চিকিৎসক ডা. প্রদীপ দেবনাথ।শিশু ঘুমানোর সময় হা করে শ্বাস নিচ্ছে, নাক ডাকছে কিংবা ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশিতে ভুগছে—এ ধরনের উপসর্গকে অনেক অভিভাবক সাধারণ ঠান্ডা-কাশি মনে করে অবহেলা করেন। তবে এসব সমস্যার পেছনে থাকতে পারে এডেনয়েড (Adenoid) বৃদ্ধি।
তাই শিশুদের এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন খুলনার ঐতিহ্যবাহী শিশু হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক ডা. প্রদীপ দেবনাথ।
চিকিৎসক ডা. প্রদীপ দেবনাথ জানান, এডেনয়েড হলো নাকের পেছনে ও গলার উপরের অংশে (নাসাগলবিল বা Nasopharynx) অবস্থিত এক ধরনের লসিকাগ্রন্থি বা টিস্যু। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুখ বা নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধে এটি ভূমিকা রাখে।
সাধারণত জন্ম থেকেই এডেনয়েড থাকে এবং শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত এটি কিছুটা বড় হতে পারে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়। তবে বারবার সংক্রমণ বা অ্যালার্জির কারণে এডেনয়েড অতিরিক্ত বড় হয়ে গেলে শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস ও ঘুমসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এডেনয়েড বড় হলে যেসব সমস্যা হতে পারে—
হা করে শ্বাস নেওয়া: এডেনয়েড বড় হয়ে নাকের পেছনের বায়ু চলাচলের পথ আংশিক বা সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে শিশু নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে না পেরে মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়।
নাক ডাকা ও ঘুমের সমস্যা: রাতে ঘুমানোর সময় শিশু জোরে নাক ডাকতে পারে, বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে এবং অস্থিরভাবে ঘুমাতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে সাময়িকভাবে শ্বাস বন্ধ হওয়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কানের সমস্যা: এডেনয়েডের কাছাকাছি কানের সঙ্গে সংযোগকারী ইউস্টেশিয়ান টিউব থাকায় এডেনয়েড বড় হলে সেখানে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে কানে পানি জমা, কানে ব্যথা, বারবার ইনফেকশন এবং শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
ঘন ঘন সর্দি-কাশি: এডেনয়েডের সমস্যায় শিশু দীর্ঘদিন সর্দি, নাক বন্ধ থাকা, কাশি কিংবা সাইনুসাইটিসে ভুগতে পারে।
চেহারায় পরিবর্তন: দীর্ঘদিন মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাসের কারণে শিশুর মুখের গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। মুখ কিছুটা লম্বাটে হওয়া, ওপরের পাটির দাঁত সামনে বেরিয়ে আসা এবং মুখে সবসময় ক্লান্তির ছাপ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যকে ‘Adenoid Facies’ বলা হয়। শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব: দীর্ঘদিন ঘুমের ব্যাঘাত হলে শিশু দিনের বেলা অলস, খিটখিটে বা মনমরা হয়ে পড়তে পারে। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশেও প্রভাব পড়তে পারে।
ডা. প্রদীপ দেবনাথ বলেন, শিশু নিয়মিত মুখ দিয়ে শ্বাস নিলে, ঘুমের মধ্যে নাক ডাকলে, ঘন ঘন সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে কিংবা কানে কম শোনার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গের কারণ নির্ণয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলে এডেনয়েডজনিত জটিলতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।