প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শহিদ সেনাসদস্যদের পরিবারের সাক্ষাৎএকটি পরিবারের দরজায় হঠাৎ নেমে আসা নীরবতার কোনো শব্দ নেই। কিন্তু সেই নীরবতার ভার কতটা অসহনীয়, তা কেবল স্বজন হারানো মানুষই জানেন। এক মুহূর্তে একজন নারী হারান তাঁর জীবনসঙ্গী, একটি শিশু হারায় বাবার স্নেহমাখা হাত, আর বৃদ্ধ মা-বাবা হারান শেষ জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন—নিজের সন্তানকে।
কিন্তু একজন সৈনিক যখন দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দেন, তখন তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে পুরো জাতির বেদনা। আর সেই শোকের মুহূর্তে রাষ্ট্র কীভাবে তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, কীভাবে অশ্রুসিক্ত স্বজনদের হাতে শক্ত করে হাত রাখে, কীভাবে তাঁদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে—তার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা, দায়বদ্ধতা ও নৈতিক শক্তি।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিং মহড়ার সময় এক মর্মান্তিক গোলা বিস্ফোরণে শাহাদাতবরণ করেন দুই বীর সেনাসদস্য—সৈনিক (অপারেটর) আবু বকর সিদ্দিক এবং সৈনিক (গানার) মো. তাসনিম রিফায়াত। ৯ সেপ্টেম্বরের সেই মর্মান্তিক মুহূর্ত শুধু দুটি সম্ভাবনাময় জীবনের অবসান ঘটায়নি; গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে তাঁদের পরিবার, সহকর্মী এবং পুরো জাতিকে।
দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি সেনাসদস্যকে প্রতিনিয়ত যে কঠিন বাস্তবতা ও জীবনঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়, হাটহাজারীর এই দুর্ঘটনা আমাদের আবারও সেই বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইউনিফর্মের আড়ালে থাকা মানুষটিরও যে একটি পরিবার আছে, প্রিয়জন আছে, স্বপ্ন আছে—এই নির্মম ঘটনা আমাদের সেই সত্যটিও নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে।
এই গভীর শোকের মুহূর্তে রাষ্ট্রনায়কোচিত সংবেদনশীলতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ দুই সেনাসদস্যের স্বজনদের তাঁর কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা।
পরিবেশটি ছিল স্বাভাবিকভাবেই আবেগঘন। সেখানে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল স্বজন হারানোর বেদনা এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে দুই পরিবারের খোঁজখবর নেন, তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং আর্থিক সহায়তার চেক তাঁদের হাতে তুলে দেন।
শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের পাশে বসে প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, ‘এই শোকের সময়ে আমরা আপনাদের পাশে আছি এবং পাশে থাকব। সরকার ও সেনাবাহিনী সব সময় আপনাদের পরিবারের পাশে থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে সেনাসদস্যরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ পুরো জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
তবে এই সাক্ষাতের তাৎপর্য শুধু কয়েকটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা এককালীন আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, প্রিয় মানুষকে হারানোর যে শূন্যতা, কোনো অর্থই তা পূরণ করতে পারে না। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাও শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তায় দূর হয় না। তাই রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, সেটিই এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, উভয় শহীদ সেনাসদস্যের স্থায়ী ঠিকানায় তাঁদের পরিবারের জন্য একটি করে স্থায়ী বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁদের স্ত্রীদের সম্মানজনক চাকরির ব্যবস্থা করা হবে এবং পিতৃহীন শিশু সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।
রাষ্ট্রীয় কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগের গুরুত্ব গভীর। একজন সৈনিক যখন ইউনিফর্ম পরেন, তখন তিনি শুধু একটি চাকরি গ্রহণ করেন না; তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ভূখণ্ড এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার একটি মহান অঙ্গীকার নিজের কাঁধে তুলে নেন। কঠোর প্রশিক্ষণ, দুর্গম সীমান্ত পাহারা, ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক মহড়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশন—সব ক্ষেত্রেই তাঁদের সামনে থাকে ঝুঁকি ও দায়িত্ব।
অতএব, অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সেনাসদস্য শহীদ হলে তাঁর পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিঃসন্দেহে বিশেষ। এটি কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বেরও অংশ।
হাটহাজারীর এই শোকাবহ ঘটনায় দুটি পরিবারের যে বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে, তা আরও হৃদয়স্পর্শী। শহীদ আবু বকর সিদ্দিকের পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার জুতি, শিশুকন্যা ফাতেমা সিদ্দিকা, পিতা আব্দুল ওহাব ও মা পারভীন আক্তার। অন্যদিকে শহীদ তাসনিম রিফায়াতের পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী মোসা. ফাহমিদা আফরিন, শিশুকন্যা রাফসা তাসনিম ইফরা এবং পিতা মো. আসাদুল হক।
