কৃষকদের নামে স্প্রে মেশিন বিতরণের তালিকা, বাস্তবে উপকরণ পাননি অনেকেই

ইলিয়াছ সানি, বান্দরবান

সারাদেশ

বান্দরবানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রিপ্রিনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন

2026-09-27T14:47:56+06:00
2026-09-27T14:47:56+06:00
সোমবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
বান্দরবানে বারির কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম
কৃষকদের নামে স্প্রে মেশিন বিতরণের তালিকা, বাস্তবে উপকরণ পাননি অনেকেই
ইলিয়াছ সানি, বান্দরবান
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪৭ পিএম  
বান্দরবানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রিপ্রিনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ প্রকল্পে কৃষি উপকরণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক ড. জগদীশ চন্দ্র বর্মন ও বান্দরবান জেলা কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম বিরুদ্ধে। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের মধ্যে ব্যাটারি চালিত স্প্রে মেশিনসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিতরণের কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সুবিধাভোগীদের তালিকা ও বাস্তব বিতরণের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশ্বব্যাংকের নথি অনুযায়ে, বারির নেতৃত্বে জলবায়ু সহনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা। পাশাপাশি বীজ, চারা ও অন্যান্য রোপণ উপকরণ উৎপাদন ও বিপণনের জন্য একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো নতুন করে ২ লাখ হেক্টর জমিকে ধানবহির্ভূত শস্য, ডাল, তেলবীজ, ফল ও সবজি চাষের আওতায় আনা। এর মাধ্যমে কৃষিতে বহুমুখীকরণ এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি। 

অভিযোগ রয়েছে, বান্দরবানে প্রকল্পের রেজিস্টারে কৃষকদের নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষর/ছবির মাধ্যমে উপকরণ বিতরণের তথ্য সংরক্ষণ করা হলেও তালিকায় থাকা অনেক ব্যক্তি বাস্তবে কোনো কৃষি উপকরণ পাননি। এমনকি কয়েকজনের দাবি, তারা কৃষকও নন। তাদের নাম কীভাবে প্রকল্পের সুবিধাভোগীর তালিকায় এসেছে, সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।

বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তথ্য অনুযায়ী, চঅজঞঘঊজ-এর ইঅজও ঈড়সঢ়ড়হবহঃ-এর প্রকল্প কোড ২২৪৩৭৪৮০০ এবং প্রকল্পটির মেয়াদ ১ জুলাই ২০২৩ থেকে ৩০ জুন ২০২৮ পর্যন্ত। এডিপিতেও প্রকল্পটির জন্য মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬১২ কোটি ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এতে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জন্য ১২৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের ১৪৯ কোটি ২১ লাখ টাকা যা এই অর্থ বছরে ১২৬ কোটি ৭৯ টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বান্দরবান কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে ব্যাটারি চালিত স্প্রে মেশিন বিতরণের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওই তালিকার কয়েকজনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, প্রকল্পের পক্ষ থেকে তাদের কোনো স্প্রে মেশিন দেওয়া হয়নি।

বান্দরবান পৌরসভার হাফেজঘোনা এলাকার নুরুল আমিন বলেন, ‘কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বান্দরবান থেকে আমাকে কোনো ব্যাটারি চালিত স্প্রে মেশিন দেওয়া হয়নি। রেজিস্টারে কীভাবে আমার নাম এসেছে, সেটাও আমি জানি না।’

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন পৌরসভার আর্মিপাড়া এলাকার সোহাগ হোসেন, শেরে বাংলা এলাকার মো. অন্তর হোসেন জনি ও একই এলাকার জহিরুল ইসলামসহ তালিকায় থাকা আরও কয়েকজন। তাদের দাবি, প্রকল্পের আওতায় কোনো কৃষি উপকরণ তারা গ্রহণ করেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তালিকাভুক্ত এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের নাম-ঠিকানা নেওয়া হয়েছে। আমাদের সামনে একটি স্প্রে মেশিন রেখে ছবি তোলা হয়েছে। এর জন্য এক হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মেশিনটি আমাদের দেওয়া হয়নি।’ এই সময় তিনি আরো বলেন, আমাদের কাছ থেকে প্রকল্পের উপকরণ গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে ছবি নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

এ অভিযোগ সত্য হলে শুধু সুবিধাভোগীর তালিকা নয়, উপকরণ বিতরণের প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত ছবি, রেজিস্টার, স্বাক্ষর, ভাউচার ও অর্থ ব্যয়ের কাগজপত্রও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে আরও আরো জানা যায়, সুবিধাভোগীর তালিকায় এমন কয়েকজনের নাম রয়েছে যারা নিয়মিত কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নন। কারও কারও নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে রেজিস্টার পূরণ করার অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে উপকারভোগীর তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষক নির্বাচন, উপকরণ গ্রহণের স্বাক্ষর এবং বিতরণের প্রমাণ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রকল্পের ক্রয়কৃত উপকরণ বাস্তবে কোথায়, কার কাছে এবং কতটি বিতরণ হয়েছেÑতার হিসাবও সংরক্ষিত থাকার কথা। অভিযোগের বিষয়টি শুধু উপকরণ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, ক্রয় প্রক্রিয়া, সুবিধাভোগী নির্বাচন, বিতরণ কার্যক্রম এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নÑসবগুলো ছাড়াও সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের মূল রেজিস্টার, অনুমোদিত সুবিধাভোগীর তালিকা, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বিতরণ রেজিস্টার, স্টক রেজিস্টার, বিল-ভাউচার এবং মাঠপর্যায়ের সরবরাহের তথ্য একই সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির আওতায় আনার জন্য সরকারি অর্থে যেসব উপকরণ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো প্রকৃত কৃষকের হাতে না পৌঁছালে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাদের দাবি, প্রকল্পের সুবিধাভোগী তালিকা ধরে ধরে প্রত্যেক কৃষকের বাড়িতে গিয়ে যাচাই করা, বিতরণ করা স্প্রে মেশিনের সিরিয়াল নম্বর/ক্রয় তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং প্রকল্পের স্টক রেজিস্টার ও বিতরণ রেজিস্টার পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের আওতায় কতটি ব্যাটারি চালিত স্প্রে মেশিন কেনা হয়েছে, প্রতি ইউনিটের ক্রয়মূল্য কত, কোন ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়েছে, কতটি কোন এলাকায় পাঠানো হয়েছে এবং কতজন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছেÑএসব তথ্য প্রকাশের কারা হউক।

বিশেষ করে রেজিস্টারে কোনো ব্যক্তির নামে উপকরণ বিতরণ দেখানো হলেও তিনি যদি বাস্তবে তা না পেয়ে থাকেন, তাহলে ওই ব্যক্তির নামে বিতরণ দেখানোর ভিত্তি কী ছিলÑতা বের করা জরুরি। একইভাবে প্রকল্পের অর্থে কেনা উপকরণ প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছেছে কি না, তা যাচাই ছাড়া কেবল কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পের সফলতা নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম বলেন, কৃষক ছাড়া কৃষি উপকরণ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে অনেকেই ভুল তথ্য দিয়ে কৃষি উপকরণ নিয়ে যান। কৃষি উপকরণ বিতরণ রেজিস্টারে নাম থাকলেও কয়েকজন কৃষক উপকরণ পাননি বলে দাবি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সবাইকে স্প্রে মেশিন দিয়েছি। এখন তারা যদি অস্বীকার করেন, তাহলে আমি কী করব?

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. জগদীশ চন্দ্র বর্মনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।

সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত