ছবি: যাযাদিউদ্বোধনের ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি ময়মনসিংহের ভালুকা ট্রমা সেন্টারে। জনবলসংকটে বন্ধ রয়েছে রোগী ভর্তি ও অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকা অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় ৪৪ কিলোমিটার দূরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। এতে সময় ও ভোগান্তি বাড়ছে আহতদের স্বজনদের।
ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানায় অবস্থিত তিনতলা ভবনটি বাইরে থেকে দেখলে সচল হাসপাতাল মনে হলেও ভেতরের চিত্র ভিন্ন। বেশির ভাগ কক্ষ অব্যবহৃত পড়ে আছে। কোথাও স্তূপ করে রাখা হয়েছে পুরোনো সরঞ্জাম, কোথাও পড়ে রয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার। নিচতলার একটি অংশে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা চালু থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার বেশির ভাগ কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছে না।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যে নির্মিত ২০ শয্যার এই ট্রমা সেন্টারটি উদ্বোধন করা হয় ২০০৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের শেষ দিকে এখানে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের সেবা চালু হয়। তবে প্রায় দুই দশকেও রোগী ভর্তি, জরুরি অস্ত্রোপচার ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
ট্রমা সেন্টারের জনবল কাঠামো অনুযায়ী, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে প্রয়োজন ৪২ জন। বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৬ জন। তাঁদের মধ্যে তিনজন চিকিৎসক, ১১ জন নার্স, একজন এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও একজন ফার্মাসিস্ট। ফলে প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় ২৬টি পদ শূন্য রয়েছে।
জনবলসংকটের কারণে ট্রমা সেন্টারটিতে সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা, রোগী ভর্তি ও অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না। বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে অর্থোপেডিক পরামর্শ, এক্স-রে, ইসিজি ও প্রাথমিক প্লাস্টারের মতো সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ট্রমা সেন্টার চালুর সময় প্রায় দুই কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় এসব সরঞ্জামের একটি বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিকল হয়ে গেছে। অস্ত্রোপচারকক্ষের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও জেনারেটরও নষ্ট হয়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া ছিল এই ট্রমা সেন্টার নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য। মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থাও থাকার কথা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু না থাকায় সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।
পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু না থাকলেও ট্রমা সেন্টারটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী সেবা নেন। চলতি বছরে ২৬ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন বলে একটি তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ বছর সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ৩১ হাজারের বেশি।
রোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও চিকিৎসার সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও এখানে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর অন্য হাসপাতালে নিতে হয়। এতে সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি আহতদের পরিবারকে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকা অংশে ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫১ জন এবং নিহত হয়েছেন সাতজন।
অন্যদিকে, ভরাডোবা হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খোরশেদ আলম জানান, চলতি বছরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৬১টি দুর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত ও ৫৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে পুলিশকে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় বলে জানান তিনি।
খোরশেদ আলম বলেন, ভালুকা ট্রমা সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা ও অন্তর্বিভাগের সেবা চালু হলে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমবে।
ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে অর্থোপেডিক পরামর্শ, এক্স-রে, ইসিজি ও প্রাথমিক প্লাস্টারের মতো সেবা দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরে এ কেন্দ্র থেকে ৩১ হাজারের বেশি মানুষ সেবা নিয়েছেন। জনবলসংকটসহ একাধিক কারণে অন্তর্বিভাগের সেবা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ফখরুল হাসান চৌধুরী জানান, ট্রমা সেন্টারে অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগের সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা হলে দ্রুত অন্তর্বিভাগ এবং অস্ত্রোপচারকক্ষের কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল করার মাধ্যমে দ্রুত ভালুকা ট্রমা সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা হবে। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা কাছাকাছি জরুরি চিকিৎসাসেবা পাবেন এবং দূরের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় ও ভোগান্তি কমবে।