ছবি: সংগৃহীতনেতিবাচক খবরের ভিড়ে আনন্দদায়ক, ইতিবাচক ও শিক্ষামূলক বিষয় খুজে দেখার অভ্যাসই ‘ব্লুমস্ক্রলিং’
অবসরে, কাজের ফাকে কিংবা সময় কাটাতে অনেকেই বারবার ফোনের পর্দায় চোখ রাখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা নানা তথ্য, ভিডিও ও ছবি কখনো আনন্দ দেয়, কখনো হাসায়, আবার কখনো মন খারাপ করে দেয়। তথ্য জানার প্রয়োজন থাকলেও একের পর এক নেতিবাচক খবর দেখতে থাকা মানসিক ক্লান্তি ও উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে সেখানে কী দেখা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। আনন্দদায়ক, অনুপ্রেরণামূলক কিংবা নতুন কিছু শেখায় এমন বিষয় খুঁজে দেখার অভ্যাসকে বলা হয় ‘ব্লুমস্ক্রলিং’।
ব্লুমস্ক্রলিং বলতে কী বোঝায়?
ব্লুমস্ক্রলিং হলো ইচ্ছা করে এমন অনলাইন কনটেন্ট দেখা, যা মনে আনন্দ, স্বস্তি বা ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। সুন্দর প্রকৃতির দৃশ্য, মজার ভিডিও, প্রাণীর ছবি, মানুষের ভালো কাজের গল্প, ভ্রমণ, রান্না, নিজের পছন্দের শখ কিংবা অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা এর উদাহরণ হতে পারে।
মার্কিন স্নায়ু ও মনোবিজ্ঞানী ডা. সানাম হাফিজ Real Simple-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, ব্লুমস্ক্রলিং হলো অনলাইনে এমন বিষয় সচেতনভাবে খুজে দেখা, যা ভালো অনুভূতি তৈরি করে।
অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে সামনে যা আসে, তা নির্বিচারে দেখতে থাকার বদলে নিজের ভালো লাগা ও আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় বেছে নেওয়াই এর মূল কথা। এর মাধ্যমে অনলাইন ব্যবহারে ভারসাম্য আনা এবং মানসিক স্বস্তির জন্য ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব।
তবে এর অর্থ খারাপ খবর এড়িয়ে যাওয়া কিংবা বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়। বরং উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি করা বিষয়গুলোর পাশাপাশি আনন্দদায়ক ও উপকারী কনটেন্টের জন্যও জায়গা রাখা।
নিউইয়র্কভিত্তিক ‘কমপ্রিহেন্ড দ্য মাইন্ড’-এর পরিচালক ডা. সানাম হাফিজের মতে, ব্লুমস্ক্রলিংয়ের উদ্দেশ্য সব ধরনের নেতিবাচক খবর এড়িয়ে চলা নয়; বরং অনলাইনে দেখা বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। সব কনটেন্ট যদি উদ্বেগ, রাগ বা অস্থিরতা বাড়ায়, তাহলে নিজের জন্য কিছু আনন্দদায়ক বিষয় বেছে নেওয়াও জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি উদ্বেগজনক খবর দেখার পর একই ধরনের আরও অনেক খবর সামনে আসতে পারে। একটি দুশ্চিন্তার বিষয় থেকে আরেকটি, তারপর আরও একটি দেখতে দেখতে কখন দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়, তা অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়।
একটানা নেতিবাচক বা উদ্বেগ সৃষ্টিকারী কনটেন্ট দেখতে থাকার এই অভ্যাসকে বলা হয় ‘ডুমস্ক্রলিং’। এর বিপরীতধর্মী ধারণা হলো ব্লুমস্ক্রলিং, যেখানে সচেতনভাবে ইতিবাচক ও আনন্দদায়ক বিষয় বেছে নেওয়া হয়।
একটানা খারাপ খবর দেখতে থাকলে উদ্বেগ, বিরক্তি ও মানসিক ক্লান্তি বাড়তে পারে। ফোন রেখে দেওয়ার পরও দেখা ঘটনাগুলো মাথায় ঘুরতে পারে। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে এবং একই বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
