অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুমআজ ১৮ সেপ্টেম্বর—বিশ্ব বাশ দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ বাশ নিয়ে কথা হচ্ছে পরিবেশ, টেকসই নির্মাণ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবে। আর বাংলাদেশে আমরা বাশের আরও একটি বিশেষ ব্যবহার আবিষ্কার করেছি—হাসপাতাল ভাঙচুর করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বাশ দেওয়া।
গত মাত্র ৭২ ঘণ্টায় দেশের চারটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও চিকিৎসক আহত, কোথাও নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী লাঞ্ছিত, কোথাও জরুরি বিভাগের কক্ষ ভাঙচুর। অর্থাৎ, রোগী বাঁচানোর জায়গাটিকেই আমরা এমনভাবে “শিক্ষা” দিচ্ছি, যেন পরেরবার জরুরি রোগী এলে সবাই আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবেন।
এ এক অভিনব স্বাস্থ্যনীতি!
একজন রোগী হাসপাতালে এলেন—কখনো তিন দিনের বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে, কখনো পানিতে ডুবে অচেতন অবস্থায়, কখনো কার্ডিওজেনিক শকে, কখনো হাসপাতালে পৌছানোর আগেই প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী। চিকিৎসক ও টিম সীমিত জনবল, সীমিত শয্যা, সীমিত যন্ত্রপাতি নিয়ে সাধ্যমতো চেষ্টা করলেন। কিন্তু রোগীকে বাঁচানো না গেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হবে না; শুরু হবে হাসপাতাল সংস্কারের নতুন পদ্ধতি—
প্রথমে মোবাইল ফোন বের হবে। তারপর ভিডিওগ্রাফি হবে। তারপর ফেসবুক লাইভ হবে। তারপর আশপাশের সবাই জরুরি চিকিৎসা ও ফরেনসিক মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ হয়ে যাবেন। সবশেষে ভাঙবে হাসপাতালের কাচ, কম্পিউটার, চেয়ার, দরজা এবং চিকিৎসার পরিবেশ।
এই পদ্ধতির নাম দেওয়া যেতে পারে—
‘ভাঙচুরভিত্তিক জরুরি স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন প্রকল্প’। হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা কম—বাশ। অক্সিজেন কম—বাশ। এক্স-রে মেশিন অচল—বাশ। আল্ট্রাসনোগ্রাফি নেই—বাশ। পর্যাপ্ত ওষুধ নেই—বাশ। নার্স, টেকনোলজিস্ট ও চিকিৎসক কম—বাশ। তার ওপর জরুরি বিভাগে হামলা—এ যেন বাঁশের ওপর বাঁশ, তারপর সেই বাঁশের ওপর জাতীয় উন্নয়নের রঙিন ফিতা!
অদ্ভুত বিষয় হলো, একটি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর নষ্ট পড়ে থাকলে খুব বেশি লোকের রাগ হয় না। শয্যার চেয়ে তিন গুণ রোগী মেঝেতে থাকলেও কেউ কাচ ভাঙতে যান না। কিন্তু সেই সংকটের ভেতর দাঁড়িয়ে একজন চিকিৎসক যদি মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে বাঁচাতে না পারেন, তখন তাঁর কক্ষ ভাঙা যেন ন্যায়বিচারের সর্বশেষ ধাপ।
চিকিৎসকের অপরাধ কী?
তিনি রোগীকে সময়মতো হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে আসতে পারেননি। তিনি নষ্ট মেশিন নিজ হাতে চালু করতে পারেননি। তিনি শূন্য শয্যার মধ্যে নতুন শয্যা বানাতে পারেননি। তিনি রোগীর মৃত্যুকে মুঠোফোনের লাইভ ভিডিও দেখে বাতিল করতে পারেননি। তাই তাঁকে শাস্তি দিতে হবে!
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ কিন্তু কোনো সিনেমার সেট নয়। সেখানে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আতঙ্কে থাকলে রোগীও নিরাপদ থাকেন না। একটি কাচ ভাঙা মানে শুধু কাচ ভাঙা নয়; এটি পরের রোগীর চিকিৎসায় বিলম্ব। একজন চিকিৎসককে মারধর মানে শুধু একজনকে আহত করা নয়; এটি পুরো টিমকে ভীত করে দেওয়া। আর ভীত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে নির্ভীক চিকিৎসা প্রত্যাশা করা নিষ্ঠুর রসিকতা।
বিশ্ব বাশ দিবসে তাই বিনীত প্রস্তাব—
হাসপাতালে বাশ নয়, নিরাপত্তা দিন। চিকিৎসককে ভয় নয়, কাজের পরিবেশ দিন।
ভিডিওগ্রাফির আদালত নয়, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক তদন্ত দিন। ভাঙচুর নয়, সচল যন্ত্রপাতি দিন। মব নয়, পর্যাপ্ত জনবল দিন। অপমান নয়, জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যনীতি দিন। কারণ স্বাস্থ্যখাতকে প্রতিদিন বাশ দিলে একদিন দেখা যাবে—হাসপাতাল আছে, ভবন আছে, সাইনবোর্ড আছে; কিন্তু জরুরি রোগী দেখার মতো নিরাপদ মানুষ নেই।
সেদিন বাশটা আর চিকিৎসকের হাতে থাকবে না—সেটি গিয়ে লাগবে প্রতিটি রোগী ও তার পরিবারের জীবনে।
—অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূইয়া মাসুম
এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি)
বিভাগীয় প্রধান—কার্ডিওলজি
পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল