
সীমান্তের চোরাচালান, মাদক, অস্ত্র ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। অপরাধের তথ্য, ছবি ও ভিডিও তুলে ধরতেন নিজের পরিচালিত ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজে। এসব কর্মকাণ্ডের জেরে একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে প্রাণ হারান এই সাংবাদিক।
আলিফ হত্যা মামলার তদন্তে এখন সামনে আসছে তাজুল ইসলাম ও শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’ নামের দুই ব্যক্তির নাম। সীমান্ত কেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একই সঙ্গে তদন্তে উঠে আসা সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশের পুরোনো সন্ত্রাসী তালিকায় থাকা কয়েকজনের নামও এসেছে তদন্তে। ইতোমধ্যে এ মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের যোগাযোগ, ঘটনাস্থল ও আশপাশে মোটরসাইকেলের চলাচল এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে তাঁদের অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করছেন তদন্তকারীরা। তবে তাজুল ও শামীমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ কিংবা হত্যাকাণ্ডে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়।
শামীমের বিরুদ্ধে ২৫, তাজুলের বিরুদ্ধে ১৩ মামলার তথ্য
পুলিশের নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্গাপুর থানায় ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অন্তত ২৫টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১টি মামলায় হত্যাচেষ্টার ধারা রয়েছে। ১৯টি মামলা চলমান বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব মামলার সর্বশেষ অবস্থা ও প্রতিটি অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০টি দুর্গাপুর থানায়, একটি কলমাকান্দা থানায়, একটি নেত্রকোনা সদর থানায় এবং অন্যটি ঢাকার দারুস সালাম থানায় করা হয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দায়ের করা এসব মামলার তিনটিতে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এবং চারটিতে অস্ত্র আইনের ধারা রয়েছে।
তবে কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আলিফ হত্যা মামলায় তাঁদের সম্ভাব্য ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল ও বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত বিবেচ্য হবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর থানা-পুলিশের পুরোনো সন্ত্রাসী তালিকায় থাকা কয়েকজনের নাম আলিফ হত্যা তদন্তে এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তাজুল ইসলাম, সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব, আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ, সাব্বির হোসেন, বাকী বিল্লাহ এবং সামিউল হক ওরফে সৌরভ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, তাঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক আলিফের ওপর আগের হামলাগুলোতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রত্যেকের ভূমিকা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
যায়যায়দিনের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মামলায় সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, অপূর্ব তাজুল ইসলামের সহযোগী এবং প্রাঙ্গণ শামীম আহমেদের ঘনিষ্ঠজন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পেছনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, হত্যাকাণ্ডে সাত থেকে আটজন অংশ নিয়ে থাকতে পারেন। তবে এ সংখ্যা এখনো তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা; চূড়ান্তভাবে জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিশ্চিত হয়নি।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আলিফকে হত্যায় ব্যবহৃত গুলি ছিল ৯ মিলিমিটারের। তাঁর মুঠোফোনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য সেটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের চলাচল, মোটরসাইকেলের গতিবিধি এবং সম্ভাব্য যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
ঘটনার রাতের বিবরণে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। স্থানীয় দোকানি রবিন রাংসার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর রাত আটটার দিকে তাঁর দোকান থেকে ছয়টি সিগারেট কেনেন আলিফ। দোকানে বসে একটি সিগারেট খাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির দিকে রওনা হন তিনি। এ সময় ভুলে নিজের মুঠোফোনটি দোকানে রেখে যান।
পরে ফোন নিতে আবার দোকানে ফিরে আসেন আলিফ। মুঠোফোন নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে বাড়ির পথে রওনা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির শব্দ শোনেন দোকানি।
রবিন রাংসা যায়যায়দিনকে জানান, গুলির শব্দ শুনে বাইরে তাকিয়ে আলিফকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। ঘটনাস্থলে অপরিচিত দুজন ব্যক্তিকেও দেখতে পান। ভয়ে তিনি দোকানের পেছনের একটি ঘরে চলে যান।
পুলিশ ও পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলিফের মাথা, গলা ও বুকে গুলির আঘাত ছিল। ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত আগের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর শরীরে মোট ছয়টি গুলির ক্ষত পাওয়া যায়।
ঘটনার পরদিন আলিফের স্ত্রী খাদিজা আক্তার অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এরপর থেকে হত্যাকাণ্ডের কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং নেপথ্যে কারা ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
আলিফের সাংবাদিকতার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের অনুসন্ধান। চোরাচালানের মাধ্যমে কী ধরনের পণ্য আসে, কারা এসব অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কীভাবে অপরাধ সংঘটিত হয়—এসব তথ্য সংগ্রহ করতেন তিনি। কাজের জন্য তিনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মিশতেন, এমনকি কখনো শ্রমিকের বেশেও কাজ করতেন বলে জানিয়েছেন উনার স্ত্রী খাদিজা আক্তার।
খাদিজার দাবি, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন, চোরাচালান ও অস্ত্রসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। এসব তথ্য প্রকাশের কারণে তাঁকে বিভিন্ন সময় হুমকি ও হামলার মুখে পড়তে হয়েছে।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ যায়যায়দিনকে জানান, তাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে আলিফ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর বাড়িঘরের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন।
আলিফ তাঁর কাছে থাকা অস্ত্রের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েছেন—তাজুলের এমন ধারণা ছিল বলে পুলিশের বক্তব্য। এ নিয়ে ক্ষোভ থেকে আলিফের ওপর আগেও হামলা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে আলিফকে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বিরোধ, পূর্ববর্তী হামলা এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্রও যাচাইয়ের বিষয়।
পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনায়ও এসেছিল আলিফের নাম, আলিফের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন নয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্গাপুর পৌরসভার পানমহাল এলাকায় উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পরে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসে, তাঁদের লক্ষ্য ছিলেন সাংবাদিক আলিফ। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলিফকে হত্যার উদ্দেশ্যে গিয়ে ভুল করে পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তাজুল ইসলামের নির্দেশের কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
তবে ওই ঘটনার সঙ্গে আলিফ হত্যা মামলার যোগসূত্র এবং তাজুল ইসলামের কথিত নির্দেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও তদন্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এর প্রায় ১০ মাস পর, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় তিনি মামলা করেন। মামলাটিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
এরও আগে, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন আলিফ। অস্ত্রধারীরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে—এমন তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি গেলে গুলি করবে।’
একাধিকবার হামলার অভিযোগ এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানানোর পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং আগের হামলাগুলোর তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছিল?
নেত্রকোণা জেলা পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত হামলাকারীদের একটি দল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। দলটিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদের সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে দ্রুত বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান দৈনিক যায়যায়দিনকে জানিয়েছেন, তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।
পুলিশের এই বক্তব্যে তদন্তের অগ্রগতির কথা উঠে এলেও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা ছিলেন, কী কারণে আলিফকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল এবং পরিকল্পনার সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিলেন—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি।
সীমান্তের অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ ছিল আলিফের বিরুদ্ধে। এরপরও তাঁকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক ও নেত্রকোনার মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক জেলা কমান্ডার হায়দার জাহান চৌধুরী যায়যায়দিনকে বলেন, সাংবাদিক আলিফকে যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাতে তাঁরা স্তম্ভিত। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
আলিফ হত্যা মামলার তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হামলাকারীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের পেছনে থাকা পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা কতটা সম্ভব হয়। তাজুল ও শামীমসহ তদন্তে উঠে আসা ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই, আগের হামলার ঘটনাগুলোর সঙ্গে যোগসূত্র নির্ধারণ এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহের ওপরই নির্ভর করছে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য উন্মোচন ও বিচারপ্রাপ্তির পথ।