দম্পতি ও পরিবারবিষয়ক মার্কিন থেরাপিস্ট নিলুফার নেকুর মতে, ডুমস্ক্রলিং মানুষের মধ্যে চাপ ও অতিরিক্ত সতর্কতার একটি চক্র তৈরি করতে পারে। নতুন কোনো বিপদ বা উদ্বেগজনক খবর এসেছে কি না, তা দেখার জন্য মানুষ বারবার ফোনের পর্দায় ফিরে যেতে পারে। এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, আনন্দদায়ক ও ইতিবাচক কনটেন্ট কিছু মানুষের মেজাজ ভালো করতে এবং সাময়িক মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। মানুষের উপকার করার দৃশ্য, অনুপ্রেরণামূলক গল্প কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখার অভিজ্ঞতা মন ভালো রাখতেও সহায়ক হতে পারে। তবে ব্লুমস্ক্রলিং যে সবার ক্ষেত্রে একই রকম প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সেটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় কখনো কখনো। তবে কাজ, তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগসহ নানা প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করায় সবার পক্ষে তা সম্ভব হয় না।
এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যবহার বন্ধ করার পরিবর্তে কী দেখা হচ্ছে এবং কতক্ষণ দেখা হচ্ছে, সেদিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। নিজের আগ্রহের ইতিবাচক বিষয়গুলো সামনে রাখলে একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেও নেতিবাচক কনটেন্টের সংস্পর্শ কমানো সম্ভব।
ইতিবাচক গল্প ও মানুষের ভালো কাজের উদাহরণ দেখলে পৃথিবীতে নেতিবাচক ঘটনার পাশাপাশি ভালো ঘটনাও ঘটছে, সেই উপলব্ধি তৈরি হতে পারে। অন্যের প্রতি সহানুভূতি ও মানুষের ভালো কাজ সম্পর্কে আগ্রহও বাড়তে পারে।
থেরাপিস্ট নিলুফার নেকু এমন কনটেন্ট কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন, যেগুলো বারবার মন খারাপ করে বা উদ্বেগ বাড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।
ডা. সানাম হাফিজের পরামর্শ অনুযায়ী, কোন বিষয় দেখার পর নিজেকে উদ্বিগ্ন, রাগান্বিত, অনিরাপদ বা মানসিকভাবে ক্লান্ত মনে হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। যেসব বিষয় বা ব্যক্তির প্রকাশনা নেতিবাচক অনুভূতি বাড়ায়, সেগুলোর অনুসরণ বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। এর পরিবর্তে যেসব বিষয় হাসায়, নতুন কিছু শেখায় কিংবা নিজের আগ্রহের সঙ্গে মেলে, সেগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।
পছন্দের কনটেন্ট বেছে নিন: প্রকৃতি, ভ্রমণ, রান্না, বই, শিল্প কিংবা শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তি ও পেজ অনুসরণ করুন।
বিরক্তিকর কনটেন্ট কমান: কোনো বিষয় বা ব্যক্তির প্রকাশনা বারবার মন খারাপ করলে সেটি নীরব করা বা অনুসরণ বন্ধ করার সুবিধা ব্যবহার করুন।
নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করুন: অপ্রয়োজনীয় বার্তার শব্দ বন্ধ রাখুন, যাতে ঘন ঘন ফোন দেখার তাগিদ কমে।
স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু বন্ধ করুন: প্রয়োজন ছাড়া একের পর এক ভিডিও দেখতে থাকার প্রবণতা কমাতে অটোপ্লে বন্ধ রাখতে পারেন।
ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করুন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতক্ষণ সময় কাটাবেন, তার একটি সীমা ঠিক করুন। প্রয়োজন হলে কিছু সময়ের বিরতি নিন।
নিজের অনুভূতি খেয়াল করুন: কোনো কনটেন্ট দেখার পর কেমন লাগছে, তা বুঝে পরবর্তী সময়ে কী দেখবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী দেখা হচ্ছে, তা সচেতনভাবে বেছে নেওয়া মানসিক সুস্থতার যত্ন নেওয়ার একটি ছোট পদক্ষেপ হতে পারে। নেতিবাচক খবর সম্পর্কে অবগত থাকার পাশাপাশি আনন্দদায়ক ও শিক্ষামূলক বিষয় দেখার অভ্যাস অনলাইন ব্যবহারে ভারসাম্য আনতে সহায়তা করতে পারে।