ছবি: যাযাদিভালোবাসার আলিঙ্গনও যে কখনো গুরুতর শারীরিক আঘাতের কারণ হতে পারে, তারই এক বিরল ঘটনা ঘটেছে চীনে। স্বামীর আলিঙ্গনের পর এক নারীর পাজরের পাচটি হাড় ভেঙে গেছে এবং আরও একটি হাড়ে চিড় ধরেছে। পরে হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ওই নারীর অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগ ধরা পড়ে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
চীনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘জিংসি লাইভ’-এর বরাতে জানা যায়, ওয়াং পদবির এক ব্যক্তি শীত লাগার কথা জানানোয় স্ত্রীকে উষ্ণতা দিতে আলিঙ্গন করেছিলেন। কিন্তু আলিঙ্গনের সময় হাড় ভাঙার মতো শব্দ শুনতে পান তিনি। এ সময় তার স্ত্রী তীব্র ব্যথায় কাতর হয়ে মাটিতে বসে পড়েন। পরে ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই ব্যক্তির দাবি, স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরার সময় তিনি অতিরিক্ত কোনো শক্তি প্রয়োগ করেননি। স্বাভাবিকভাবেই আলিঙ্গন করেছিলেন। কিন্তু এর পরিণতি এতটা গুরুতর হতে পারে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
ঘটনার পর দম্পতি সারা রাত ব্যথা সহ্য করেন। পরদিন সকালে তারা হাসপাতালে যান। সেখানে বুকের সিটি স্ক্যান করার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, ওই নারীর পাজরের পাচটি হাড় ভেঙে গেছে এবং ষষ্ঠ পাজরের হাড়েও সূক্ষ্ম চিড় ধরেছে।
চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াং জানান, তার স্ত্রীর হাড় অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর পেছনে অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ওয়াংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্ত্রীর ওজন ছিল প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কেজি। তিনি অতিরিক্ত ডায়েট করতেন এবং প্রায়ই রাতের খাবার বাদ দিতেন। পাশাপাশি, তার সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসার সুযোগও ছিল খুব কম। বাড়ি থেকে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত পারিবারিক দোকানেই তিনি দিনের বেশির ভাগ সময় কাটাতেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হাড়ের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ওই নারীর ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চিত করতে বিস্তারিত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
উহান এশিয়া হার্ট জেনারেল হাসপাতালের অস্থিশল্য বিশেষজ্ঞ ইয়ান ইয়ানসিয়াং বলেন, সাধারণত তরুণ বয়সে শুধু আলিঙ্গনের চাপে পাজরের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে হাড়ের দুর্বলতার সম্পর্ক থাকতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যায়। ফলে সামান্য আঘাত, পড়ে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিকের তুলনায় কম চাপে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুকি বেড়ে যেতে পারে। এ রোগ অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ ছাড়াই অগ্রসর হয়। তাই ঝুকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে হাড়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ ইয়ান ইয়ানসিয়াং জানান, পাজরের হাড় ভাঙার কারণে ফুসফুস বা ফুসফুসের চারপাশের পর্দায় জটিলতা তৈরি না হলে অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। ওই নারীর ক্ষেত্রেও চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে ওষুধ, বিশেষ প্যাচ ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পাজরের হাড় ভাঙার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকের ব্যথা বেড়ে যাওয়া বা রক্ত কাশির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং বয়স ও ঝুকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ওজন কমানোর জন্য দীর্ঘদিন অতিরিক্ত খাদ্যনিয়ন্ত্রণ বা নিয়মিত খাবার বাদ দেওয়ার আগে চিকিৎসক কিংবা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চীনের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, হাড়ের দুর্বলতা সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তাই দীর্ঘদিনের অপুষ্টি বা হাড়ক্ষয়ের ঝুকি থাকলে তা অবহেলা না করে যথাসময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।