কচি দুটি শিশু হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না, কেন হঠাৎ তাদের ঘরের পরিবেশ এত নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। কেন তাদের প্রিয় বাবা আর ফিরে এসে বুকে জড়িয়ে ধরছেন না, কেন তাঁর কণ্ঠস্বর আর শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন তারা বড় হবে, যখন জীবনের বাস্তবতা তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, তখন তারা বুঝবে—তাদের বাবারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। আর রাষ্ট্র তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটিই হয়ে উঠবে তাদের ভবিষ্যৎ পথচলার একটি বড় অবলম্বন।
এখানেই রাষ্ট্রের সহায়তার প্রকৃত অর্থ। এটি কোনো দয়া বা করুণা নয়; এটি তাঁদের অধিকার এবং শহীদের প্রতি রাষ্ট্র ও জাতির ঋণের সামান্য স্বীকৃতি।
আধুনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে শহীদ ও নিহত সেনাসদস্যদের পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণ কাঠামো থাকা জরুরি। সেখানে শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা নয়, বরং সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং সন্তানদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের মতো বিষয়গুলোও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় থাকা উচিত।
একই সঙ্গে হাটহাজারীর দুর্ঘটনা আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকেও নতুন করে তাকানোর সুযোগ তৈরি করেছে। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো মানে শুধু আধুনিক ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ, বিমান বা অন্যান্য অত্যাধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ নয়। এর সঙ্গে সমান গুরুত্বের বিষয় হলো প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল, আধুনিক সুরক্ষা সরঞ্জাম, অস্ত্র ও সামরিক যানবাহনের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
এই দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। কোথায় ত্রুটি ছিল, কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা ছিল কি না, নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি দুর্ঘটনার প্রকৃত শিক্ষা তখনই পাওয়া যায়, যখন তার কারণ শনাক্ত করে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা হয়।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদান দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদার বিষয়। তাই একজন সেনাসদস্যের জীবন ও আত্মত্যাগের সঙ্গে শুধু একটি পরিবার নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নও জড়িত।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের শহীদ সেনাসদস্যদের পরিবারের পাশে বসে তাঁদের কথা শোনা এবং ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণের যে বার্তা দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে যায়—দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সদস্যের জীবনহানি ঘটলে তাঁর পরিবারকে একা ছেড়ে দেওয়া হবে না।
একজন সৈনিকের শক্তি শুধু তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রে নয়; তাঁর পেছনে থাকা পরিবার এবং রাষ্ট্রের ওপর তাঁর আস্থাতেও নিহিত। তিনি যদি বিশ্বাস করেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর পরিবার নিরাপদ থাকবে, তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে না, তাঁর স্ত্রীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে হবে না—তাহলে সেই আস্থা তাঁর পেশাগত অঙ্গীকারকেও আরও দৃঢ় করে।
মৃত্যু চিরন্তন। কিন্তু দেশ ও মানুষের জন্য আত্মত্যাগ করা মানুষের স্মৃতি কখনো সহজে মুছে যায় না। হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে আবু বকর সিদ্দিক ও তাসনিম রিফায়াতের পার্থিব জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ তাঁদের পরিবার ও দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো—রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি প্রতিশ্রুতি যেন বাস্তবায়নের পথে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না যায়। যে বাড়ির কথা বলা হয়েছে, সেটি যেন সময়মতো নির্মিত হয়; যে কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে, তা যেন সম্মানের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়; যে মাসিক ভাতার কথা বলা হয়েছে, তা যেন নিয়মিত পৌঁছে যায়; আর শিশুদের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের পথ যেন কখনো অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে না যায়।
কারণ শহীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু স্মরণসভা, ফুলেল শ্রদ্ধা কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাঁর রেখে যাওয়া পরিবার নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বাবলম্বী জীবনযাপনের সুযোগ পায়।
আবু বকর সিদ্দিক ও তাসনিম রিফায়াত তাঁদের জীবন দিয়ে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সেই দায়িত্বেরই একটি মানবিক অধ্যায় রচনা করার সময়। রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, তাহলে শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি সেটিই হবে সবচেয়ে অর্থবহ সম্মান। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা শহীদদের জান্নাতের উঁচু মাকাম নসিব করুন।
লেখক পরিচিতি:
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, ‘আমার দিন’।