অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুমআমি আমার রুগীকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম একদম ভালো অবস্থায়।
মানে, বুকের মাঝখানে হাত দিয়ে বসে ছিল, ঘামে জামা ভিজে গেছে, শ্বাস নিতে পারছিল না, প্রেসার মেশিনে উঠছিল না, মুখ এক পাশে বেঁকে যাচ্ছিল, কথার বদলে শুধু ‘আঁ…আঁ…’ করছিল—কিন্তু এসব তো মানুষের হতেই পারে! বাড়িতে সবাই বলল, “গ্যাসের ব্যথা। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খাওয়াও।”
পানি খাওয়ানো হলো।
গ্যাসের ট্যাবলেট খাওয়ানো হলো।
পাশের ফার্মেসির ভাইয়া বললেন, “দুইটা ইনজেকশন দিলেই ঠিক।”
তারপর এক আত্মীয় বললেন, “হাসপাতালে গেলে তো টাকা খরচ হবে, আগে কবিরাজ দেখাও।”
কবিরাজ সাহেব রুগীর নাড়ি ধরে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে বললেন,
—“বাতাস লেগেছে।”
আমরা স্বস্তি পেলাম। কারণ বাতাসের চিকিৎসা যে হৃদ্রোগের চেয়ে সহজ, সেটা আমরা পারিবারিকভাবে জানি।কিন্তু রাতের দিকে রুগী যখন বিছানা থেকে পড়ে গেলেন, তখন আমরা একটু চিন্তা করলাম। তারপরও হাসপাতালে যাইনি। কারণ রাত তো! ভোরে গেলেই হবে। ভোরে আবার দেখা গেল অ্যাম্বুলেন্স নেই। তাই এক আত্মীয়ের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করলাম। গাড়ি এলে দেখা গেল পেট্রোল কম। পেট্রোল নেওয়া হলো। এরপর হাসপাতালে পৌঁছালাম।
ডাক্তার রুগীকে দেখে বললেন,
—“রুগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। কতক্ষণ ধরে এমন?”
আমি বললাম,
—“ডাক্তার সাহেব, মাত্র তিন দিন! তবে আজ সকাল থেকে একটু বেশি। কিন্তু রুগী তো একদম ভালোই ছিল!”
ডাক্তার বললেন,
—“তাৎক্ষণিক অক্সিজেন, ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা, জরুরি ওষুধ, সম্ভব হলে আইসিইউ এবং জরুরি প্রক্রিয়া লাগতে পারে।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। এত পরীক্ষা কেন? আমরা তো এসেছি দুই মিনিটে একটা ওষুধ লিখে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য! হাসপাতাল মানে কি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অক্সিজেন, মনিটর, আইসিইউ—এত সব ঝামেলা? এরপর শুরু হলো চিকিৎসকদের দৌড়াদৌড়ি। কেউ অক্সিজেন দিচ্ছে, কেউ ইসিজি করছে, কেউ রক্ত নিচ্ছে, কেউ প্রেসার খুঁজছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, “বাহ! রুগীকে দেখার চেয়ে নাটকই বেশি করছে!”
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বললেন,
—“আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, কিন্তু রুগী অনেক দেরিতে এবং খুব জটিল অবস্থায় এসেছেন।”
এই কথা শুনে আমি ক্ষিপ্ত হয়ে গেলাম।
কারণ, চিকিৎসকের কাজ কী?
মানুষকে অমর বানানো।
রুগী কখন হাসপাতালে এলেন, আগে কোথায় ঘুরলেন, কী খেয়েছেন, কত সময় নষ্ট হলো, তার শরীরের কতটা ক্ষতি হয়ে গেছে—এসব কথা বলে দায় এড়ানো যাবে না। ডাক্তার হলে রুগীকে সুস্থ করতেই হবে। তা না হলে এত বড় হাসপাতাল বানিয়ে লাভ কী?
কিছুক্ষণ পর রুগীকে আর বাঁচানো গেল না।
আমরা সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম—ভুল চিকিৎসা!
কারণ রুগী তো হাসপাতালে আসার আগেও জীবিত ছিলেন।
হাসপাতালে এসে মারা গেছেন।
অতএব হিসাব একদম পরিষ্কার।
আমি তখন একজনকে বললাম,
—“চেয়ার ধরো!”
আরেকজনকে বললাম,
—“কাঁচ ভাঙো!”
তৃতীয়জনকে বললাম,
—“ডাক্তার কোথায়? আগে ভিডিও করো!”
কারণ আমাদের দেশে ন্যায় বিচারের প্রথম ধাপ হলো লাইভ ভিডিও, দ্বিতীয় ধাপ ভাঙচুর, আর তৃতীয় ধাপ—ঘটনা কী হয়েছিল, সেটা পরে দেখা যাবে।
পাশে এক নার্স বলছিলেন,
—“ভাই, এখানে আরও গুরুতর রুগী আছে। দয়া করে চিকিৎসা বন্ধ করবেন না।”
আমি বললাম,
—“আপনারা বুঝবেন না। আমাদের রুগী মারা গেছে। এখন অন্য রুগীর চিকিৎসা চলবে কেন?”
একজন লোক বলল,
—“কিন্তু ওই রুগীরও তো হার্ট অ্যাটাক!”
আমি বললাম,
—“আজকে আমাদের ন্যায় বিচারের দিন। হার্ট অ্যাটাক কালকে দেখবেন।”
এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক অনেক সাহস করে বললেন,
—“অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। হাসপাতাল ভাঙলে তো পরের রুগীদের ক্ষতি হবে।”
আমরা তাঁকে বোঝালাম,
—“চাচা, আপনি পুরোনো যুগের মানুষ। এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন নিয়ম হয়েছে—
রুগী বাঁচলে ডাক্তার মহান।
রুগী মারা গেলে ডাক্তার শয়তান।
এর মাঝে রোগের জটিলতা, দেরিতে আসা, হাসপাতালের সক্ষমতা, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা—এসব হলো অপ্রয়োজনীয় অধ্যায়।”
চাচা চুপ করে গেলেন। সম্ভবত তিনি ইউটিউব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেননি।
আসলে আমরা সবাই খুব দায়িত্বশীল। রুগীর বুকব্যথা তিন দিন ‘গ্যাস’ ভেবে বসে থাকতে পারি, স্ট্রোকের রুগীকে তেল মালিশ করাতে পারি, শ্বাসকষ্টের রুগীকে ফার্মেসির ইনজেকশন দিতে পারি—কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ফল খারাপ হলে আমরা এক মুহূর্তও দেরি করি না।
সোজা ঘোষণা দিই—
“আমার ভালো রুগী হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম, ভুল চিকিৎসা দিয়ে ডাক্তার রুগীকে মেরে ফেলেছে!”
ভালো রুগী বলতে কী বোঝায়—সে প্রশ্ন করবেন না।
রুগী কথা বলতে পারছিলেন না, হাঁটতে পারছিলেন না, শ্বাস নিতে পারছিলেন না, প্রেসার ছিল না—তবু তিনি ভালোই ছিলেন। কারণ আমরা হাসপাতালে আসার আগে পর্যন্ত তাঁকে “ভালো” বলেই বিশ্বাস করতাম।
কিন্তু রম্যের আড়ালে বিষয়টি ভয়াবহ। হাসপাতাল ভাঙচুর হলে চিকিৎসকেরা আতঙ্কিত হন, স্বাস্থ্য কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন, জরুরি বিভাগের কাজ ব্যাহত হয়, আর সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েন পরবর্তী রুগীরা। তখন জটিল রুগী নিতে সবাই ভয় পান; কারণ চিকিৎসার ফল অনুকূলে না গেলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নয়, কাচের জানালার পরীক্ষা শুরু হয়।
রুগীর মৃত্যুর সঠিক তদন্ত হোক।
অবহেলা থাকলে কঠোর ব্যবস্থা হোক।
দোষী হলে শাস্তি হোক।
কিন্তু মব দিয়ে চিকিৎসার বিচার হয় না।
ভাঙচুরে ন্যায়বিচার আসে না।
ডাক্তার পিটিয়ে রুগী ফিরে আসে না।
হাসপাতালের কাঁচ ভাঙলে শব্দ হয়,
কিন্তু ভেঙে যায় পরের রুগীর বাঁচার আশাটুকুও।
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি