মানুষের এবং সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা করাই সংবাদের প্রধান কাজ হতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি গণমাধ্যম যে চশমা দিয়ে বাংলাদেশকে দেখে, সেই একই চশমা দিয়ে দেশের ভেতরের মিডিয়া দেশকে দেখতে পারে না; নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্লেষণ দাঁড় করানো অত্যন্ত জরুরি। বিগত সরকারের আমলে যে সকল চিহ্নিত ব্যক্তি ও মাধ্যম গণমাধ্যমকে বিকিয়ে দিয়ে দালালির সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, তাদের বিষয়ে কঠোর প্রশাসনিক ও নীতিগত পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থবিরোধী মিডিয়াগুলোকে বয়কট করে স্বাধীন ও নির্মোহ সাংবাদিকতা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান এবং উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশকে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের অনুগত হয়ে চলার প্রয়োজন নেই। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’—তবে এই বন্ধুত্ব হতে হবে সমতার ভিত্তিতে, দাসত্বের ভিত্তিতে নয়। সকাল, দুপুর কিংবা রাতে কেবল ভারতের কথা চিন্তা না করে আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে ‘বাংলাদেশ’। নিজেদের সীমান্ত রক্ষা, নিজেদের কৃষকের পানির অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিজেদের ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে স্বাধীন কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করাই আজ সময়ের মূল দাবি।
পরিশেষে বলা যায়,পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে যে কথাটি বলেছেন, তা মূলত সমগ্র জাতির প্রতিই এক স্পষ্ট বার্তা। আমাদের নিজেদের থালা ভর্তি খাবার থাকতে আমরা কেন অন্যের খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকব? আমাদের নিজেদের স্বার্থ আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। গণমাধ্যম যদি এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা কেবল নিজেদের পেশাদারিত্বকেই বিসর্জন দেবে না, বরং ইতিহাসের পাতায় জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এখন সময় এসেছে ভারতীয় মোহাচ্ছন্নতা ভেঙে বেরিয়ে আসার। ভারতীয় বয়ানের ওপর নির্ভর না করে, গণমাধ্যমকে হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অকুতোভয় কণ্ঠস্বর। নতজানু মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই হোক পরিবর্তিত এই নতুন বাংলাদেশের একমাত্র লক্ষ্য। তাহলেই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে ইনশাল্লাহ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।