ছবি-যাযাদি দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩টি উপজেলার ১৪ হাজার ১৮০টি কৃষি ব্লকের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে পর্যায়ক্রমে কৃষক কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক নগদ সহায়তা ও সরকারি প্রণোদনা, কৃষি উপকরণ, সেচ, কৃষিঋণ, কৃষিযন্ত্র, আবহাওয়া ও বাজার তথ্যসহ ১০ ধরনের সেবা পাবেন।
আজ বৃহস্পতিবার বিকালে ফেনীর ফুলগাজী সরকারী পাইলট স্কুল মাঠে উপজেলায় কৃষক কার্ড ও কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে কৃষি সচিব সেলিম খান এসব তথ্য জানান। এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিকাল ৪টার যোগ দেন। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ইমাম মোয়াজ্জিনসহ অন্যন্য ধর্মালম্বীদের সম্মানী প্রদান এ অনুস্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সমাজ কল্যান মন্ত্রী ডা. এজেড এম জাহিদ হোসেন। এতে অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাঈল জবি উল্লাহ, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, কৃষি মন্ত্রী আমিনুর রশিদ ইয়াসিন, পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সমাজ কল্যান প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আগমনে ফুলগাজীতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
কৃষি সচিব বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৯ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ কৃষকের তথ্য অনুমোদন করা হয়েছে। কৃষকদের লেনদেন ও সরকারি সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের ৫৬ জেলার ৭৭টি উপজেলায় একযোগে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ১ লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষককে কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ফেনীর ছয়টি উপজেলার ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষকের হাতে সরাসরি কৃষক কার্ড তুলে দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে দেশের প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে কৃষি প্রণোদনা দেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে বক্তব্যের লিখিত তথ্যে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৭ হাজারের সঙ্গে মোট অর্থের হিসাবে অসঙ্গতি রয়েছে; দেওয়া ২৫ কোটি ১ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা মোট অর্থ ১ লাখ ৪৭ হাজার জনের হিসাবে মেলে না। প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সংখ্যাটি যাচাই করা প্রয়োজন।
কৃষি সচিব বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা ও সরকারি প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছানো, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য, কৃষি প্রশিক্ষণ, ফসলের রোগবালাই দমনে পরামর্শ, কৃষি বীমা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। চলতি বছর কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় বেশি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিএডিসি ও বিএমডিএর মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৪৭৬ কিলোমিটার খাল খনন এবং বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার মাধ্যমে ২৫ লাখ বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে বলেও জানান কৃষি সচিব।
বক্তব্যে তিনি বলেন, কৃষক কার্ড শুধু একটি কার্ড নয়; এটি কৃষকের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা সহজলভ্য করার একটি প্ল্যাটফর্ম। আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, স্যাটেলাইট, প্রযুক্তিনির্ভর সেচ, উন্নত জাত উদ্ভাবন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল করার কাজ চলছে।
কৃষি সচিব বলেন, সরকার এমন একটি কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কৃষক শুধু উৎপাদক নন, তিনি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, খাদ্যনিরাপত্তার রক্ষক এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কৃষিকে অবহেলার পেশা নয়, সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। পরিবার ভালো থাকলে সমাজ ভালো থাকবে। আর মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী হবে।’
অনুষ্ঠানে কৃষক কার্ডের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড এবং মসজিদের ইমাম ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সম্মানী প্রদানের মতো জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।