হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সময় ঘনিয়ে এলেও সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ এখনো শুরু করা যায়নি। নেটওয়ার্ক অবকাঠামো স্থাপনে টেলিটকের আহ্বান করা দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ না নেওয়ায় আটকে আছে নেটওয়ার্ক স্থাপনের কার্যক্রম। এ অবস্থায় টার্মিনাল চালুর আগে মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে আজ জরুরি বৈঠকে বসছে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
আজ বেলা ১১টায় মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এবং রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। বৈঠকে নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরবর্তী করণীয় এবং দ্রুত কাজ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল চালুর কথা রয়েছে। এর আগে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো স্থাপন করা না গেলে টার্মিনালের ভেতরে মোবাইল যোগাযোগে দুর্বলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে টার্মিনালের বড় কাচ, স্টিল ও কংক্রিটের কাঠামোর কারণে বাইরে থাকা মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
দরপত্রে অংশ নেয়নি কোনো প্রতিষ্ঠান
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনালের মূল নকশায় ইনডোর মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় পরে নতুন করে এ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডকে।
এর অংশ হিসেবে গত জুলাইয়ে উন্নতমানের ইনডোর টেলিকম নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করে টেলিটক। প্রকল্পের আওতায় অ্যাকটিভ ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যান্টেনা সিস্টেম (অ্যাকটিভ ডিএএস), স্মল সেল, ওয়াই-ফাইসহ বিভিন্ন টেলিকম অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর দরপত্র জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় শেষ হলেও কোনো ঠিকাদারি বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়নি। ফলে দরপত্রটি বাতিল হয়ে যায়। এতে টার্মিনাল চালুর আগে নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার প্রকল্প
তৃতীয় টার্মিনালের ইনডোর নেটওয়ার্ক স্থাপনে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা মূলধনী ব্যয়। এই অর্থে কোর নেটওয়ার্ক, ট্রান্সমিশন, অ্যাকটিভ ডিএএস, স্মল সেল ও ওয়াই-ফাইসহ বিভিন্ন টেলিকম অবকাঠামো স্থাপনের কথা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭০০টি স্মল সেল এবং ৬৩৫টি ওয়াই-ফাই ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ইমিগ্রেশন এলাকা, চেক-ইন কাউন্টার, ভিআইপি লাউঞ্জ, এক্সপোর্ট কার্গো টার্মিনাল, ইমপোর্ট কার্গো টার্মিনালসহ যাত্রী ও অপারেশনাল এলাকার ইনডোর নেটওয়ার্ক কভারেজ নিশ্চিত করার কথা।
নতুন নেটওয়ার্ক ৪জি প্রযুক্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতে ৫জি প্রযুক্তির উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নকশায় ছিল না ইনডোর নেটওয়ার্ক
সংশ্লিষ্টদের মতে, তৃতীয় টার্মিনালের মতো বড় আন্তর্জাতিক স্থাপনায় বাইরে থেকে মোবাইল সিগন্যাল ভেতরে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে ইনডোর নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা আগেই থাকা প্রয়োজন ছিল। এখন নতুন করে অবকাঠামো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ায় সময়ের সঙ্গে কাজ বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল নির্মাণের সময় যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্কের মতো মৌলিক ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। মূল নকশায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়া পরিকল্পনাগত ঘাটতিরই ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, উদ্বোধনের এত কাছে এসে নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান এবং কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ না নেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কেন প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখায়নি এবং প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক শর্ত বাস্তবসম্মত কি না, তা দ্রুত যাচাই করা দরকার।
সময় নিয়েও প্রশ্ন
নেটওয়ার্ক স্থাপনের প্রকল্পের সময়সীমা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তৃতীয় টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর চালুর কথা থাকলেও ইনডোর নেটওয়ার্ক প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।
এ অবস্থায় প্রচলিত দরপত্র প্রক্রিয়ায় নতুন করে কাজ শুরু করলে টার্মিনাল চালুর সময়ের মধ্যে নেটওয়ার্ক স্থাপন সম্ভব হবে কি না, সেটিও বিবেচনায় আসছে। আজকের বৈঠকে দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ৯১ লাখ যাত্রী চলাচল করেন। প্রতিদিন গড়ে ১৯০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়। তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগে এসব যাত্রীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা তাই সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ অবস্থায় নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, আজকের বৈঠকে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা আসতে পারে। একই সঙ্গে দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ না নেওয়ার কারণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য উপায় নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।